যুদ্ধ এবং ভালোবাসার গল্প

আকাশ টা ঘুটঘুটে কালো হয়ে আছে। ক্ষণে ক্ষণে মেঘের গর্জন। দমকা হাওয়া বইছে। ঝুম বৃষ্টি হবে। বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর ঋতু বর্ষাকাল । বৃষ্টি স্নাত সন্ধ্যায় তিলোত্তমা ঢাকা অপরূপ রূপে সজ্জিত।ভেজা রাস্তায় সোডিয়াম বাতি গুলোর প্রতিবিম্ব সোনালি স্পর্শ দিয়েছে। গাড়ি গুলোর হেডলাইটের আলো যুক্ত হয়ে শহরটি কে প্রাণ দিয়েছে। এই বৃষ্টিতেও অসংখ্য মানুষ রাস্তায়। কেউ ছাতা হাতে আবার কেউ রেইনকোট গায়ে। সন্ধ্যা নেমে এলো। আজানের ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। আর সাথে সাথেই ঝুম ঝুম করে বৃষ্টি নেমে এলো। দৌড়ে কেউ আশ্রয় নিলো বাস স্টপের ছাউনি তে। শপিংমল গুলোর গেটে অসংখ্য মানুষ দাড়িয়ে আছে বৃষ্টি থামার অপেক্ষায়।

গাড়ি চালাচ্ছে তপু। আজকে জার্মানি থেকে তার একজন বন্ধু আসবে। সমপ্রেমী বন্ধু। নাম ভিকি। একটি সামাজিক যোগাযোগ সাইটে তাদের পরিচয়। দেরি হয়ে গিয়েছে। বৃষ্টির কারনে রাস্তায় জ্যাম। রাস্তায় পানি জমায় অনেক গাড়ি বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তপু ভয় পাচ্ছে ফ্লাইট চলে আসার আগেই পৌঁছাতে পারবে তো?বৃষ্টি তপু ভালবাসে। কিন্তু আজকের বৃষ্টি তপুর ভাল লাগছে না। ভিকি এয়ারপোর্টে তাকে না পেলে কি করবে? অবশ্য ভিকির কাছে তার ফোন নাম্বার আছে। গাড়ি সিগন্যালে দাড়িয়ে আছে অনেকক্ষণ। ট্র্যাফিক পুলিশ কে মনে মনে গালি দিচ্ছে তপু। অবশেষে গাড়ি ছাড়লো। রেডিসন ক্রস করছে গাড়ি। তপু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। না ঠিক সময় মতই পৌঁছাতে পারবে। গান ছাড়লো।

মন মোর মেঘেরও সঙ্গী …

তপুর সাথে ভিকির পরিচয়। ১ বছর। এক সময় সারা রাত চ্যাট করতো তপু ভিকির সাথে। ধীরে ধীরে তাদের মাঝে বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। কোন কোন দিন চ্যাট না হলে অস্থির লাগতো তপুর। বুকে চাপা কষ্ট অনুভব করতো। অভিমান হতো। এর পর স্কাইপে কথা , ভিডিও চ্যাট হলো । ভিকি কে দেখারা জন্য সারাদিন অপেক্ষা করতো তপু। তপু বুঝতে পারছিলো সে ভিকি কে ভালবেসে ফেলেছে। কিন্তু ভিকি কে সে কিছু বলে নাই। কারন দূরত্ব বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভিকি বাংলাদেশি বংশ্তভুত জার্মান। তার বাবা , মা বাঙ্গালী। কিন্তু সে জার্মানির নাগরিক। বড় হয়েছে জার্মানিতে। ভিকির জীবনে একটা অসম্ভব কষ্টের অধ্যায় আছে। আর এই জন্য তার বাংলাদেশে আসা।

**********

ভিকি জার্মান হলেও বাংলা বলতে পারে। বাংলা শিখেছ মা শেলির কাছ থেকে। কিন্তু এখন সে থাকে বাবা রাফির  কাছে। শেলি , রাফিকে ছেড়ে চলে গিয়েছে। এই কারনে ভিকি কোন দিন শেলি কে ক্ষমা করতে পারবে না। সে ঘৃণা করে শেলি কে।

রাফির সাথে ভিকির সম্পর্ক বন্ধুর মত। রাফি অসম্ভব ভাল একজন মানুষ। সবাই কে হাসি খুশি তে মাতিয়ে রাখে। রাফি থাকা মানে আড্ডা জমতে বাধ্য। শ্যামলা কিন্তু অসম্ভব সুন্দর গড়ন রাফির। তাদের একটি রেস্টুরেন্ট আছে। সেই রেস্টুরেন্ট ঐ এলাকার খুব বিখ্যাত রেস্টুরেন্ট। আর এই রেস্টুরেন্টে শেলি তার এক মহা বিপদে চাকুরী করতে এসেছিল। পারিবারিক সেই বিপদে রাফি চাকুরী দিয়েছিল শেলি কে।তখন থেকেই রাফির সাথে তার পরিচয়।ধীরে ধীরে ভালবাসা প্রণয় বিয়ে। শেলির কোল জুড়ে এলো সন্তান ভিকি। অসম্ভব সুন্দর একটি পরিবার। তাদের পরিবারে আরো আছেন মিস্টার অ্যান্ড মিসেস কুপার। কুপার পরিবার-ই বাংলাদেশ থেকে রাফি কে দত্তক নিয়েছিলেন। তারাই নিজের সন্তানের মত করে বড় করেছেন রাফি কে। নিজের সন্তান হলে যা করতেন তার এক বিন্দু কম করেননি তারা রাফির জন্য।

ব্যাভারিয়ার অসম্ভব সুন্দর পরিবেশে একটি কাঠের বাড়ি তে থাকে তারা। চারিদিকে বাগান। শেলি আর রাফি সারা দিন রেস্টুরেন্টে কাজ করে। আর এদিকে দুই বুড়ো বুড়ি ভিকি কে দেখে রাখে। বাগানের পরিচর্যা করেন। জার্মানি ফুলের দেশ। ফুল দিয়ে সাজানো বাগানা। কখনো কখনো পুরো পরিবার চলে যায় বনের ধারে পিকনিক করতে। ভিকিও বড় হচ্ছে। স্কুলে ভর্তি হয়েছে। কিন্তু শুধু মাত্র জার্মান ভাষা নয়। শেলির কাছে থেকে সে বাংলা ভাষাও শিখেছে। অবশ্য রাফি বাংলা ভাষা জানে না। জানবেই বা কি করে? সে তো জার্মান দম্পতির কাছে বড় হয়েছে। এই জন্য তার অনেক আফসোস । সে তার জন্মভূমি সব জানতে চায়। কিন্তু কুপার পরিবার কখনই তাকে কিছু বলে না। এমন কি দেশে যেতেও দেয় নি। রাফি শুধু জানে তার মার নাম পরিবানু। স্বাধীনতা যুদ্ধে তার বাবা মা দুইজন মারা গিয়েছেন। তখন কুপার দম্পতি তাকে দত্তক নেয়। আর তার পর পর জার্মানি চলে আসেন।

অবশ্য রাফি শেলির কাছে থেকে দেশের সব গল্প শুনতে পায়। দেশের মানুষের কথা। বাংলাদেশের অপরূপ সৌন্দর্যের কথা। সবুজ শ্যামল গ্রামের কথা। আর মুক্তিযুদ্ধের কথা। মুক্তিযুদ্ধের পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অত্যাচারের কথা শুনলে সে ক্ষোভে ফেটে পড়ে। ৩০০০০০০ মানুষের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা। রাফি বাংলাদেশের নাগরিক না হলেও স্বাধীনতা যুদ্ধের কথা শুনলে গর্বে তার বুক ভরে উঠে। শেলি , রাফি কে মুক্তিযুদ্ধের কয়কেটা সিনেমাও দেখিয়েছে। আগুনের পরশমণি ,ওরা এগারো জন, অরুনদয়ের অগ্নি সাক্ষী । শেলির দাদা ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। তাই মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তার আবেগ অনেক বেশি। তার এই আবেগ রাফি কে ছুঁয়েছে। রাফি সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করে বাঙালি নারী দের উপর যেই সকল পাকিস্তানি আর্মি অকথ্য নির্যাতন চালিয়েছিল সেই সকল পাকিস্তানি আর্মিকে। তাদের কে মানুষ মনে করা যায় না। পশু ছাড়া আর কিছু নয়।

দিন সব সময় ভাল যায় না। মিস্টার কুপারের ক্যান্সার ধরা পড়লো। অনেক চিকিৎসা করা হলো। অনেকদিন হাসপাতালে ভর্তি থাকলেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না।মিস্টার কুপার বাড়ি ফিরতে চাইলেন। বললেন

-আমি বাড়ি তে শান্তি তে মরতে চাই। আর আমার কিছু দায়িত্ব আছে তা পালন করতে হবে।

কথা টা শুনে মিসেস কুপারের চোখ থেকে জল পড়তে লাগলো।

কুপার সাহেব সবাই কে বের হয়ে যেতে বললেন।

-ন্যান্সির সাথে আমার কিছু কথা আছে। তোমরা একটু বাইরে যাও।

মিসেস কুপার বাদে সবাই বাইরে চলে গেলেন।

-ন্যন্সি আমি আর পারছি না। এই কথা গুলো রাফি কে না বলেই কি আমি পৃথিবী থেকে চলে যাবো ?

