প্রতীতি       

আমার ২৩ বছরের জীবনে মানুষের আনাগোনা নেহায়েত কম। সাধারণত একা একা থাকতেই বেশ পছন্দ করি। কিন্তু মানুষ ছাড়া এ সামাজিক জীব কি বাঁচতে পারে? ছোটবেলা থেকে পড়ে এসেছি মানুষ সামাজিক জীব। তার চারপাশে রয়েছে নানা উপাদান। ইত্যাদি ইত্যাদি। ছোটবেলা বিনা দ্বিধায় মুখস্থ করতাম তবুও বাক্যগুলো বোধগম্য হতো না।  ধীরে ধীরে বয়স বাড়তে থাকলে বুঝা শুরু করি অন্তত আমি সামাজিক জীব নই। তাহলে কি আমি মানুষ নই? বিরাট এই এক প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাওয়া শুরু করলে নিজেকে অতি বুদ্ধিমান হিসেবে দাবি করার সুযোগ পাই। গম্ভীর-মুখে ক্লাসে, ক্যান্টিনে, স্কুলের দোলনায়, বাসায় পড়ার টেবিলে, বারান্দার মেঝেতে বসে এই একই প্রশ্ন নিয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন থাকতে লাগলাম। হঠাৎ অনুধাবন করলাম, আমি এখন ২৩!

কথাটা শুনে হয়তো ভাবতে পারেন মানুষ কি মানুষ না প্রশ্নটি ভাবতে ভাবতেই বড় হয়ে গেলাম আর টের পেলাম না! সত্য। কিন্তু তা আধা সত্য। আমি প্রত্যেকটা পরিস্থিতিতে তা বুঝতে পারছিলাম তবে আমার মধ্যে এড়িয়ে যাওয়া স্বভাব প্রগাঢ়। স্কুল-কলেজে ক্লাস শেষে আড্ডা আমার কাছে বিষের মতো। সারাক্ষণ ভাবুক চেহারা নিয়ে ঘুরাফেরা করতাম। আমার চেহারার অবস্থা দেখে কাছের বন্ধুরাও কথা বলতে এলে ৪বার ভাবতো। আবার প্রশ্ন জাগতে পারে কেন এমন ভাবুক-গম্ভীর চেহারা করে রাখতাম। শুনুন! প্রত্যেকটি মানুষ আলাদা এবং তাদের বৈশিষ্ট্যও! গতানুগতিক ধারাগুলো আমার কাছে বিচ্ছিরী লাগে। সবাই কেন একই প্রকার কাজ করবে? যেমন বেশীরভাগ মানুষ ‘গেইম অফ থ্রোন্স’ পছন্দ করে। এই এক টিভি সিরিয়াল প্রতি মানুষজনের আগ্রহ দেখে অবাক হই। এক বৈঠকে ২টা সিজন শেষ করলাম কিন্তু আমাকে আকর্ষণ করতে পারলো না। আচ্ছা নিজেকে ব্যতিক্রম প্রমাণ করার তুলনাটা কি সঠিক হল? আমার সন্দেহ হচ্ছে। অনেকে সিরিয়ালটি নাই পছন্দ করতে পারে। আমি তো একা নই!

বেশীরভাগ ক্লাসমেটদের সাথে কথা বলার বিষয় পেতাম না। তাদের বিষয় আর আমার বিষয় যেন ভিন্ন মেরুর। নিজেকে ক্লাস ১০ এ থাকার সময় এলিয়েন হিসেবে আখ্যায়িত করি। অবশ্য আমি নিজেই সেটা ঢাকঢোল পিটিয়ে সবাইকে জানান দেই। মানুষের বিকৃত-মুখ দেখতে আমি খুব পছন্দ করি।

