খেলা

আজ  ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার খেলা। টিভি তে লাইভ দেখানো হচ্ছে। বাসার সবাই বসারঘরে বসে খেলা দেখছে। আমি সবসময় ব্রাজিলের ভক্ত। কিন্তু আর্জেন্টিনা হারলেও আমার খারাপ লাগে। আমার এই কথা শুনে  সবাই হয়তো আমাকে বলবে সুযোগ সন্ধানী । কিন্তু আমি আসলেই এমন নই। একসময় আর্জেন্টিনা ছিল আমার সবচেয়ে অপছন্দের দল।

আমি খেলা দেখছি না। বাতি নিভিয়ে শুয়ে আছি। বসার ঘর থেকে হই হই আওয়াজ শুনলাম । খেলা শেষ হয়ে গিয়েছে। নিশ্চয়ই ব্রাজিল জিতেছে। কারন আমার বাসার সবাই ব্রাজিলের ভক্ত। আমার ছোট ভাগ্নে কে দেখলাম ব্রাজিলের পতাকা হাতে নিয়ে আমার ঘরের দিকে আসছে। বুঝলাম ঘুম আর হবে না। এখন পুরো বাসাতেই ব্রাজিলের গুণকীর্তন শুরু হবে।

আমি বের হয়ে রাস্তায় হাঁটতে বের হলাম। ব্রাজিলের জয়ের জন্য আনন্দ মিছিল হচ্ছে । মানুষ পারে বটে । এক সময় আমিও এমন ফুটবল পাগল ছিলাম। ৮ বছর আগে। সেই পুরনো স্মৃতি গুলো মাথায় এসে জমা হচ্ছে ।আমি হাঁটছি এদিক সেদিক । আর ভাবছি আমার ফুটবল জীবনের কথা। আমার জীবনের ফেলে আসা সেই দিন গুলোর কথা। কিশোরের এর কথা।

আমার স্কুল জীবনটা খুব অদ্ভুত ছিলও। বাবার বদলির চাকুরী। তাই কোন স্কুলেই আমার ১-২ বছরের বেশি পড়া হয় নাই। তাই আমার সাথে কারো তেমন বন্ধুত্ব গড়ে উঠে নাই। ক্লাস নাইনে আমি এসে ভর্তি হলাম রূপ নগর মাধ্যমিক বালক বিদ্যালয়ে। রূপনগর পাহাড়ি এলাকা। আমরা এই অঞ্চলে নতুন। বাবা আমাকে স্কুলে ভর্তি করাতে নিয়ে গেলো । স্কুলে বাবা তার পুরনো বন্ধু কে খুঁজে পেলেন। তার ছেলেবেলার বন্ধু। তিনি আর কেউ নন। আমাদের শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক বাসেত সার। বাবা বাসায় দাওয়াত দিলেন স্যার কে। আসলে দাওয়াত ঠিক না। ২ জন মিলে আড্ডাবাজি করার সুযোগ পাওয়ার জন্য এই দাওয়াত।

স্যার আসলেন সন্ধ্যায় গেলেন মধ্যরাতে। এত কথা তাদের জমে ছিল। গল্প করার এক ফাকে বাবা স্যারের সাথে আমার ফুটবল খেলার গল্পও করে ফেলেছেন। আমি আগে যে স্কুলে পড়তাম সে স্কুলের ফুটবল টিমে ছিলাম আর আমাদের টিম যে আন্তঃ জেলা স্কুল ফুটবল প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন ছিলাম তা সগর্বে বাবা স্যার কে জানিয়ে দিয়েছেন। এই কথা শুনে বাসেত  স্যার খুশি। তিনি আমাকে ফুটবল টিমে নিতে আগ্রহী হয়ে উঠলেন ।