কথা টা শুনে মিসেস কুপার আঁতকে উঠলেন।

-এই কথা গুলো কি না বললেই নয় কুপার?তুমি জানো এর পরিণতি কি হবে? আমি কি সামলাতে পারবো?

-ন্যান্সি আমি এই কথা গুলো না বললে মরেও শান্তি পাবো না। আর রাফির  এই কথা গুলো জানাও দরকার। অবশ্যই দরকার।

-তোমার যা মনে হয় কর। আমি কিছু বলবো না। শুধু ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছি রাফি যেন সব কিছু সহজ ভাবে নিতে পারে।

সেই দিন ডাক্তারের কাছ থেকে ছুটি নিয়ে বাড়ি ফিরে এলেন মিস্টার কুপার।

আসার পর থেকে মিস্টার কুপার হটাত করে বাগানে একটি পার্টি করতে চাইলেন। পার্টির কথা শুনে সবাই অবাক। রাফির বার্থ ডে পার্টি।

রাফি শুধু অবাক নয় হেসে কুটি কুটি।

-ড্যাডি তুমি তো আমার বার্থ ডে কবে তাই ই জানো না। বাবা মা মারা যাওয়ার পর থেকে আমি তো এতিম খানায়। সেখান থেকেই তো তুমি আমাকে পেয়েছো । তাই তো সারা জীবন আমার বার্থ ডে পালন হয় নাই।

মিস্টার কুপার বললেন

-এতো দিন হয় নাই কিন্তু এইবার হবে।

-কিন্তু আমার বার্থডে কবে?

-৫ই জানুয়ারী

-তুমি জানলে কিভাবে?

-এতো প্রশ্ন করিস না। আমি জানি। সব তোকে বলবো। তবে আজ নয়।

রাফি আরো কিছু বলতে চাইছিলেন। কিন্তু মিসেস কুপার থামিয়ে দিলেন।

-রাফি তোমার ড্যাডি অসুস্থ । আর কোন প্রশ্ন করো না। ওর কষ্ট হচ্ছে।

সেইদিনের মত আলোচনা থেমে গেলো।

বার্থ ডে উদযাপনের জন্য যত রকম আয়োজন করা যায় সব করতে লাগলো শেলি।

বাগান টা সুন্দর লাল নীল আলো দিয়ে সাজানো হলো। চকলেট একটা কেক অর্ডার দেয়া হলো । ভিকি সবচেয়ে খুশি। সারা বাগান ময় ছুটে বেড়াচ্ছে। বেলুন ফুলিয়ে ফাটাচ্ছে। তার পিছন ছুটছে পোষা কুকুর জিমি

অনুষ্ঠান অনেক বড় করে করা হচ্ছে ঠিকই। কিন্তু সবার ভিতর চাপা কষ্ট মিস্টার কুপারের জন্য। কিন্তু তার চাওয়া পূরণ করতে সবাই অক্লান্ত পরিশ্রম করছে। সন্ধ্যায় পার্টি। শুধু পরিবারের সদস্যরা থাকবে। আর কেউ নয়।

সন্ধ্যায় পার্টি শুরু হল। শেলি পিয়ানো বাজিয়ে গান শুনাল। রাসেল একটা বাংলা গান শুনতে চাইলো। মিস্টার কুপার কেমন ভীত চোখে তাকালো রাফির দিকে। গান শেষ হতেই কেক কাটা হল। রাফি সবাই কে কেক খাইয়ে দিল। গোল হয়ে বসে সবাই আড্ডা দিচ্ছে। এত সুন্দর সন্ধ্যা তাদের জীবনে খুব কম এসেছে। কিন্তু মিস্টার কুপার অনেকক্ষণ যাবত চুপ হয়ে রয়েছেন। এখন মুখ খুললেন।

-রাফি তোমাকে আজকে কিছু কথা বলবো। যা এতো দিন বলা হয় নাই। কিন্তু বলা উচিৎ ছিল। আমি জানি কথা গুলো শুনলে তুমি কষ্ট পাবে। তাই এতো দিন বলি নাই। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে না বলা টা ভুল ছিল।

-কি এমন কথা ড্যাডি যে আমি কষ্ট পাবো ?

-তোমার জন্ম পরিচয়ের কথা।

-সে তো ছোট বেলা থেকেই পেয়ে এসেছি ড্যাডি।

-তোমার মা বেঁচে আছেন রাফি। আমি তোমাকে মিথ্যে বলেছিলাম। তোমার মা বেঁচে আছেন। কিন্তু তার পক্ষে তোমাকে গ্রহন করা সম্ভব ছিল না। তাই আমি তোমাকে নিয়ে এসেছিলাম।

কথাটা শুনে যেন বুঝতে পারছে না রাফি। মুখে কেমন একটা অসহায় অভিব্যক্তি।

-কি বলছ এসব? আমার বাবা মা?

-যা বলছি এক বর্ণ মিথ্যা নয়। তোমার মা তোমাকে গ্রহন করতে পারেন নাই।

-আর আমার বাবা?? বাবা কোথায় ? আর আআমাকে আমার মা কেন গ্রহন করতে পারেন নাই?

-তোমার বাবার পরিচয় আমি জানি না। জানতেও চাই না। তুমিও জানতে চেয় না।

-তুমি আমাকে বল আমার মা কেন আমাকে ত্যাগ করেছে?

-বলছি। তোমার মা একজন বীরঙ্গনা। যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে ছিলেন তোমার মা। আর তার ফলাফল তুমি। তুমি যুদ্ধ শিশু রাফি।

রাফি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। কেউ কোন কথা বলছে না। পিন পতন নিরবতা। এমন কি ছোট্ট ভিকি যে কিছু বুঝে না সেও চুপ করে আছে। ঝড় আসার আগে সব নীরব হয়ে যায়। ঝড় আসছে। মিস্টার কুপার কথা গুলো বলার পর থেকেই বুকে হাত দিয়ে বসে আছেন। শেলি অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে কি যেন ভাবছে। মুখে বেদনার নীল রঙ ঠিক বুঝা যায়। মিসেস কুপার বললেন

-ডার্লিং চল ঘরে যাই। তোমার শরীর ভাল ঠেকছে না।

-না আমার আরো কথা বাকি। এই কথা গুলো না বলে আমি যাবো না। সেইদিনের কথা। এখনো আমার চোখে ভাসে।