আমার বাবা-মা আমাকে নিয়ে বরাবরের মতো হতাশ। এখনও। আমার একটা দীর্ঘস্থায়ী বন্ধু নেই। সারাক্ষণ বাসায় কম্পিউটার গুঁতাগুঁতি নাহলে বিছানায় গড়াগড়ি করে বই পড়া। ক্লাস শেষ করে বাকিসময় বাসায় পড়ে থাকি। এমন রসহীন জীবন কিভাবে আমি কাটাই তারা বুঝতে পারছে না। কিন্তু তারাই অনেকাংশ দায়ী সেটা তারা স্বীকার করতে চায় না। ছোটবেলায় গৃহবন্দী করে তারাই বলতো বাইরের ছেলেপেলেরা খারাপ। বাইরে খেলার সুযোগ তো দূরের কথা বাসার নিচে নামতেই দিতো না। ঘর কেন্দ্রিক অভ্যাস আপনাআপনি তৈরি হয়নি। সময় ও পরিস্থিতি আদৌতে সৃষ্টি হয়েছে। তখন কার্টুন, বই পড়া আর চুপচাপ বসে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। আর এখন? ইন্টারনেটের নেশায় আক্রান্ত। বাবা-মায়েরা কি চায় সেটা তারা নিজেও জানে না। এই বলে খেলাধুলো করো না আবার বলে ঘরে বসে মনিটরের সামনে তাকিয়ে থেকো না। যেন উভয় সংকট।

পড়াশুনায় ভালো নয় অত্যধিক ভালো ছিলাম। ক্লাসে পাঁচের মধ্যে থাকতাম সবসময়। ভালো ছাত্রদের মধ্যে আলাদা প্রকার অহংকার ছোটবেলা থেকেই গেঁথে বসে। দিন যতই যায় ততই টগবগিয়ে বাড়তে থাকে। নিষেধ করার মতো বা বাঁধা দেওয়ার মতো বা ধরিয়ে দেওয়ার মতো কেউ থাকে না। থাকলেও তারা দিতে চায় না। কারণ ভালো ছাত্র মানে তারা সাধারণ মানুষ নয়। তারা অন্যকিছু। তারা সাধারণ মানুষের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর দেখতে সুন্দর হলে তো আর কোন কথাই নেই। সমাজ তোমাকে আলাদা করে মাথায় চড়িয়ে রাখবে। যতই সুন্দর মানব তুমি ততই তোমার প্রাধান্য। আমার সৌন্দর্য স্কেল দিয়ে মাপা হলে ৫ ইঞ্চির স্কেলে সাড়ে তিন উঠবে। অবশ্য এটা আমার কথা নয়, চারপাশের মানুষের ধারণা। প্রথম প্লাস পয়েন্ট আমি ৬ফুট লম্বা। আর রোগা হলেও ফর্সা মানব দেখলে সমাজের আলাদা সহানুভূতি নয় প্রেম জেগে উঠে। সমাজের এহেন রঙ বৈষম্য এড়ানো সম্ভব নয়। আমরা এমন এক ছকে গড়ে উঠি যেখানে পিচ্চিকাল থেকে আমাদেরকে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দেওয়া হয় সুন্দর-কুৎসিতের পার্থক্য। আর এই গুপ্ত জগতে তো সোনায় সোহাগা। গুপ্ত জগত? ইহা কি?

গুপ্ত জগত হল যারা একই লিঙ্গের মানুষদের পছন্দ করে কিন্তু নিজের আসল পরিচয় করে গোপন পরিচয়ে মানুষের সঙ্গে ফেসবুকে যোগাযোগ করে। এখানেই লুকিয়ে থাকে সমমনা মানুষ।

কিন্তু আসলেও যারা সমাজের স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত তারা কি সত্যি দুঃখিত? হুর! মোটেও নয়। বেশীরভাগ মানুষের মাথা অধিকার শব্দটাকে প্রত্যাখ্যান করে। আরে ভাই! একটা বয়-ফ্রেন্ড জোগাড় করবো আর কিছু ফ্রেন্ড থাকবে। ব্যস। ওসব ঝামেলায় কে যায়! আর কিছু আছে যারা সেক্স-সেক্স-সেক্স বলে মুখের ফ্যানা উঠিয়ে ফেলে। আর কিছু অধিকার নিয়ে কথা বলে।

আমি একটা শ্রেণির মধ্যেও পড়ি না।

তাহলে আমি কি?

আমি নিজের জন্য একটি শ্রেণি গঠন করেছি। যে কিনা সবার কার্যক্রমও দেখবে, সমলোচনাও করবে। বাহবাও দিবে আবার অপমানও করবে।

আচ্ছা এখানকার মানুষ বলে খুব Racist? জী। একদম সত্য কথা।

যারা সমাজের নিয়ম অনুসারে কুৎসিত শ্রেণিতে পড়ে তারা সুন্দর ছেলেদের পিছনে ঘুরাঘুরি করে। পাত্তা না পেলে দুনিয়া রটিয়ে মিথ্যাচার ও গালিগালাজ। যেন সাধারণ ছেলেদের দামই দিতে পছন্দ করে না।