স্কুলে আমার বেশ কয়েকজনের সাথে কথা হয়। কিন্তু সেরকম বন্ধুত্ব কারো সাথেই গড়ে উঠে নাই। নবম শ্রেণীর ছাত্রদের নিয়ে এই স্কুলে ফুটবল টিম গঠন করা হয়। যারা যারা আগ্রহী তারা তারা নাম দিলও। মজার ব্যাপার হলও স্কুলের ফুটবল টিমে কে কে থাকবে তা মোটামুটি সবাই জানে। ক্লাস ওয়ান থেকেই সবাই সবাই কে চিনে। কিন্তু মুশকিল হলও আমাকে নিয়ে। আমি নাম দিতে চাই নাই। কিন্তু বাসেত স্যারের আগ্রহে নাম দিতে হলও । এতে কেউ খুশি হলও না। আর আমারও তাদের সাথে মেলা মেশার সুযোগ কমে গেলও । কিন্তু শেষ পর্যন্ত মহা বিপদে পরলাম যখন স্যার আমাকে ক্যাপ্টেন বানাতে চাইলেন । কিন্তু আগে থেকেই যে ক্যাপ্টেন হিসেবে নির্বাচিত ছিল সে আর তার বন্ধু রা আমাকে প্রায় এক ঘরে করে দিল। তার নামটি ছিলও কিশোর । তিন গোয়েন্দার কিশোরের মতই ছিল বুদ্ধি আর কৌশল । আর তার সবচেয়ে কাছের ২ বন্ধু সবুজ আর রিহান।

বাসেত স্যার খুব বন্ধু সুলভ আচরণ করতো । তাই যখন তিনি চাইলেন আমি ক্যাপ্টেন হব তখন কিশোর সাহস হল ভেটো দেয়ার । বলল সে আমি ক্যাপ্টেন হলে খেলবে না। তার সাথে সাথে সবুজ আর রিহান আপত্তি জানালও। এই তিন জন ই আমাদের টিমের অন্যতম শক্তি। তারা না থাকলে পুরো টিমের শক্তি অর্ধেক কমে যাবে। শেষে স্যার ২ টা দলে টিমটি কে ভাগ করলেন। এক দলে আমি ক্যাপ্টেন আরেক দলে কিশোর। যে টিম জিতবে সেই হবে মূল দলের ক্যাপ্টেন

ক্লাসের পর খেলা হবে। দুপুরের কড়া রোদে খেলা। ১ ঘণ্টা খেলা হবে। ৩০ মিনিট করে খেলা। কিন্তু আমি চিন্তিত। কারন আমার দলের গোল কিপার হল সবুজ। সে কোন ভাবেই আমাকে ক্যাপ্টেন হিসেবে দেখতে চায় না। ও খেলায় উলটা পালটা করবে না তো। আমার টিমের বাকিরা আমাকে ভরসা দিলও তারা আমার হয়ে জানে প্রাণে খেলবে। আমার ডিফেন্সে রকিব আছে। একমাত্র ওর সাথেই আমার খুব ভাল বন্ধুত্ব হয়েছে। সে বুঝতে পেরেছে আমার মনের কথা। বলল-

-নিশু ভয় পাইস না। আমি ডিফেন্সে থাকবও । গোল পোস্ট পর্যন্ত বলই যেতে দিবো না।

আমি একটা শুকনো হাসি দিলাম। খেলার সময় যত এগিয়ে আসছে ততই আমার টেনশন বাড়ছে। আসলে আমার ক্যাপ্টেন হওয়ার যত না আগ্রহ ছিল তার থেকে ইগো ক্ল্যাশ। আমি কিশোরের কাছে হারতে চাইছিলাম না।

খেলায় ১-১ গোলে ড্র হল। গোল হয়েছে সবুজের ভুলে। যদিও ভুল ছিল কিনা তা সন্দেহ। কিন্তু সবুজ যে পুরো কিশোরের হয়ে খেলছে তা বুঝা গেলও ট্রাই-বেকারে। প্রথম ৩ টি গোল রক্ষা করতে পারলো সে। কিন্তু শেষ গোলের সময় বলটি কোন দিকে আসছে তা পরিষ্কার বুঝা গেলেও আরেকদিকে ঝাঁপ দিল

আমার মন ভেঙ্গে গেলও । বুঝলাম এদের সাথে খেলে টিকতে পারবো না। বাড়ি ফিরছি। পথে দেখলাম কিশোর , সবুজ আর রিহান। আমাকে দেখে শীষ দিলও। হাসলও।

কিশোর জোরে চিৎকার দিয়ে ডাকলও-

-কি ব্যাপার ক্যাপ্টেন? লাইটার হবে?