রসুলপুর মিশনারি হাসপাতাল। ১৯৭২ এর জানুয়ারির ৫ তারিখ। হাসপাতাল প্রসব বেদনা নিয়ে ভর্তি হয়েছে পরিবানু। প্রচণ্ড যন্ত্রনায় কাতর। গোঙ্গানির মত শব্দ হচ্ছে। তার শ্বশুর বাড়ির কোন লোক নেই। নেই বাপের বাড়ির লোক জন। ভাই পরিবানু কে হাসপাতালে নিয়ে এসে ফেলে রেখে চলে গিয়েছে। হাসপাতালের কর্মচারীরা বিরক্ত। কারন পরিবানু একটি যুদ্ধ শিশু প্রসব করতে যাচ্ছে। স্বামী , শ্বশুর বাড়ির লোকজন স্পষ্ট বলে দিয়েছে এই বাচ্চা খালাস করলেই তারপর যেন পরিবানু কে শ্বশুর বাড়ি পাঠানো হয়। তার আগে নয় । বাপের বাড়ির কোন মানুষ এই বাচ্চার দায়িত্ব নিতে রাজি নয়। পশুর থেকেও অধম পাকিস্তানী সৈনিকের রক্ত বইছে এই বাচ্চার গায়ে। এই বাচ্চা কে গ্রহন করবে? কিন্তু একটা কথা মানুষ ভুলে যায় পরিবানুর মত বীরঙ্গনার রক্ত কিন্তু রয়েছে এর গায়ে।

জার্মান সরকারের সহায়তায় একটি মিশনারি হাসপাতাল এটি। মিস্টার এন্ড মিসেস কুপার এই হাসপাতালের দায়িত্বে। তারা ২ জনই ডাক্তার। পরিবানু এই হাসপাতালেরই সিস্টার ছিলেন। এই হাসপাতাল থেকে পরিকে পাকিস্তানি সৈন্যরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল।দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পরিবানু ভেবেছিলেন সব কষ্ট শেষ । কিন্তু আজকে তার এক কঠিন পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। মিসেস কুপার ডেলিভারি করাতে গেলেন।

পরি প্রসব বেদনায় কাতর। কিন্তু এর মাঝেও তার জ্ঞান পুরো আছে। সে খুব ভাল ভাবেই জানে কেউ তার অনাগত শিশু কে গ্রহন করবে না। সে ভয় পাচ্ছে। এই বাচ্চার কি হবে। যুদ্ধ শিশু হোক সে তো মা। তার সন্তানটা কে মেরে ফেলবে নাতো তার শ্বশুর বাড়ির লোক জন? তার আদরের ধন। তার নিজের ভাই-ই তো গ্রহন করবে না। মিসেস কুপার  কে দেখে যেন পরি আকাশের চাঁদ পেলো। সে ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে কিছু কথা বলল মিসেস কুপার কে। সেই সময় শুধু মিসেস কুপার ছিলেন পরির সাথে। সব কথা শুনলেন মিসেস কুপার। মাথায় হাত বুলিয়ে মিসেস ন্যান্সি কুপার পরিকে আশ্বস্ত করলেন। পরি এইবার একটি শান্ত হল। পরি একটি তাবিজ বের করে মিসেস কুপারের হাতে দিল। বাচ্চা প্রসব হল। সন্তান টিকে একটি বারের মত দেখতে পেলো না পরি।

সেই দিন ই শ্বশুর বাড়ির লোক জন এসে পরিবানু কে নিয়ে গেলো ।

কথা গুলো বলতে বলতে নস্টালজিক হয়ে গেলেন মিস্টার কুপার।

সেই দিন রাতেই মিস্টার আর মিসেস কুপার পরির সন্তানটি কে নিয়ে ঢাকা চলে আসলেন। আর কক্ষনো ফিরে যান নাই রসুলপুর। নিঃসন্তান এই দম্পতি বাচ্চাটিকে পেয়ে যেন স্বর্গ পেলো । নাম রাখা হল রাফি। তিন মাস পর রাফি কে নিয়ে বাংলাদেশে থেকে শেষ বারের মত বিদায় নিয়ে জার্মানি চলে গেলেন মিস্টার আর মিসেস কুপার।

সুন্দর সন্ধ্যাটি হটাত করেই বিষাদময় হয়ে গেলো। কেউ কথা বলছে না। রাফি কপালে হাত দিয়ে ঝিম ধরে বসে আছে। পুরো ব্যাপারটি সে এখনো নিতে পারে নি। সে বিশ্বাস করতে পারছে না যাদের কে সে চরম ভাবে ঘৃণা করে সেই সকল পাকিস্তানি সৈনিকের একজন তার বাবা। আর তার নিজের মা তাকে ত্যাগ করেছে। তার মা বেঁচে আছে অথচ সে জানতোই না। মা কেন এত স্বার্থপর হল? মা রা তো সন্তানের জন্য সব কিছু করতে পারে । অথচ তার মা পারলো না তাকে গ্রহন করতে? পর মুহূর্তে মনে হয় সে তো একজন ধর্ষক জানোয়ার পাকিস্তানি সৈনিকের ছেলে। নিজে কেই ঘৃণা করতে ইচ্ছা হয়। এ কি শুনলো সে? এই সত্য তো গোপন থাকা উচিত ছিল। জীবনটা যেন ওলট পালট হয়ে যাচ্ছে ।

সবার প্রথমে শেলি স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলো । কিন্তু ভিতরে তার ঝড় বইছে। শেলির দাদা মুক্তিযোদ্ধা ।দাদি পাকিস্তানী সৈনিকের পাশবিক অত্যাচারে মৃত্যু বরণ করেছেন। আর সে কিনা একজন পাকিস্তানি সৈনিকের সন্তান কে বিয়ে করেছে। মানতে পারছে না সে। তারপরো নিজেকে বুঝাচ্ছে এখানে তো রাফির কোন দোষ নেই। বরং তার মা একজন বীরঙ্গনা।

মিসেস কুপার নীরবতা ভঙ্গ করলেন।

-ডার্লিং চল ভিতরে যেয়ে শুবে। তোমাকে অসুস্থ লাগছে।

মিসেস কুপার , মিস্টার কুপার কে ধরে ধরে নিজেদের শোবার ঘরে নিয়ে গেলেন।

শেলি আর রাফি শুধু মাত্র এখন বাগানে। ২ জনই চুপ। শেলি বুঝতে পারছে তার উচিত রাফি কে সাপোর্ট দেয়া। কিন্তু সে তো নিজেই মানতে পারছে না। হটাত করে একটি প্রাণোচ্ছল বাড়িতে কবরের নীরবতা নেমে এলো।

আজ রাত টা অন্যরকম। চাঁদ আজ কয়েক শ বছরের মাঝে পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে অবস্থান করছে। বিশাল বড় রুপালি চাঁদ আর তার জোছনা। পুরো বাগান কে আলোকিত করে রেখেছে।

বাগানে বিশাল দোলনা। ছোট বেলায় মিসেস কুপার , রাফি কে গল্পের বই পড়িয়ে শোনাতেন এই দোলনায় বসে।

মিসেস কুপার পানি খেতে এসে দেখলেন রাফি একা দোলনায় বসে আছে। চোখে পানি। নিঃশব্দে কাঁদছে। মিসেস কুপার এর বুকটা হু হু করে উঠলো। সে তো মা। রাফির মা। নিঃশব্দে রাফির পাশে এসে বসলেন মিসেস কুপার। রাফি মিসেস কুপার জড়িয়ে ধরে কাঁদছে।

-মাম তুমি আমাকে ছোট বেলার মত গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দাও। আমি আর সহ্য করতে পারছি না।

দরজার আড়াল থেকে সব দেখল শেলি। চোখে জল। কিন্তু এক সময় আড়াল থেকে সরে ঘরে ফিরে গেলো শেলি। সে চলে যাবে। মনের সাথে এইভাবে যুদ্ধ করে থাকা সম্ভব নয়।  টেবিলে কাগজ কলম নিয়ে বসেছে। দ্রুত চিঠি লিখতে হবে। ভিকি ঘুমাচ্ছে । ছেলের দিকে তাকিয়ে অশ্রু বিসর্জন করলো শেলি। না দ্রুত লিখতে হবে। রাত পার হয়ে যাচ্ছে।