আর কিছু তথাকথিত সুন্দর ছেলে নিজেদের অপরূপ সৌন্দর্যের অধিকারী দাবি করে সারা দুনিয়া কাঁপিয়ে তুলে।

আর আমি? ফর্সা ভাঙা চেহারা অধিকারী ছেলেটা মাঝেমধ্যে পাত্তা পায়। কিন্তু আমি মুখিয়ে থাকি সে মানুষের দিকে যার কিনা মাথায় ঢের মণ  বুদ্ধি আছে।  এই থিউরি যতই কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে চাইলেও সুন্দর মুখওয়ালা, বডি-বিল্ডার মানুষ দেখলে লোভ সামলানো যায় না। তখন নিজের রোগা শরীরের দিকে তাকিয়ে খোদার নিকট একশোটা অভিযোগ তোলা হয়।

ডেটিং- অ্যাপগুলো ভালোই চলছে বাংলাদেশে। আমি ‘গ্রাইন্ডার’ এ রেগুলার ইউজার।  সুন্দর ছেলেপেলে দেখার জন্য সেখানে ঘুরি নাকি গুঁতাগুঁতি করার জন্য সেটা স্পষ্ট করে বলবো না। তবে সেখানে অনেকাংশ ব্যর্থ আমি। সুন্দর শরীরওয়ালা, পাতলা ঠোঁট, লম্বা চিবুক আর বড় চুক্ষুওয়ালা ছেলেগুলো পাত্তা পাওয়া সম্ভব হয় না। অনেক গুঁতিয়ে নিজের মান-সন্মান হানি করতেও ইচ্ছা করে না। তখন রাজ্যের প্রশ্ন মাথায় আসে। মূল প্রশ্ন হল, তারা পছন্দটা করে কাকে?

চোখমুখ কুঁচকে কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছি। মাঝেমধ্যে নিজের কর্মকাণ্ডে হতাশা খুঁজে পাই। সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলার স্বভাব তৈরি করতে পারিনি। আজকাল সবকিছুর মধ্যে খুঁত ধরতে উদগ্রীব থাকি। গ্রাইন্ডার নামক ডেটিং অ্যাপ এক সুদর্শন ছাওয়ালের সঙ্গে পরিচয়। ছেলের নাম মইন। ফর্সা গোলগাল চেহারা। মাথায় বাহারি হেয়ার-কাট। মুখে দাঁড়ির ‘দ’ ও নেই। ঠোঁটগুলো মোটা কিন্তু তাতে হালকা কালো ছাপ পড়েছে। স্মোকিং করে। ছেলের ছবি দেখে আন্দাজ করা যায়, ভালো ওজন আছে! ছেলের কথাবার্তা একটু ভিন্ন প্রকৃতির। গতানুগতিক পোলাপানদের মতো নয়। আলাপ করে ভালো লাগার পর ফেসবুক ফ্রেন্ড হলাম। কিন্তু এখন তার কথাবার্তায় বিরক্ত হচ্ছি খুব। ছেলে বাংলা পড়তে পারে না! কি আজব! বাঙালি হয়েও বাঙলা না পড়ার গ্লানি অনুভব হয় না তার?

আমি উত্তরে লিখলাম, বাঙালি হয়ে বাঙলা পড়তে পারো না ? খারাপ লাগে না?

মইন লিখলো, আগে লাগতো। এখন আর লাগে না। দরকার কি! সব কাজ তো ইংরেজিতেই চলে। বাংলা খালি কথা বলার জন্য লাগে।

আমি রাগ চাপতে চাপতে লিখলাম, ওহ আচ্ছা। টিপিকাল ইংলিশ মিডিয়াম স্টুডেন্ট।

-হা হা হা। আমি এটার জন্যেই অপেক্ষা করছিলাম। তোমরা বাংলা মিডিয়ামের মানুষগুলা খালি আমাদের পচাও ফার্মের মুরগি বলে। কি মজা পাও?

-আচ্ছা ওসব কথা না বলাই ঠিক হবে।

-হ্যাঁ। এখন তোমার সেক্স লাইফ সম্পর্কে বোলো। কেমন যাচ্ছে?

-হা হা হা। ভালো না। আকাল যাচ্ছে।

-তা হবে কেন? শুনেছি বেডে তুমি অনেক ভালো। অনেক ওয়াইল্ড!