আমি থমকে দাঁড়ালাম অপমান সহ্য করছি। কিশোর আমার মুখের সিগারেট খেয়ে আমার মুখে ধোঁয়া ছাড়ল। তারপর হাসতে হাসতে আমার পাশ দিয়ে চলে গেল। শুনতে ছিলাম তাদের টিটকারি। হাসতে হাসতে বলছে-

-শখ কত ক্যাপ্টেন হবে। শেষ পর্যন্ত হারলোই তো। এরপর টিম থেকেও বিদায় করার ব্যবস্থা করছি।

কথা গুলো আমার ব্রক্ষতালু পর্যন্ত জ্বলে উঠলো । আমি ঠিক করলাম আমি খেলবো ।

এদিকে পরের দিন স্যার ঘোষণা করলেন কিশোর কে ক্যাপ্টেন হিসেবে কিন্তু সাময়িক। স্যার নিজেও তো খেলা দেখেছেন। সবুজের খেলা নিয়ে তারও সন্দেহ জেগেছে।

এদিকে কিশোর , সবুজ আর রেহান দাঁতে দাঁত লাগিয়ে সহ্য করলো ব্যাপারটা।

প্রথম খেলা আমাদের রহমতপুর বিদ্যালয়ের সাথে। কিশোর আমাকে এক্সট্রা হিসেবে বসিয়ে দিলো । মাঠে নামতে দিচ্ছে না। সে ভয় পেয়েছে সবুজের মত আমিও হয়তো খেলার মাঠে ওর বিপক্ষে চলে যাব। আর এই ম্যাচে হারলে তো তার ক্যাপ্টেন্সি প্রশ্নের মুখে পড়বে। কিন্তু আমি তো তা চাই না। আমি চাই টিমে পাকাপোক্ত ভাবে আসন গাড়ার । আমি চাই নিজের শ্রেষ্ঠ খেলা দেখাতে। অন্যায় ভাবে কাউকে ক্যাপ্টেন্সি থেকে বাদ দিতে নয়।

কিন্তু মাঠের পাশে বসে আমার ক্ষোভে চিৎকার করা ছাড়া আর কিছুই করার উপায় ছিল না। কিন্তু হটাত একটা সুযোগ পেলাম। রিহান হটাত আহত হল। বিপক্ষ দলের একজন খেলোয়াড়ের পায়ের আঘাতে আহত হল সে। রিহান আর কিশোর আমাদের দলের স্ট্রাইকার । আরেকজন আমি। বেগতিক দেখে আমাকেই মাঠে নামাতে বাধ্য হল সে। খেলা তখন ৮৭ মিনিট। কোন দল গোল দিতে পারে নাই। রহমতপুর বিদ্যালয়ের টিমটা খুব দুর্বল দল। এই ম্যাচে ড্র হলে কিশোরের ক্যাপ্টেন্সি নিয়ে কথা উঠবে।

শেষ মিনিটে একটি সুযোগ পেলো কিশোর । কিন্তু গোল পোস্টে বল বাইরে দিয়ে চলে যাচ্ছিলো। হতাশায় কিশোর মাঠে বসে পড়লো। কিন্তু আমি বিদ্যুৎ গতি তে এগিয়ে এসে গোল দিয়ে দিলাম। এই গোল টি হবে এটা কেউ আশা করে নাই। পুরো এলাকাবাসী চিৎকার করে উঠলো । ১-০ গোলে আমরা জিতলাম। কিশোর কেমন এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলও। সে বিশ্বাস করতে পারছিল না। আমি তার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপলাম আর হাসলাম । সে কিছুক্ষণ বোকার মত আমার দিকে তাকিয়ে হাসল।

রেহান আর সবুজ এসে কিশোর কে ঘাড়ে তুলে গোটা মাঠ চক্কর দিচ্ছে । রকিব এসে আমার ঘাড়ে হাত রেখে বলল-

-দারুণ খেলেছিস বস। তোর জন্য জিতলাম। আর দেখ রেহান আর সবুজ কে। মনে হচ্ছে যেন কিশোর জিতিয়েছে।

-আরে রাখ। একজন জিতালেই হলও। ওদের আনন্দ করতে দে না। আমার তো বেশ লাগছে

বিকেল হয়ে যাচ্ছে। বাড়ি ফেরা দরকার। যাত্রা পথে আবার কিশোর, রেহান আর সবুজের সাথে দেখা।

রেহান আর সবুজ আমাকে দেখে মুখ ঘুরিয়ে নিলো । কিন্তু কিশোর হটাত এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল-

-সত্যি তুই না থাকলে ম্যাচ জিততে পারতাম না। আমার ক্যাপ্টেন্সি বাতিল হয়ে যেত।

আমি বললাম-

-কারো ক্যাপ্টেন্সি বাতিল করার জন্য আমি খেলি না। আমি খেলি নিজের আনন্দে, মানুষ কে আনন্দ দিতে আর স্কুলের মান রক্ষা করার জন্য।

আমি চলে যাচ্ছিলাম এই কথা গুলো বলে। পিছন থেকে কিশোর ডাকল-

-আমাদের বন্ধু হবি?