*********************

দেখতে দেখতে এমন অনেক বসন্ত পার হয়ে গেলো । ভিকি বড় হল। এখন সে ভার্সিটি তে পড়ে। সেই দিন শেলি বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। একজন যুদ্ধ শিশু কে স্বামী হিসেবে মেনে নিতে পারবেন না তিনি। এখন শেলি কোথায় কেমন আছে কেউ জানে না। মিস্টার কুপার সেই ঘটনার ২ দিন পরেই এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। মিসেস কুপার, ভিকি কে নিয়েই রাফির এখন ছোট সংসার। ভিকি দেখতে অসম্ভব সুদর্শন হয়েছে। সে সমকামী। জার্মানিতে সমকামী হওয়া দোষের কিছু না। এখানে সমকামী বিবাহ বৈধ। ভিকির সব আগ্রহ বাংলাদেশ নিয়ে। বাংলাদেশে যেতে চায় ভিকি। কিন্তু মিসেস কুপারের মত নেই। রাফি যেতে চায় মা কে খুঁজতে । একবার অন্তত মা কে দেখতে। আর একটি প্রশ্ন করতে। কেন তাকে মা গ্রহন করলো না? কেন? কিন্তু মিসেস কুপার দিবেন না। মিসেস কুপার ২ হাত্ দিয়ে রাফি আর ভিকি কে আঁকড়ে ধরে আছেন। সংসার টিকিয়ে রেখেছেন।

ভিকি বাংলাদেশের অসংখ্য ছেলের সাথে চ্যাট করে। তাদের মাঝে একজন কে সে অসম্ভব পছন্দ করে। সে হল তপু। প্রতিদিন ভিডিও চ্যাট। ভিকি বুঝে দিন দিন সে দুর্বল হয়ে পড়ছে । কিন্তু কি করবে সে।

এক বসন্তের সন্ধ্যায় রাফি , মিসেস কুপার আর ভিকি কে নিয়ে বাগানে বসলো । কিছু বলার জন্য সে ২ জন কে ডেকেছে। রাফির হাতে একটি মেডিক্যাল রিপোর্ট। জীবন রাফির সাথে বার বার অন্যায় করেছে। আজ তার ব্যতিক্রম নয়। রাফির ব্লাড ক্যান্সার ধরা পড়েছে । এই কথা বলতেই বাগানে ডেকেছে ন্যন্সি আর ভিকি কে। এডভান্স স্টেজ। সময় হাতে আর বেশি নেই।

ভিকি শুয়ে আছে বাগানের সবুজ ঘাসের উপর। গভীর রাত। আকাশে তারা গুনছে সে। পাশেই একটা গিটার পড়ে আছে। মন খুব খারাপ ভিকির। বাবা বেশি দিন আর নেই পৃথিবীতে। মেনে নিতে পারছে না সে। বাবার একটি স্বপ্ন পূরণ হল না। তা হল বাংলাদেশে যেয়ে দাদি অর্থাৎ রাফির মা কে খুজে বের করা।বাবার জন্য এখন যদি কিছু করতে পারতো? বাবা তার জন্য কি করে নাই? শুধু সে আছে তাই আরেকটা বিয়ে করে নাই। সে যখন যা চেয়েছে তাই পেয়েছে। সে সমকামী জেনেও বাবা সহজেই মেনে নিয়েছে। আর কয়েক দিন পর বাবা আর থাকবেন না ভাবতেই চোখ ফেটে পানি আসতে চায়।

নিজের ঘরে এসে ল্যাপটপের সামনে এসে বসলো ভিকি। অনেক দিন ধরে বাংলাদেশের একটি ছেলের সাথে চ্যাট হয় ভিকির। ছেলেটির নাম তপু। ভিকির তপু কে খুব ভাল লাগে। তার সব কথা তপুর সাথে শেয়ার করবে। প্রচন্ড কান্না পাচ্ছে। কারো বুকে মাথা রেখে তার সব না বলা কথা বলতে ইছছে করছে। বুক টা প্রচন্ড ভারি হয়ে গিয়েছে। অনেক্ষন ধরে অপেক্ষা করছে তপুর জন্য। কিন্তু তপু নেই। অনলাইন হছছে না। আজকে কি তপু আসবে না? একটা নাম্বার আছে । কিন্তু ফোন এ কক্ষনো কথা হয় নাই। ফোন করবে? না থাক।

আজকে আসবে এই আশা ছেড়ে দিয়ে যক্ষুনি ভিকি লগ আউট হবে তক্ষুনি তপু অনলাইন হল।

তপু কে সব কথা বলল আজকে। কিছুই বাদ দিল না। ভেবেছিল তার বাবা যুদ্ধ শিশু জেনে তপু তাকে উপেক্ষা করবে। বরং তপু সমবেদনা জানালো। ভিকির খুব কান্না পাচ্ছে। চোখ থেকে পানি পড়ছে। ল্যাপ্টপের স্ক্রিন ঝাপসা লাগছে। বুক টা অনেকখানি হাল্কা হয়ে গিয়েছে ভিকির।

তপু একটা পরামর্শ দিলো । তার বাবার সাথে তার দাদির দেখা করিয়ে দেয়ার জন্য। এইভাবেই ভিকি রাফির  শেষ ইচ্ছা পূরণ করবে। কিন্তু দাদি মানে পরিবানু তো বাংলাদেশে। আর রাফি জার্মানিতে। পরিবানু কোথায় থাকে তা সে জানে না। বাংলাদেশে কক্ষনো যাওয়া হয় নাই। কিছুই চিনবে না সে। তপু বলল  সে সাহায্য করবে ভিকি কে পরিবানু কে খুজে বের করার জন্য। তার ভার্সিটি এখন বন্ধ।  কিন্তু পরিবানু কে খুঁজে পেলেই পরিবানু কি জার্মানি  এসে রাফির সাথে দেখা করতে রাজি হবে? তাদের কে বিশ্বাস করবে?আর এমনও তো হতে পারে পরি বেঁচে নেই।

কথা গুলো ভাবতেই মন টা দমে যায়। কিন্তু তপু তাকে বার বার উৎসাহিত করে। সে শেষ পর্যন্ত ভাবলো চেষ্টা করতে দোষ কি?

১ মাসের বাংলাদেশের ভিসা নিলো ভিকি। মিসেস কুপার আর রাফি কে বলল ইউরোপ টুরে যাবে ফ্রেন্ড দের সাথে। তারা না করলেন না। রাফি কষ্ট পেলো। তার এই অসুখে ছেলেটা বেড়াতে গেলো ……। কিছু কিন্তু সে বলল না।

*************

এয়ারপোর্টে বসে আছে তপু। ফ্লাইট ল্যান্ড করেছে। কিন্তু ভিকি এখনো বের হয় নাই। খুব অধৈর্য লাগছে তপুর। অপেক্ষা করতে খুব খারাপ লাগে তার। কখন যে ভিকি বের হবে।

দূর থেকে তপু দেখলো একটা লাল টিশার্ট পরা ছেলে ট্রলি হাতে বের হয়ে এসেছে। আরে এই তো ভিকি। হাত নাড়লো তপু। ভিকি ব্যাগ টা রেকে দৌড়ে এসে তপু কে জড়িয়ে ধরলো।

২ জনের চোখে জল। শেষ পর্যন্ত ২ জনের দেখা হলো । একজন আরেকজন কে স্পর্শ করলো । তাদের বুকে যে ঝড় চলছে তা ২ জনের কেউ প্রকাশ করলো না। …………

গাড়ি চলছে এয়ারপোর্ট রোড ধরে। ফার্ম গেটের একটা হোটেল বুকিং দেয়া আছে ভিকির নামে। তপু ভাবছে ভিকি কে হোটেলে না নিয়ে বাসায় নিয়ে যেতে । ইচ্ছে করছে সারা রাত একসাথে বসে গল্প করতে। কিন্তু ভিকি কি রাজি হবে?

ভিকি একদম চুপ। কথা বলতে যেন লজ্জা পাচ্ছে।

-আসতে কোন সমস্যা হয় নাই তো ?

-আরেহ না। দিব্যি নাক ডেকে ঘুমিয়ে এসেছি ।

ভিকি তপুর দিকে তাকিয়ে হাসলো । এই তো সেই হাসি খুশি ভিকি। জানালা দিয়ে তাকিয়ে ভিকি বাইরের দৃশ্য দেখছে। তার পূর্ব পুরুষের দেশ। এই দেশ দেখার জন্য সে উন্মুখ হয়েছিল। বৃষ্টি যে এত্ত সুন্দর হতে পারে তা তার ধারনা ছিল না। শুধু একটা ব্যাপারে কষ্ট লাগছে ছোট ছোট মেয়েরা বৃষ্টি তে ভিজে ফুল বিক্রি করছে। তার কাছে বাংলাদেশি টাকা থাকলে ফুল কিনে নিতো। তার কাজ টা তপু করলো। এক তোরা রজনিগন্ধ্যা ফুল কিনলো তপু। ফুল গুলো ভিকির হাতে দিল।

কথাটা ইতস্তত করতে করতে বলেই ফেলল তপু

-আচ্ছা ভিকি তোমার কি আমার বাসায় অতিথি হিসেবে থাকতে কোন অসুবিধা আছে?