আমি প্রচণ্ড অবাক হবার ভান করতে গিয়েও পারলাম না। অবাক রাগে পরিণত হল। আমি আমার ব্যক্তিগত জীবনের সেক্স-গাঁথা কারোর সঙ্গে শেয়ার করি না। যেহেতু আমার বন্ধুর সংখ্যা কম সেহেতু প্রশ্নই উঠে না। আমি লিখলাম, একটু খোলাসা করে বলবে?

-সাধু সাইজো না সামিন! আমি গত ঈদের পরের দিনের কাহিনি জানি। শাহরিয়ার আমাকে সব বলেছে।

আমি স্তব্ধ হয়ে স্ক্রিনের দিকে চেয়ে থাকলাম। সচরাচর আমি হার মানি না। যতক্ষণ শক্তি থাকে ততক্ষণ তর্ক চালিয়ে যাই। ঝগড়া করার বাতিক আছে। তবে এই মুহূর্তে আমি মূর্তির মতো চেয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করতে পারছি না।

শাহরিয়ার নামক ছেলেটি এককালে কাঁটা হয়ে গলায় বিঁধবে সেটা জানা থাকলে পরিচয়ের প্রথম দিনই তাকে নিজ হাতে বিদায় দিতাম। জীবন থেকে।

এই ছাওয়ালের সঙ্গেও পরিচয় গ্রাইন্ডারে। ডেটিং অ্যাপ আসলে সাপের মতো। কখন যে ছোবল মারে তা টের পাওয়া যায় না। সমবয়সী ছেলেটা সদ্য বিলেত থেকে এসেছে। কদিন বেড়াবে দেশে। আর প্রথম দিনেই খুলে বসে গ্রাইন্ডার। আর যেহেতু আমার অঢেল সময় তাই ওঁত পেতে বসে থাকি। কখন ভাগ্যের জোরে পেয়ে বসি সেই কাঙ্ক্ষিত মানুষের সন্ধান! এহ! কল্পলতা!

প্রথম দিনেই ফোনে টানা ৫ ঘণ্টা কথা বললাম। তারপরের এক সপ্তাহ টানা কথা বলতে লাগলাম। আমার মধ্যে অদ্ভুত টান আসা শুরু করে। তার সঙ্গে কথা বলা যেন নেশায় পরিণত হয়েছিল। দেখতে পুরো আমার কার্বন-কপি। শুধু উচ্চতায় আমার চেয়ে খাটো। পাশাপাশি দাড় করালে দুই ভাই লাগবে। ঝটিকা প্রেমের আভাস পেলাম। দুনিয়া কাঁপিয়ে মনে ঝড় আসছে অনুভব করলাম। ফোনেই এতোসব হলে সামনাসামনি দেখলে কি অজ্ঞান হয়ে যাবো? আমি সুযোগ দিতে চাইলাম। আমি জানতাম হুট-হাট সিদ্ধান্ত না নেওয়াই উত্তম। ঝটিকা প্রেমের রেশ থাকে বড়োজোর মাস-খানেক। তারপর কই উড়ে যায় তার ইয়ত্তা নেই।

দেখা না করেই শাহরিয়ার চলে গেলো। যোগাযোগে বাঁধা পড়লো। আমি বুঝতে পারলাম। আমি ভালো করেই বুঝতে পারলাম, লম্বা দূরত্ব হল ভুল দূরত্ব। সবধরনের আশা ছেড়ে দিলাম। তবে আমি বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিলাম। সেটাও সম্ভব হল না। তাকে গুঁতাগুঁতি করলেও কোন উত্তর পাওয়া যেতো না। সে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।

তিন মাস পর হঠাৎ সে হাজির। ফোন করে জানান দিলো সে এখন দেশে। আমি ততদিন শাহরিয়ার জ্বর কাটিয়ে উঠতে পারিনি। আমি মাঝেমধ্যে স্বপ্ন দেখতাম সে আবার ফিরে আসবে। আমাদের জীবন সিনেমার মতো বদলে যাবে। আমি আমার কল্পনাকে ঘৃণা করতে শুরু করি। যে ছেলে প্রেমের উপন্যাস পড়ে না, সিনেমা তো দুরের কথা এখন সে মিরাকলকে আঁকড়ে ধরে বসে আছে? এ কেমন অদ্ভুত পরিবর্তন?