আমি বললাম-

-বন্ধু কি ইচ্ছা করলেই হওয়া যায়? তাতো আপনা আপনি হয়ে যায়।

কিশোর মুখ কালো করে ফেললো। ও মনে করছে আমি বুঝি বন্ধু হতে চাই না। আমি এগিয়ে এসে বললাম-

-একই স্কুলে একই ক্লাসে পড়ি । একই ফুটবল টিমে খেলি। আমি তো তোদের কে আমার বন্ধু অনেক আগে থেকেই মনে করি।

কিশোর হেসে বলল

-ওয়েলকাম টু আওয়ার  ফ্যামিলি।

এরপর থেকে আমি তাদের খুব ভাল বন্ধু হয়ে গেলাম। ক্লাসে এক সাথে বসতাম। আড্ডা দিতাম। ক্লাস শেষে এক সাথে বাড়ি ফিরতাম। ক্লাস ফাঁকি দিয়ে সিনেমা দেখা কিছুই বাকি রইলো না।

গ্রীষ্মকালীন বন্ধ হবে। পুরো এক মাসের বন্ধ। সবাই ছুটি কাঁটাতে গিয়েছে। নানা বাড়ি নয় দাদা বাড়ি। আমি শুধু বাসায়। কিশোর , সবুজ আর রেহান তিন জনই শহরের বাইরে। আমার খুব বোরিং সময় কাটতে লাগলো। কিছুই করার নেই। গল্পের বই পড়ে আর সিনেমা দেখে আর কত সময় কাটানো যায়।

একদিন দুপুরে কিশোর এসে উপস্থিত। আমি তো অবাক।

-তুই এই সময়।

-কেনও আসতে পারি না?

-আরে তোর না দাদা বাড়ি যাওয়ার কথা?

-আরে ভাল লাগছিলো না চলে আসছি। কাজিনরা এবার আসে নাই। কোন বন্ধু নেই। ভাবলাম শহরে অন্তত তুই তো আছিস।

-আয় ভিতরে।

আমার ঘরে যেয়ে বসলাম।ঘর জুড়ে আমার অসংখ্য গল্পের বই। আমি বইয়ের পোকা। সব ধরনের বই আমি পড়ি। এমনকি বইমেলায় ঢাকা যেয়ে বই কিনে আনি। কিশোর তো আমার বই এর কালেকশন দেখে অবাক। কিশোর অনেক বই পড়ে কিন্তু আমার মত নয়। আমরা শুরু করলাম গল্পের বইএর আলাপ। আমার প্রিয় লেখক শাহরিয়ার কবির। তার লেখা নুলিয়াছড়ির সোনার পাহাড় আমার ফেভারিট। আর কিশোরের পছন্দ জাফর ইকবাল স্যারের বই। দুষ্টু ছেলের দল তার প্রিয়।

রকিব হাসানের তিন গোয়েন্দার সব বই আমার কালেকশন আছে। কিশোরের অবশ্য তিন গোয়েন্দার চেয়ে হরর-ক্লাব  বেশী পছন্দ। এদিকে কলকাতার বইয়ের আলোচনা চলে আসলো। ফেলুদা আমরা ২ জনই পড়ি। আনন্দমেলার শারদীয় দুর্গাপূজার বিশেষ সংখ্যা কিনতে আমরা ভুলি না। কাকাবাবু, কিকিরা, শিরশেন্দুর মজার ভুতের গল্প আমাদের পড়া চাই ।

কথায় কথায় আড্যাল্ট বই এর প্রসঙ্গ চলে এলো। লুকিয়ে লুকিয়ে মাসুদ রানা আমরা ২ জন ই পড়েছি।এখন সুনীল আর সমরেশের বই ও পড়ি । আর হুমায়ুন আহমেদ তো রয়েছেন।

বইয়ের আলাপ শেষ হতেই মুভি, নাটকের প্রসঙ্গ চলে এলো। বসে বসে ২ জন মিলে হোম এলন দেখলাম। বিকেল হয়ে এলো গল্প গল্প করতে করতে।

কিশোর বলল-

-চল বাইরে থেকে ঘুরে আসি।

-কোথায় ?