ভিকি খুব অবাক হয়ে বলল

-তোমার বাবা মা রাজি হবেন?

-অফকোর্স । রাজি হবেন না কেন ? তুমি আমার বন্ধু।

ভিকির আসলে একা হোটেলে থাকতে ইচ্ছা করছিল না। আবার তপুর বাসায় যেতেও কেমন অস্বস্তি লাগছে। তারপর ভাবলো একদিনের ব্যাপার। পরের দিন তো রসুলপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দিবে। কিন্তু তারপরও তপুর বাবা মা যদি কিছু মনে করেন। সে জানে বাংলাদেশের অভিভাবকরা একটু রক্ষণশীল ।ভিকি তপুর দিকে তাকালো । কি সুন্দর নিস্পাপ চেহারা। দেখলে মায়া লাগে। তপুর কপালে এক গোছা চুল কপালে পড়েছে। ভিকির ইছছা করছে হাত দিয়ে সরিয়ে দিতে।

ভিকি কে চুপ করে থাকতে দেখে তপু বলল

-তাহলে কি তোমাকে হোটেলে নামিয়ে দিবো ? সামনেই হোটেল। কিন্তু আমার খুব ইচ্ছা করে তোমাকে বাসায় নিয়ে যাই।

ভিকি এবার রাজি হল।

-আচ্ছা চল তোমার বাসাতেই থাকি আজ রাত।

তপু থাকে ওয়ারিতে। বিশাল বড় ২ তলা বাড়ি । মাঝখানে বিশাল বড় উঠান । দাদা দাদি, বাবা মা, ২ চাচা চাচি র কাজিন দের নিয়ে তার পরিবার।

তপু যখন ভিকি নিয়ে বাড়িতে ঢুকলো তখন বিশাল বসার ঘরে তপুর দাদা আর সব নাতিরা মিলে খেলা দেখছে ৫০ ইঞ্চি টিভি তে। ঠিক সেই সময়ে একটা ছক্কা হল। হই হই করে উঠলো সবাই। সিঁড়ি দিয়ে দোতালায় উঠতেই  তাদের ২ জনের সাথে তার কাকির সাথে দেখা।

কাকি তো তাদের দেখে হই হই করে উঠলো।

-কই থাকিস সারা দিন? সাথে কে?

-কাকি আমার বন্ধু ভিকি। আজই জার্মানি থেকে এসেছে। আমার ঘরে থাকবে আজকে। হোটেল এ উঠতে চাইছিল । আমি জোর করে ধরে এনেছি।

-ভাল করেছিস । আমাদের বাসা থাকতে হোটেলে উঠবে কেন।

এইবার কাকি ভিকির দিকে তাকিয়ে হেসে বলল

-বাবা তুমি হাত মুখ ধুয়ে খেতে বস। আমি একটু পাশের বাসা থেকে আসছি। পাশের বাড়ির কাকা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। একটু দেখে আসি। তারপর তোমার জার্মানির গল্প শুনবো।

তাড়াহুড়ো করে কাকি নেমে গেলেন।

দোতালার কোনার ঘরটা তপুর। কাছেই বাথরুম। ২ জনই ফ্রেশ হয়ে আসলো। খাবার টেবিলে এসে বসলো। তপুর বড় বোন রিমি আসলো খাবার সারভ করতে।

-এই মা কই রে?

-মায়ের বাতের ব্যথা উঠছে। বড় চাচিও সেখানে।

-আপু তুমি যাও। আমরা নিয়ে খাবো।

-রিমির সামনে ভিকি কেমন অস্বস্তি বোধ করছিলো।

-আচ্ছা তোরা নিয়ে খা। আমি গেলাম।

ভিকি কে বলল

-তুমি লজ্জা করো না ভাই। নিজেরে বাসা মনে করে খেও ।

বেশ কয়েক পদ রান্না করা হয়েছে। কিন্তু ভিকির কাছে অনেক মনে হছছে। তারা ত ১-২ পদ দিয়ে খেয়ে নেয়। কিন্তু ভিকি কিছুই খেতে পারছে না। সব খাবার অসম্ভব ঝাল। তপু বুঝলো ভিকি কিছুই খেতে পারবে না।

-চল উঠো বাইরে থেকে খেয়ে আসি।

-আরে না আমি খাচ্ছি তো

-সে তো আমি দেখতেই পাচ্ছি।

তপু গাড়ি বের করলো। ভিকি কে নিয়ে ধানমন্ডির দিকে যাচ্ছে। তপু তন্ময় হয়ে বাইরের দৃশ্য দেখছে। মানুষ দেখছে। অসংখ্য মানুষ রাস্তা। রাস্তার চার পাশে মার্কেট। আজ কিছুখন আগেই সে ল্যান্ড করেছে। অথচ কত আপন লাগছে শহরটাকে।

বাইরে ডিনার করে বাসায় আসতে আসতে অনেক রাত হয়ে গেলো। দাদা দাদি রাতের খাওয়া খেয়ে শুয়ে পড়েছেন। এখন সবাই যে যার ঘরে। তবুও বাসা নিরব নয়। প্রতিটি ঘর থেকেই শব্দ শোনা যায়। ভিকি ভাবছে তাদের বাসা কত নিরব। কেমন যেন বিষণ্ণতা ঘিরে থাকে বাসাটিকে। চার পাশে প্রতিবেশী কম। কিন্তু এখানে সব সময় হৈচৈ । ইচ্ছা করলেও মানুষ বিষণ্ণ হতে পারবে না। তার খুব আফসোস হচ্ছে। সে যদি একটি যৌথ পরিবারে বড় হত।

-কি ভাবছো ? জিজ্ঞেস করলো তপু

-ভাবছি তোমাদের পরিবারের কথা। কত মানুষ। ইচ্ছা করলেও একা হতে পারবা না। বিষণ্ণতা ঘিরে ধরবে না তোমায়।

-উহু। অনেক সময় অনেক মানুষের ভিড়েও নিজেকে একা মনে হয়।

বাইরে থেকে দরজা দিয়ে উকি দিচ্ছে ৮-৯ বছরের ২ টি মেয়ে। একজনের মুখ আবার ফোকলা।

এই রুমকি চুমকি ………। ঘরে আয়।

দৌড় দিয়ে পালালো ২ জনই।

আমার কাজিন। এত্ত কথা বলে। এখন তোমাকে দেখে লজ্জা পাচ্ছে।

ভিকি ব্যাগ খুলে কিছু বের করলো। একটা দামি পারফিউম আর সান গ্লাসের বাক্স দিলো তপুর হাতে

-দেখো পছন্দ হয় কিনা? আসার সময় তেমন কিছু কিনতে পারি নাই।

-ওয়াও সানগ্লাস টা জোস। থ্যাঙ্ক ইউ।

এদিকে রুমকি চুমকি আবার দরজায়। একটা চকলেটের বাক্স বের করে রুমকির হাতে দিলো ভিকি।

রুমকি কিছুতেই নিবে না। তপু বলার পর নিলো। বাক্স নিয়ে কিছু দূর যাওয়ার পরই হই চই শোনা যাচ্ছে। চকলেট নিয়ে খুব উত্তেজিত তারা।

-আচ্ছা কালকের প্ল্যান কি?

-সোজা রসুলপুর। ট্রেনে করে অলসপুর। সেখান থেকে রিক্সা ভ্যানে রসুলপুর।

-খুজে পাবো তো ?

-নিশ্চয়ই

হটাত ভিকির চোখে পানি।

তপু পরম ভালবাসায় ভিকির হাতে হাত রাখলো

-আমি আছি না? অবশ্যই আমরা খুঁজে পাবো।

ভিকি তাকালো । চোখ রাখলো তপুর চোখে । ছেলেটা কি তাকে ভালবাসে?এত মায়া কেন তপুর চোখে ?