আসার খবর পেয়ে আমি ছুটতে ছুটতে তার সঙ্গে দেখা করতে যাই। সে আমাকে বলেছে বড়জোর ১ ঘণ্টা সময় দিতে পারবে। আমি তাতেই খুশি।

বিশাল দোতলা বাড়ি। সোনালি রঙের লোহার গেইট। আজকাল লোহার প্রচলন উঠে গেছে। গেইট দিয়ে বাড়িতে ঢুকতেই আমার চোখ জ্বলজ্বল করে জ্বলে উঠলো। এ তো এক ধনকুবেরের বাড়ি! চকচকে সোনালি রঙের আভিজাত্যে সারা বাড়ি ছেয়ে আছে। বিশাল সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠতে হয়। শাহরিয়ার ঠিক সিঁড়ির গোঁড়ায় দাঁড়িয়ে আছে। শাহরিয়ারকে দেখে আমার খুশি হবার কথা ছিল। কিন্তু যতটুকু আশা করেছিলাম ততটুকু হইনি। আমি শ্রেণিবিন্যাসে বিশ্বাস করিনা। একটা দামি জিনিস তো দুরের কথা দামি কোন হোটেলে খেতে পর্যন্ত যাই না। আমার ভালো লাগে না। সামর্থ্য যে নেই তা নয়। আমার ভালো লাগে না। চাকচিক্য পছন্দ নয়। আর এ ধনকুবেরের ছেলে ভাবতেই গা গুলিয়ে আসলো।

শাহরিয়ার আমার হাত ধরে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বিয়ে উঠতে লাগলো। দু’জন দুজনকে এই প্রথম দেখছি। একটা শব্দ এখনও বিনিময় হল না দুজনের মধ্যে। ঘরের ভিতর ঢুকে শাহরিয়ার বলল, আমাকে দেখে কি তুমি অবাক?

আমি মুচকি হেসে বলল, নাহ। মোটেও না।

-তাহলে কথা বলছ না যে?

-আমি একটু অবাক।

-তুমি যে বললা তুমি অবাক না।

-আমি অবাক হয়েছি।

-কেন?

-জানি না।

শাহরিয়ার আমার গালে আঙুল দিয়ে স্পর্শ করে বলল, আমরা কি এই দিনটার জন্য অপেক্ষা করছিলাম?

আমি জবাব দিইনি। সঙ্গে সঙ্গে তাকে কাছে টেনে ঠোঁটে চুমু খেলাম। চুমু খেতে খেতে নগ্ন হয়ে দুজনে ছিটকে পড়লাম বিছানার উপর।

‘আচমকা যৌন-ক্রিয়া’ নিয়ে অনেক প্রশ্ন মাথায় ঘুরলেও তা পাত্তা দিইনি। দুজনের যৌথ সম্মতিতে মিলিত হবার প্রক্রিয়া নিয়ে সন্দেহ করবার কোন কারণ নেই। হঠাৎ করেই হয়েছে। তবে হঠাৎ হবার পর উধাও হয়ে যাওয়ার মানে নেই। আমার কোন মেসেজের উত্তর দিলো না আর শাহরিয়ার। আমি বারবার তার সঙ্গে যোগাযোগ করবার জন্য মরিয়া হয়ে উঠি। কিন্তু, আমি ব্যর্থ। আমার চেষ্টা বিফলে গেলো। আজ আমাকে আরেক ছেলের কাছ থেকে শুনতে হচ্ছে আমি সেক্সের সময় কি করি? রাগে আমার প্রত্যেকটা অঙ্গ জ্বলছে।

আমি মইনকে লিখলাম, তুমি কিভাবে জানলে?

মইন লিখল, তুমি জানো কে আমাকে বলেছে।

-বুঝলাম।

-তো তুমি আর শাহরিয়ার তো খুব ভালো বন্ধু।

-আম… ভালো বন্ধু বলবো না। তবে বন্ধু। আর তোমার?

-শাহরিয়ারের  সঙ্গে আমি ডেট করছি।

আমি স্তম্ভিত হবার চেষ্টা করলাম আবারও। সম্ভব হল না। আমি লিখলাম, ওহ তাই?

-হুম। আমাকে শাহরিয়ার তোমার সম্পর্কে অনেক বলেছে। ইউ আর অ্যা নাইস গাই!

-আর কি বলেছে?

-আর এইতো, তোমার সেক্সিনেসের কথা।

-আর কিছু বলে নাই?

-কই না তো!