-পাড়ায় ।

-কিন্তু আমি তো কাউকে চিনি না।

-আমি পরিচিত করিয়ে দিবো ।

বিকেলের নরম আলোয় বের হলাম দুইজন। প্রথমে আমরা গেলাম পার ক্লাবে। আমি জানতামই না এখানে ক্লাব আছে। এই ক্লাব থেকে খেলা হয় । সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। সমাজ সেবা হয়।

ক্লাবের প্রধান বাবুল ভাইয়ের সাথে পরিচিত হলাম। আমি এই পাড়ায় থাকি বলে আমাকে তিনি মেম্বার করে নিলেন। বললেন কালকে একটা ফুটবল ম্যাচ আছে। আমরা যেনও চলে আসি।

ব্যাগে করে গেঞ্জি আর হাফ প্যান্ট নিয়ে মাঠে গেলাম পরেরদিন। অনেকদিন পর খেলতে নামবো। উত্তেজনা কাজ করছে। কিন্তু খেলার মাঝে আকাশ মেঘলা হয়ে গেলো। হটাত ঝুম বৃষ্টি নামলো। বৃষ্টির মাঝেই খেলা চলতে লাগলো। হটাত করে আসা বৃষ্টি হটাত করে চলে গেলো। খেলাউ শেষ হলও । কাদা মাঠে খেলতে খেলতে সারা শরীরে কাদা মেখে আছে। এই অবস্থায় বাড়ি গেলে চরম বকা খেতে হবে। কিশোর বলল-

-চল পুকুরে যেয়ে গোসল করি।

আমরা পুকুর ঘাটে যেয়ে দেখলাম কেউ নাই। আমরা ভাবলাম ভালই হলও । নিশ্চিন্তে কাপড় চোপড়  খুলে পুকুরে নামলাম। অনেকক্ষণ পুকুরে দাপাদাপি করলাম। মনে হলও শরীরটা ঠাণ্ডা হলও। পুকুর থেকে উঠলাম । হটাত কি হল । কিশোরের অনাবৃত ভেজা শরীর দেখে আমি চোখ ফেরাতে পারছিলাম না। আমার এই একটা সমস্যা। আমি শুধু ছেলেদের দেখলে এমন হয়। কিন্তু পুরো ক্লাস জুড়ে ছেলেরা মেয়েদের দেহ নিয়ে হৈচৈ করে। কিন্তু আমার উলটা ছেলেদের আমাদের পছন্দ। আমি একটা বই পড়ে জেনেছি সমকামী দের এমন হয়। আমি সমকামী। ভাবতেই কেমন বিষণ্ণ লাগে। আমার মত কেউ কি নেই? কাউকে বলতেও পারি না।

এদিকে কিশোর আমার দিকে কেমন ভাবে তাকাচ্ছে। তাহলে  কি তার মনে একই চিন্তা ঘুরছে? আমাকে জানতেই হবে। আমি সরাসরি কিশোরের চোখের দিকে তাকালাম। সে লজ্জা পেয়ে চোখ সরিয়ে নিলো।আমি কিছুই বুঝলাম না। মাথা থেকে জোর করে চিন্তা টা দূর করলাম।

বাড়ি ফিরলাম। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হচ্ছে। নিশ্চয়ই বকা খাবো। কিশোরের বাসায় আঙ্কল ছাড়া কেউ নাই।আঙ্কল বাড়ি ফিরবেন অনেক রাতে। আনটি গ্রামে বেরাতে গিয়েছেন । দেরি করলেও ফিরলেও সমস্যা নাই। আমি বাড়ি গিয়ে দেখি দরজায় বড় একটা তালা ঝুলছে। দরজার উপর একটি চিরকুট স্কচ-টেপ দিয়ে লাগানো। লেখা যে সবাই বিয়ে বাড়ি গিয়েছে। পাশের বাসায় চাবি রয়েছে।

আমার একা থাকতে ভয় লাগে। কিশোর কে বললাম থাকতে। আমার ঘরে যেয়ে বসলাম। চা করে দুইজন খাচ্ছি। হটাত কিশোর বলল-

-তুই কক্ষনও চটি পড়েছিস?