২ জনই চোখ সরিয়ে দিলো

-চল শুয়ে পড়ি। কাল সকাল সকাল উঠতে হবে।

বিশাল খাট। ২ জনই ব্যবধান রেখে শুইলো। কারোর ঘুম আসছে না। এপিঠ ওপিঠ করলো ২ জনই। কিন্তু কেউ তাদের সীমা অতিক্রম করলো না।

*************

কমলাপুর স্টেশনে বসে আছে ভিকি আর তপু। কিছুক্ষণের মাঝেই ট্রেন ছাড়বে। ২ জনের পিঠে ২ টা ব্যাগ প্যাক।

চল ট্রেনে উঠি।

ট্রেনে উঠে মুখোমুখি বসলো ২ জন। জানালার পাশে। তাদের ভাগ্য অসম্ভব ভালো। আর কেউ উঠলো না।

ভিকি একটি ফিল্মফেয়ার ম্যাগাজিন কিনলো। ভিকি হিন্দি ফিল্ম ভালবাসে। এদিকে তপু হিন্দি দেখে না। সে প্রথম আলো কিনে পড়ছে। ট্রেন ছাড়ছে। ভিকি আগে কখনোই ট্রেনে উঠে নাই। এটাই প্রথম। যাব উই মেট দেখার পর থেকে ট্রেনের ব্যাপারে তার অসম্ভব আগ্রহ।

ট্রেন চলছে। ঝিক ঝিক  ঝিক ঝিক তালে। ট্রেনের জানলা দিয়ে ভিকি তাকিয়ে আছে বাইরে। চারিদিকে সবুজ ধান ক্ষেত। কখনো কখনো গ্রামের বাড়ি দেখা যাচ্ছে। সকাল বেলা। ছেলে মেয়েরা দল বেধে স্কুল যাচ্ছে। এই তাহলে বাংলাদেশ। এতো দিন এই দেশ কে দেখার জন্য, জানার জন্য স্বপ্ন দেখে এসেছে ভিকি। আজকে তার স্বপ্ন পুরন হল।

অলসপুর পৌঁছাতে আড়াই ঘণ্টা লাগলো। ট্রেন থেকে নামতেই প্ল্যাটফর্ম এ একজন বৃদ্ধ প্রায় ৮০-৮৫ বছর দোতারা বাজিয়ে গান গাছছেন । অসম্ভব সুন্দর গানের গলা। অনেকেই তন্ময় হয়ে শুনছে।

খাঁচার ভিতর অচিন পাখি ক্যামনে আসে যায়।

গান শেষ হলে অনেকেই টাকা দিলো বৃদ্ধের হাতে। ভিকি একটি ৫০ ডলারের নোট বৃদ্ধের হাতে ধরিয়ে দিলো।

-এতো টাকা  কেন বাবা? আমি এতো টাকা দিয়ে কি করবো। গান শুনে খুশি হয়ে যে যা দেয় তাতেই আমার চলে যায়।

কিন্তু আমার কাছে আর ভাংতি নেই।

-রেখে দাও। তুমি আমার দেশের অতিথি । আমি তোমার কাছে টাকা নিবো না।

-আপনি জানলেন কিভাবে?

বৃদ্ধ হাসলেন আর কিছুই বললেন না।

রিকশা ভ্যানে করে রসুলপুর রওনা দিলো দুই জন। এখান থেকে আধা ঘণ্টার রাস্তা। রাস্তার মাঝে আখ বিক্রি হচ্ছিলো। আখ খাওয়ার বায়না ধরলো ভিকি। রাস্তা আঁকা বাঁকা । বার বার ঝাঁকুনি খেতে হচ্ছ।

আধা ঘণ্টার মাঝেই পৌঁছে গেলো রসুলপুর।

২ জন হাঁটছে।

-তপু আমার ভয় লাগছে

-কেন ?

-পরি দাদি কে পাবো তো ?

-নিশ্চই।

-আমাদের সাথে যদি কথা না বলে?খুব ভয় লাগছে। বুক টিপ টিপ করছে………

গাঁয়ে পৌঁছে অনেকের সাথে কথা বলে পরি দাদির শ্বশুর বাড়ির রাস্তা পেয়ে গেলো তারা।

গ্রামের এক প্রান্তের বাসাটি । একদিকে পাকা দালান । আর তিন পাশে টিন শেড । বোঝা যায় বেশ অবস্থাপন্ন।

কিন্তু বাড়ি তে ঢুকে তাদের যে অভিজ্ঞতা হল তা ভয়াবহ। এক কথায় তাড়িয়ে দেয়া হল তাদের। পরিবানু নামের কাউকে তারা চিনে না। কখনো নাম শুনে নাই।

হতাশ হয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে আসলো ২ জন। বাইরে একটা গাছের নিচে বসলো ?

-কি করবো বলো তো ? জিজ্ঞেস করলো ভিকি।

-চল পরিদাদির বাপের বাড়ি যাই। ওখানে নিশ্চয়ই কোন খবর পাবো।

বাপের বাড়ি কাঁঠালি ডিঙ্গা। এখান থেকে আরো আধা ঘণ্টার রাস্তা। পরি দাদির বাপের বাড়ি অমন অবস্থাপন্ন নয়। তিন তা টিনশেডের বাড়ি। কেউ পরি দাদি কে চিনে না। এখানে থাকা তো দুরের কথা।কেউই বেশি কথা বলতে চায় না। সবার চোখে মুখে কেমন জানি একটা ভয়। কিসের ভয়? খুব অবাক হয়ে ভাবছে তপু। নিশ্চয়ই কোন রহস্য আছে। কিন্তু এখন কি করবে? এখানেও তো পাওয়া গেলো না।

খুব হতাশ হয়ে ধানক্ষেত বরাবর হাঁটছে তারা। কি করবে এখন? তাদের মিশন কি ব্যর্থ। হটাত পিছন দিক থেকে তাদের বয়সী একটি ছেলে তাদের কে ডাক দিলো ……।

-আপনারা কি বীরঙ্গনা পরিবানুর খোঁজ নিতে এসেছেন?

-জি

-উনি সে ৭২ সালেই গ্রাম ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। আর ফিরে আসেন নাই। আর হাসপাতাল টা তো উঠে গিয়েছে। তিনি নার্স ছিলেন। আমি এই অঞ্চলে থাকি। কাজ করি একটি এনজিও এর হয়ে। পরিবানুকে নিয়ে একটা আর্টিকেল ছাপানো হয়েছিলো পেপারে। স্বাধীনতার পর পরিবানু কে তার বাপের বাড়ি , শ্বশুর বাড়ি কেউ গ্রহন করেন নাই। এই সত্য প্রকাশিত হওয়ার পর এই দুইটি পরিবার এক ঘরে হয়ে গিয়েছিলো। আপনাদেরকে এরা রিপোর্টার ভেবেছে। ভেবেছে আবার আর্টিকেল প্রকাশ করতে এসেছেন। তাই এরা সাহায্য করেন নাই। যাই হোক পরিবানু কে আপনারা খুঁজছেন কেন ?

সব খুলে বলল তপু।

ছেলেটি তাদের পেপারের কপিটি দিলো। অনেক কিছু লেখা। কিন্তু পরিবানু এখন কোথায় আছেন তা লেখা নেই। শুধু মাত্র লেখা বান্দারবনের কোন একটি হাসপাতালের হেড নার্স তিনি।

কিন্তু এতো বড় বান্দারবনের কোথায় খুঁজবে তারা?

-এই ব্যাপারে আপনাকে সাহায্য করতে পারবেন মান্নান দাদু।

-তিনি কে ? কোথায় পাবো তাকে?