-আমরা যে একটা সময় ডেট করবার চেষ্টা করেছিলাম সেটা বলেনি?

-তাই নাকি? আমি আজকেই ওকে জিজ্ঞেস করবো।

-করে দেখো।

-আচ্ছা তোমাকে কিছু বলতে চাই।

-কি?

-আমি কি তোমার সঙ্গে করতে পারি?

-কি করতে পারো মইন?

-আমি তোমার সঙ্গে সেক্স করতে চাই।

আমরা কথায় কথায় ভাষা হারানোর ভান করি। আমি ভাষা, জ্ঞান-গরিমা, বাস্তব-অবাস্তব সব হারিয়ে ফেলেছি।

আমি লিখলাম, লোভনীয় প্রস্তাব কিন্তু আমার উত্তর না।

-কেন? আমি কি দেখতে খারাপ?

-তা নয়। কিন্তু তুমি শাহরিয়ারের সাথে প্রেম করছ।

-তাতে কি? ও কিছু মনে করবে না।

-কিন্তু আমার সমস্যা আছে।

-কেন? তুমি কি ওকে এখনও ভুলতে পারোনি? তুমি কি ওকে লাভ করো?

-নাহ। আমি ওকে ভালোবাসি না।

-তাহলে?

-আমার মধ্যে ক্ষোভ কাজ করছে।

-কি ধরণের ক্ষোভ?

-বলা যাবে না।

-এতো নাটক করার কি আছে। বলে ফেলো!

-আমার ক্ষোভ হচ্ছে আমি জানতাম সে আমার সাথে এমন করবে। জানা সত্ত্বেও আমি ওকে আমার জীবনে জায়গা করে দিয়েছি। ক্ষোভ আমার নিজের উপর কাজ করছে।

-আরে সবকিছু এতো সিরিয়াসলি নিতে হয় নাকি? দু’জন দুজনকে ভালো লাগসে, সেক্স করসো। ব্যস! ঝামেলা শেষ!

আমি কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলাম। ব্যাপারটা যদি শারীরিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতো তাহলেই ভালো ছিল। প্রথমদিক থেকে একটা ছোট্ট নাটিকা পরিচালনা করার দরকার ছিল না। আমরা নিজেরাই জানি না আমরা কি করতে চাই। আমাদের নিজের চাহিদা, ইচ্ছা নিয়ে আমাদের অনেক দ্বিধা কাজ করে। আমরা এক অতি কনফিউজড জাতি। নিজেকে ছকের বাইরে এনে পরিবর্তন করবার চেষ্টা করেছিলাম। ব্যর্থ হয়েছে। আমার দ্বারা কাউকে অর্জন করা সম্ভব না। অতি বিবেকবান, অতি জ্ঞানীর এই বেহাল পরিণতি। সে জানে না কাকে স্থান দিতে হবে মনে আর কাকে নয়। দুনিয়ার সকল মানুষকে সমলোচনা করতে যে উদ্বাহু সে আজ নিজের কর্মকাণ্ডের জন্য লজ্জিত। লজ্জার মূল কারণ কি? অন্যের দ্বারা প্রতারিত হওয়া না নিজেকে ছকের বাইরে এনে অদ্ভুত কাজ করা?

মইন লিখেছে, করবে?

আমি ভাবলেশহীন অবস্থায় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছি। আমি কাকে দোষারোপ করবো? গ্রাইন্ডারকে? শাহরিয়ারকে? না নিজেকে? আমার কি করা উচিত হবে? গ্রাইন্ডার বন্ধ করে ঘরের ভিতর নিজেকে বন্দী করে বইয়ে মুখ গুঁজে থাকবো? না বাইরের স্বাদ গ্রহণ করবো? না শাহরিয়ার আমাকে বোকা বানাল এই দুঃখে আত্মাহুতি দিবো? এ কি বিশাল চৈতন্য নাশ! শাহরিয়ারের আশায় আর কতদিন? আমার নিজের দম্ভ আমাকে সামনে আগাতে দিচ্ছে  কেন? আমার দুঃখ কিসে? শাহরিয়ারকে অর্জন না করতে পারাতে নাকি আমি হারতে অভ্যস্ত নই সেটাতে? নিজের গোঁড়ামি কি আমি দেখতে পারি না? আমি এতকাল গোঁড়ামিকে যত্নে লালন করেছি মনে?

আমি সজোরে একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে টাইপ করলাম, লেটস ডু ইট!