-নারে

-পর্ণ দেখেছিস?

-না

-তাহলে তুই কি দেখেছিস?

-আমি চুপ করে ভাবছি আমি কি স্টুপিড । এগুলো আমি দেখি নাই। আমার জীবন তো বৃথা।

-তুই সমকামী মানে জানিস?

এইবার আমার ভয় লাগলো । আমি এইটার মানে জানি। আর আমি তো এমনই। ভয় লাগছে। বলা কি ঠিক হবে?

-না মানে

-আরে আমার কাছে লুকচ্ছিস কেনও ? আমি তোর বেস্ট ফ্রেন্ড। আমি সমকামী।

এই কথা টা শুনার জন্যই আমি যেন অপেক্ষা করছিলাম।

-আমিও সমকামী ।

-সে আমি পুকুর ঘাটে দেখেই বুঝেছি। সেক্স করেছিস?

-ছিঃ । না

-ছিঃ বলার কি আছে। সেক্স সবাই করে।

-তুই করেছিস?

-হ্যাঁ করেছি। আমার এক্স বয় ফ্রেন্ডের সাথে।

-তোর এক্স বয় ফ্রেন্ড?

-হ্যাঁ আমার কাজিন। তার সাথেই সেক্স করতাম। আসলে তোর নেট নেই তো তাই কিছুই তুই জানিস না। আমি নেট ঘেঁটে কত কিছু জেনেছি।জানিস আমার কাজিন গত বছর যখন দেশের বাইরে চলে গেলো আমার জীবন টা স্থবির হয়ে গিয়েছিলো । আমি এখন অনেক একা। আমার বয় ফ্রেন্ড হবি?

আমার মুখ থেকে হটাত বের হয়ে এলো

-হবো

সেদিন আমি তেমন কোন চিন্তা ভাবনা না করেই বলেছিলাম হবো। কিন্তু পরে বুঝেছিলাম ভুল সিদ্ধান্ত নেই নাই। আমাদের ভালবাসা হলও এক বৃষ্টি ভেজা রাতে। কিশোর আমাকে তার আপন করে দুই বাহু দিয়ে জড়িয়ে ধরেছিলও। সেদিন বাসায় কেউ ছিল না। আর বাইরে ছিলও ঝুম বৃষ্টি। আমি চোখ রেখেছিলাম কিশোরের মাদকতা পূর্ণ চোখে। এতো অল্প বয়সেই জীবনের এই লুকানো অধ্যায় খুঁজে পেয়েছিলাম আমরা। তা নোনতা ঠোঁটের স্পর্শ আমাকে অস্থির করে দিচ্ছিলও । আমরা মিলিত হলাম সেই রাতেই।

বাইরের আমাদের মেলামেশা আগের থেকে অনেক বাড়লও। একদিন ও তাকে দেখে থাকতে পারি না। যেখানেই যাবো ২ জন মিলে যাবো। পাহাড়ে ঘুরে বেড়াই। নদীর ধারে বসে সূর্যাস্ত দেখি। একসাথে একই বই ২ জন মিলে পড়ি। আর ক্লাবে যাওয়া তো রয়েছেই। আমদের সবাই মানিকজোড় বলে।

গ্রীষ্মের ছুটি শেষ হয়ে এলো । আবার ক্লাস শুরু হলও । স্কুল খুলতেই শুরু হলও ফুটবল খেলা প্র্যাকটিস। এই বার খেলা  রসুলপুরের সাথে। শক্তি শালী দল। আমরা ক্লাস শেষ প্রতিদিন প্র্যাকটিসে যাই। আর এক সপ্তাহ বাকি। তখন ঘটলো দুর্ঘটনা। আমি পা পিছলে পড়ে পা ভাঙলাম। আমার পা প্লাস্টার করে ১ মাস ঘরে পড়ে থাকতে হবে। খেলতে পারবো না। এই কষ্টে চোখে পানি এসে গেলো।