স্টেশনে উনি গান গেয়ে বেড়ান। বয়স অনেক। পরিবানুর দূর সম্পরকের চাচা হন তিনি। যখন পরিবানু কে কেউ জায়গা দিলো না তখন তিনি জায়গা দিলেন। বান্দরবনের চাকুরি সম্ভবত তিনি যোগার করে দিয়েছেন। কিন্তু মুশকিল হলো তিনি এইসব কথা কাউকে বলেন না।

ছেলেটির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে , ধন্যবাদ জানিয়ে তারা হাঁটছে গ্রামের রাস্তা ধরে। আকাশ মেঘলা। বৃষ্টি নামবে। বলতে না বলতেই আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নামলো। ভিজে চুপচুপে হয়ে গেলো ২ জনই। একটা ভাঙ্গা মন্দিরে আশ্রয় নিলো ২ জন। বৃষ্টি না কমা পর্যন্ত এখানেই অপেক্ষা করতে হবে। তপু গভীর ভালবাসা নিয়ে তাকিয়ে আছে ভিকির দিকে। ভিকি দেখলো তপুর চোখে ভালবাসা পাওয়ার আকুতি। ভিকি নিজেও তপুর ভালবাসায় যেন দ্রবীভূত হয়ে যাচ্ছে। ভিতর থেকে কোন এক অজানা আকাঙ্ক্ষা ভিকি কে তপুর দিকে টানছে। তপু তার ভেজা ঠোঁট দুটি ভিকির ঠোঁটে রাখলো। ভিকি জড়িয়ে ধরলো তপু কে। তপু চুমু দিয়ে যাচ্ছে পাগলের মত। হটাত শব্দ শোনা গেলো …। কে যেন আসছে। ২ জন ই সরে গেলো

কিছুক্ষণের মাঝেই বৃষ্টি থেমে গেলো। রোদ উঠেছে। একটা রিকশা ভ্যান নিয়ে অলসপুর স্টেশনে এসে থামলো ২ জন। মান্নান দাদু এখনো স্টেশনে গান গাইছেন। লালনগীতি

ধইন্য ধইন্য বল তারে………।।

তাদের কে দেখে মান্নান দাদু হাসলেন।

-কাজ হল বাবারা?

-না দাদু। আপনাকে আমাদের সাহায্য করতে হবে।

সব শুনে মান্নান দাদু কিছুক্ষণ ঝিম মেরে বসে থাকলেন।

তোমরা যে সত্য বলেছো তার প্রমান কি?

ভিকি পকেট থেকে একটি তাবিজ বের করলো।

মান্নান দাদু চিনতে পারলেন তাবিজ টা। পরিবানু যে হাসপাতালে আছেন তার ঠিকানা জানেন মান্নান দাদু। এই প্রথম তিনি কাউকে পরিবানুর ঠিকানা দিলেন।

পরের ট্রেনেই ফিরে যাবে তারা। বিদায় নিল তারা ২ জন। মান্নান দাদু একটা চিঠি লিখে দিলেন পরিদাদি কে দেয়ার জন্য।

সেইদিন ই বাসের টিকেট কেটে রাতের বাসে রওনা দিলো তারা বান্দারবনের উদ্দেশ্যে।

২ জনই অসম্ভব পরিশ্রান্ত। বাসে উঠেই ঘুমিয়ে পড়লো ভিকি। ভিকি তপুর ঘাড়ে মাথা দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। তপুর কেমন মায়া লাগছে ছেলেটার জন্য। আহা ঘুমাক। কিছুক্ষণ পর তার চোখ ও ঘুমে বন্ধ হয়ে আসলো।

বান্দারবন যখন নামলো তখন ভোর। একটি রিকশা নিয়ে হোটেলে নামলো তারা। বান্দরবনের বেশ গভীরে হাসপাতাল যেখানে পরিবানু চাকুরী করে। গোসল করে , নাস্তা করে বের হলো তারা । চান্দের গাড়ি করে যেতে হবে বাকি রাস্তা। অসম্ভব সুন্দর নৈসর্গিক দৃশ্য। সবুজ পাহাড় আর মেঘের মিলন ঘটেছে। যতই উপরে উঠছে মেঘ তাদের হাতে এসে ধরা দিচ্ছে। রাস্তা এলো মেলো আঁকাবাঁকা। মনে হয় যেন রোলার কোস্টারে উঠেছে। কিছুক্ষণ পর ভিকির শরীর খারাপ হয়ে গেলো। বমি করলো । পরের রাস্তাটুকু খুব ধিরে ধিরে চালালো ড্রাইভার ।

বিশাল হাসপাতাল। এতো গভীরে এই হাসপাতাল টা একজন ধনকুবের তৈরি করে দিয়েছেন পাহাড়ি এলাকার গরীব মানুষের চিকিৎসার জন্য।

সরাসরি নার্সদের কোয়ার্টারে ধুকলো তারা। এখানেই পাওয়া যাবে পরিবানুকে। একজন কে জিজ্ঞেস করতেই দেখিয়ে দিলো পরিবানুর ঘরটি। ভিকির বুকের হৃদস্পন্দন বেড়ে গিয়েছে। এই সেই মুহূর্ত যার জন্য এতো দিন অপেক্ষা করেছে সে। এতো কষ্ট করেছে। সেই সুদূর জার্মানি থেকে বাংলাদেশে চলে এসেছে।

দরজায় নক করলো তপু। ভিতর থেকে কুরআন তিলাওয়াতের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। ঠাশ করে দরজা খুলে একজন বৃদ্ধা বের হয়ে আসলেন। বয়সকালে সুন্দর ছিলেন বোঝা যায়। সবচেয়ে মজার ব্যাপার রাফির সাথে তার চেহারার অসম্ভব মিল। বৃদ্ধার চোখ কেমন যেন কঠিন। কি যেন নেই। আবেগ নেই। শুন্যতা।

-কাকে চাই?

আপনি পরিবানু? তপু জিজ্ঞেস করলো

-জি।

-আপনার কাছে এসেছিলাম। কারন টা ঘরের ভিতর যেয়ে বলি?

-আমি কাউকে ঘরে নেই না। যা বলার এখানে দাড়িয়ে বল। বেশি সময় নেই। আমি বেরবো। আমার ডিউটি আছে।

ভিকি অবাক হয়ে ভাবছে এই তার দাদি? বাবার সাথে তো অদ্ভুত মিল। এতদিন পর সে রক্তের টান অনুভব করছে। কিন্তু দাদির চোখ এতো নিঃস্পৃহ কেন?

ভিকি আর সামলাতে পারলো না নিজেকে।

-দাদি তুমি আমাকেও ঢুকতে দিবে না?

-কি বললে তুমি? আমি কারো দাদি নই। আমার তো কোন সন্তান নাই।

তপু বলল

-সত্যি তো ? ভাল করে চিন্তা করে বলুন।

কেমন একটা ভয়ের ছাপ ফুটে উঠলো পরিবানুর চোখে। এতো বছর পর কি পরীক্ষা দিতে যাচ্ছে সে?

দরজা পুরোপুরি খুলে দিলেন পরিবানু। একটা ডিভানের উপর বসে কুরআন তেলাওয়াত করছিলেন তিনি। ২ টা বেতের চেয়ার দেখিয়ে ২ জন কে বসতে বললেন পরিবানু।

-বল তখন কি বললে?

-দাদি আমরা আপনার খোঁজে এত দূর এসেছি। আমি ঢাকা থেকে আর এ সুদূর জার্মানি থেকে এসেছে আপনার সাথে শুধু কথা বলার জন্য। আপনি বলবেন না কথা?

জার্মানির কথা শোনার পর পরিবানু কেমন জানি কেঁপে উঠলেন।

-আমার খোঁজ পেলে কোথায় ?

আমরা রসুলপুর গিয়েছিলাম। মান্নান দাদুর কাছে আমি খোঁজ পেয়েছি। এই চিঠি টা মান্নান দাদুর। এখানে আমরা কেন এসেছি সব লেখা রয়েছে। আপনি পড়ে দেখেন।

চিঠি টা হাতে নিয়ে চশমা পরে পড়তে শুরু করলেন পরিবানু। বেশ বড় চিঠি। পড়তে সময় লাগছে। পড়তে পড়তে মুখের ভাব পরিবর্তন হচ্ছে পুরিবানুর। একবার মনে হল পরিবানুর চোখ ভিজে যাচ্ছে ।

পড়া শেষ করে চশমা খুলে চোখ মুছে চশমাটা টেবিলের উপর রাখলেন পরিবানু।

ভিকি আর তপু অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন কি বলেন পরিবানু।

-তোমরা ভুল জায়গায় এসেছ। আমি এই পরিবানু নই।

-কিন্তু তা কিভাবে সম্ভব!