সারা দিন বাসায় শুয়ে আছি। খুব বোরিং লাগছে। সবাই নিশ্চয় খুব প্র্যাকটিস করছে। আমার খুব অভিমান। একাই একাই খেলছে আমাকে রেখে। এই নাকি আমার বয় ফ্রেন্ড। সন্ধ্যা হয়ে এলো। হটাত নিচে শুনছি হই হই শব্দ। এতো হইচই কিসের ভাবছি। আম্মুর গলাও শুনা যাচ্ছে। কিছু ক্ষণ পর দেখলাম সিঁড়ি বেয়ে আমার ফুটবল টিমের সবাই আমার ঘরে উপস্থিত। আমাকে দেখতে এসেছে। ওরাই হৈচৈ করছিলো নিচে। সব্বাই এসেছে। কিশোর , সবুজ, রকিব,রেহান সবাই। কিশোরের হাতে এক গাদা বই। সবাই মিলে আমার জন্য কিনে এনেছে। আমার যাতে বোরিং সময় কাটাতে না হয়।

সবাই চলে গেলে কিশোর কিছুক্ষণ আরো বেশীক্ষণ থাকলো আমার সাথে একান্তে কথা বলার জন্য-

-তুই না খেললে আমিও খেলতে চাইছি না। তুই বিছানায় পড়ে থাকবি আর আমি খেলতে যাবো।

এই কথা শুনে আমার অভিমান সব চলে গেলো । আমি বললাম-

-তুই পাগল হয়েছিস? তুই না থাকলে আমার টিম হারবে। আমি এটা মেনেই নিতে পারবো না। তোর খেলতে হবে আর জিততেই হবে।

কিশোর আমার হাত ধরে বললো

-আমরা জিতবো

এর পর থেকে প্রতিদিন প্র্যাকটিস শেষে আমার সাথে দেখা করতো

যেদিন খেলা হবে সেদিন কিশোর খুব মনমরা হয়ে বসে ছিল আমার বিছানায়। ওর নাকি যেতে ইচ্ছে করছে না। আমি বললাম

-তুই না খেললে , না গেলে তোর সাথে আমার আর কথাই নাই।

কিশোর আমার ঠোঁটে একটা চুমু দিয়ে চলে গেলও ।

বিকেলে খেলা । আর আমার সকাল থেকেই অস্থির লাগছে। আমি খেলা দেখতেও যেতে পারছি না। পা তে ব্যথা না পেয়ে যদি হাতে ব্যথা পেলেও তে অন্তত আমি খেলা দেখতে যেতে পারতাম।

বিকেল ৫টা । খেলা শেষ। ওদের কারো কাছেই মোবাইল নেই। স্যারের কাছে আছে। স্যারের কাছে মোবাইল আছে। ইচ্ছা হচ্ছে স্যারের মোবাইলে ফোন করে খেলার খবর জানতে। কিন্তু ফোন করতে অস্বস্তি লাগছিল। যদি আমার টিম না জিতে স্যারের মেজাজ তো ভাল থাকবে না। বকাও দিতে পারে। অনেক ভেবে আব্বু কে দিয়ে ফোন করালাম।

আব্বু হাসতে হাসতে বলল-

-তোর টিম তো জিতেছে। কিশোর ২ টা গোল দিয়েছে। আমি আনন্দে চিৎকার করলাম।

আব্বু বলল-

-তোর টিমের সবাইকে মিষ্টি খাওয়াবো। মিষ্টি নিয়ে আসি।

আব্বু মিষ্টি আনতে গেলেন।

আমি অপেক্ষা করছি। না আসছে আব্বু না কিশোর। কিশোর বলেছিলও শহরে ফিরে আমার সাথে দেখা করবে।

কিছুক্ষণ পর আব্বু আসলো। মুখ কালো। মিষ্টি নেই সাথে। আমি বললাম

-আব্বু মিষ্টি কোথায় ?

আব্বুর চোখ থেকে পানি পড়ছে। কাছে এসে জড়িয়ে ধরলও আমাকে। আম্মু আসলেন আব্বুর কান্না দেখে।আব্বু বললও-

-পাহাড়ি রাস্তা। বৃষ্টি পড়ছিল। তোর স্কুলের বাস গতি সামলাতে না পেরে খাঁদে পড়েছে । সবাই স্পট ডেড ।

আমার মাথা কাজ করছিল না। একি বলল আব্বু-

-আব্বু সবাই ডেড ?

আব্বু নিঃশব্দে কাঁদছে । আমার কান্না আসছে না। সবাই ডেড মানে তো কিশোর আর বেঁচে নেই। তাহলে তো কিশোর আর কখনই কথা বলবে না। খেলবে না। আমি কিভাবে থাকবো একা? কিভাবে ২ জন মিলে লুকিয়ে লুকিয়ে মাসুদ রানা পড়বো ? আর কখনই তো এক সাথে পুকুরে দাপাদাপি করা হবে না। হাত ধরে সূর্যাস্ত দেখা হবে না। এইবার আমার কান্না পাচ্ছে। ভীষণ ।আম্মু কে জড়িয়ে ধরে কাঁদছি।

খাঁদের ধারে আমি বসে আছি । জোর করে আমি এসেছি। আমাকে নিতে চায় নাই আব্বু। এই ভাঙ্গা পায়ে আমি এসেছি। খাঁদ থেকে ডেড বডি গুলো তোলা হলও। এই তো সবুজ। নিথর হয়ে পড়ে রয়েছে। আর ঐখানে রেহান। আমাকে সে হিংসা করতো। কিন্তু তাকে  এই অবস্থায় দেখে আমার প্রাণ হুহু করে উঠলো। রকিব আমার এই স্কুলের প্রথম বন্ধু। আর কখনই আমার ঘাড়ে হাত রেখে বলবে না বস সেরাম খেলেছিস।

বাসেত স্যারের ডেড বডি তোলা হলও। মুখটাতে এক চিলতে হাসি। তার মত শিক্ষক আমার জীবনে আর পাই নাই। স্যারের ডেড বডি দেখে আব্বু চুপ থাকতে পারলেন না। চোখ থেকে পানি পড়ছে।

সব ডেড বডি তোলা হলও। চারিদিকে কান্নার রোল পড়েছে। সবার আত্মীয়স্বজন চলে এসেছে। আমি কিশোরের ডেড বডি দেখি নাই। দেখতে চাই নাই। তার মুখটা বিকৃত হয়ে গিয়েছে। আমি চাই নাই যখন তার কথা ভাববো তখন তার এই মুখটা আমার চোখে ভেসে উঠুক। তার সেই সুন্দর চেহারা যেনও আমার মনে থাকে।

সেইদিনের পর আমাদের ক্লাসে এক নীরবতা নেমে এলো। যারা ক্লাসটিকে জীবনী শক্তি দিয়ে ভরে রাখতো তারা আজ আর নেই। আমি কেমন হয়ে গিয়েছি। হাসতে পারি না। কাঁদি না। সন্ধ্যায় সোডিয়াম লাইটের আলো তে হাঁটি একা একা। মনে পড়ে কিশোরের হাত ধরে রাস্তায় হেঁটে বেড়ানোর কথা। আমার বয় ফ্রেন্ড আমাকে ছেড়ে চলে গেলও। আমি তো একা হয়ে গেলাম।

আব্বু আমাকে ডাক্তার দেখালেন।ডাক্তার বললেন আমাকে এই শহর থেকে নিয়ে যেতে । আব্বু অনেক চেষ্টা করে ঢাকায় বদলী হলেন।

 

নতুন স্কুল নতুন ক্লাস।

আমি এক কোনায় বসে আছি । একটা ছেলে এসে হাত মেলাল।

-হাই আমি আকাশ

-আমি নিশু

-আমি এই স্কুলের ফুটবল টিমের ক্যাপ্টেন। আমাদের একজন প্লেয়ার কম আছে। তুমি ফুটবল খেলো ?

আমি বললাম-

-না।

 

ব্রাজিলের জয়ধ্বনি এখনো চলছে। আর্জেন্টিনার জন্য খারাপ লাগছে। কারন কিশোরের প্রিয় দল ছিল আর্জেন্টিনা। তার সাথে কত খুনসুটি হত ব্রাজিল আর্জেন্টিনা নিয়ে। অথচ আজ আমি আর্জেন্টিনার পরাজয় চাইনা। ভালবাসলে এমনই হয়। হই চই থেমেছে। আবার বাড়ি ফিরে যাচ্ছি । প্রচণ্ড মাথা ব্যথা হচ্ছে। চোখে অযথাই পানি জমছে। অস্পষ্ট লাগছে সব কিছু। আমার ঘুমোতে হবে……।গভীর ঘুম……।