-কেন সম্ভব নয়? দেশে কি একটা পরিবানু রয়েছে। তোমরা খুজে দেখো । তোমরা যাকে খুঁজছো আমি সেই মানুষ নই।

-আপনার চেহারার সাথে বাবার চেহারার এত মিল। আমি বিশ্বাস করতে পারছি না যে আপনি আমার দাদি নন।

-তোমার বিশ্বাস অবিশ্বাসে আমার কিছু যায় আসে না। তোমরা এখান থেকে চলে যাও এখুনি।

ভিকি চিৎকার করেই যাচ্ছে।

-আপনি কেমন মা? ছেলে কে অন্য মানুষের হাতে তুলে দিয়েছেন। এখন পুরোপুরি অস্বীকার করছেন। আপনার ছেলে মৃত্যু শয্যায়। আর আপনি তার কথা একবারও ভাবছেন না। আপনার ছেলে একটি বারের জন্য আপনাকে দেখতে চায়। দাদি প্লিজ চল। আমার বাবা কে আমি কথা দিয়েছি। প্লিজ দাদি তার শেষ ইচ্ছা টা পূরণ করতে দাও।

পরিবানু কানে হাত দিয়ে মেঝে তে বসে পড়লো। বাইরে থেকে মানুষ উঁকি মারছে। কি হচ্ছে ভিতরে দেখার জন্য।

এইবার পরিবানু সহ্য করতে না পেরে জোরে চিৎকার দিলেন। তপু বুঝলো আর থাকা যাবে না। এরপর আশেপাশের লোক জন তাদের ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। তপু , ভিকির হাত ধরে টানলো । কিন্তু ভিকি কিছুতেই যাবে না। শেষ পর্যন্ত তপু একটি কাগজে নাম ঠিকানা , হোটেলের ঠিকানা লিখে কাগজ টি টেবিলে চাপা দিয়ে ভিকি কে জোর করে ধরে বাড়ি থেকে বের হয়ে আসলো।

তাদের এই মিশন এইভাবে ব্যর্থ হবে ভাবে নাই ২ জনের একজনও । পরিবানু কে এত কাছে পেয়েও হারাতে হল। বাসে করে ঢাকা ব্যাক করলো বিকেলে। দুই জনই হতাশ , পরিশ্রান্ত । তপু বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে দেখে ভিকি বলল

-তপু আমার একা , নিরব একটা পরিবেশ দরকার। আজকে আমি হোটেলে উঠবো ।

তপু বুঝলো।

-মাইন্ড করলা না তো ?

-আরে না।

কিন্তু তপুর মন খারাপ হয়ে গেলো। ভিকি আসলে তাকে ভালবাসে না।

কিন্তু পরের কথা টা শুনে তার ধারনা মিথ্যা প্রমাণিত হল।

-তোমাকে একটা অনুরোধ করি?

-কর।

-আজকের রাত টা তুমি আমার সাথে কাটাবে?

তপু নিজের কান কে বিশ্বাস করতে পারছে না। কি বলছে এসব ভিকি।

-তপু আই লাভ ইউ।

-লাভ ইউ টু

হটাত কাছে এসে রাস্তায় দাড়িয়ে তপু টুক করে ভিকির গালে একটা কিস দিয়ে দিলো ।

*************

সেদিন রাত টা ছিল তাদের জীবনের একটি স্মরণীয় রাত। এই কয়দিনেই মাঝেই ২ জনের ভিতর অসম্ভব ভালোবাসা তৈরি হয়েছে। রাত বাড়ছে। তপু বাতি নিভিয়ে ডিম লাইট জ্বালালো । সমস্ত কাপড় খুলে ফেলল। ডিম লাইটে শরীরের অবয়ব বোঝা যাচ্ছে। ভিকি কাপড় খুলল। তপু ভিকি কে দরজার সাথে ঠেলে ধরে কিস করছে পাগলের মত। তপুর চোখের মাদকতা,গরম নিঃশ্বাস  আর শরীরের স্পর্শ ভিকি কে যেন পাগল করে দিচ্ছে। বিছানার সাদা চাদরের উপর শুইলো ২ জন। এতো দিনের অপেক্ষার সমাপ্তি হতে যাচ্ছে। একজন আরেকজনের চামড়ার স্পর্শ পেয়ে জেগে উঠেছে। পিষে মারছে ২ জন ২ জন কে। একজন আরেকজন কে নিজের ভিতরে নিলো। অভিন্ন হয়ে গেলো তারা। এক সময় পরিশ্রান্ত হয়ে ২ জনই হাঁপাচ্ছে । ভিকি তপুর বুকে শুয়ে বলল

-আমি ভেবেছিলাম আমি খালি হাতে জার্মানি ফিরে যাবো। কিন্তু তোমাকে পেলাম। কিন্তু আমরা এতো দূরে থাকি। কিভাবে আবার দেখা হবে?

-আমি জারমানি তে মাস্টার্স করার জন্য এপ্লাই করেছি। তোমাকে বলি নাই। সারপ্রাইজ। ইনশাল্লাহ হয়ে যাবে।

-ওয়াও। আমরা তখন একসাথে থাকবো । তাই না?

-হ্যা তাই।

-আমার তো খুশি তে নাচতে ইচ্ছা করছে।

কিন্তু হটাত মন খারাপ হয়ে গেলো ভিকির। বাবার কথা মনে পড়ছে । তার শেষ ইচ্ছা পুরন হল না।

ভিকির মুখ দেখে তপু বলল

-বাবু মন খারাপ কর না। আমরা আবার যাবো পরি দাদির কাছে। যেভাবেই হোক রাজি করাবোই। এখন ঘুমোউ

ভিকি পরম নির্ভরতায় তপুর বুকে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করলো।

*************

অনেক রাতে ঘুমিয়েছিল তারা। তাই কেউ সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতে পারলো না। টেলিফোনের শব্দে ঘুম ভাঙলো ২ জনের। রিসেপশন থেকে ফোন এসেছে।

বিরক্ত হয়ে ফোন ধরলো ভিকি।

-স্যার রিসেপশন থেকে বলছি। আপনার সাথে একজন মহিলা দেখা করতে এসেছেন।

-কি নাম?

-নাম বলছেন না। শুধু আপনাকে যেতে বলছেন।

-উনাকে বসতে দেন। আমি আসছি।

-২ জনই ফ্রেশ হল। কে এলো । কেউ তো ঠিকানা জানে না। খুব অবাক লাগছে।

-১০ মিনিটের মাঝে লবিতে পৌঁছে গেলো তারা।

লবির একদম শেষ প্রান্তে একটি সোফা তে বসে আছেন একজন কালো বোরখা পরা মহিলা।

ভিকি দ্রুত কাছে গেলো ।

সে আর কেউ নয় তার পরিদাদি।

ভিকি কে দেখে হাসলো পরিবানু।

-ভাইয়া তোমার হাত টা একবার ধরতে দাও। আমার আপন রক্ত তুমি।

ভিকির খুব কান্না আসছে।

পরিবানু সোফা থেকে উঠে জড়িয়ে ধরলো ভিকি কে। তিনিও কাঁদছেন।

দূর থেকে তপুর মনে হল এতো সুন্দর দৃশ্য জীবনে দেখে নাই সে। মুগ্ধ হয়ে দেখছে।

এতদিনের বঞ্চনা কষ্ট হারানোর বেদনা সব ধুয়ে মুছে যাচ্ছে পরিবানুর কান্নায়। কখনই সে এভাবে কাঁদে নাই। কার কাছে কাঁদবে ? কেউ ছিল না তার। আজ তো তার আপনজন আছে। তার নিজের নাতি। চোখ মুছলেন পরিবানু।

-ভাইয়া আমাকে তোমার বাবার কাছে নিয়ে চল । আমি একবার তার মাথায় হাত দিতে চাই। আমি ক্ষমা চাবো। তার প্রতি আমি অন্যায় করেছি।

ভিকি বলল

-আমি নিয়ে যাবো তোমাকে যত তাড়াতাড়ি পাসপোর্ট ভিসা করা যায়।

ভিকি এইবার তাকালো তপুর দিকে । চোখে কৃতজ্ঞতা ।

তপু হাসলো । সামনে এসে ধরলো ভিকির হাত। একা একা ছাড়বে না ভিকি কে।


দৃশ্য কৃতজ্ঞতা: somoyekhon.com