সমর্পণ

আগে থেকেই সব ইন্সট্রাকশন্স দেয়া ছিল। গ্যাব্রিয়েলকে বলেছিলাম যাওয়ার সময় যেন সদর দরজা খোলা রেখে যায়। ফয়ের পার হয়ে ডানে গেলে লিভিং স্পেস – ড্রয়িং, ডাইনিং আর কিচেন। বাঁ পাশের দরজা দিয়ে এগোলে বেডরুম। ওকে বলেছিলাম আমি ওর জন্য এখানেই অপেক্ষা করবো।

গ্রীষ্মের শেষ প্রান্তের পড়ন্ত বিকেল। ওর আসার সময় হয়ে গেছে। আয়নায় নিজেকে আরেকবার দেখে নিয়ে দিগন্তে ভাসমান জানালার পাশে এগিয়ে গেলাম। ডুবন্ত সূর্যের লালচে-সোনালী আভায় হাডসন নদীর পানি যেন আগ্নেয়গিরির লাভা। তাতে ছোট বড় অসংখ্য ইয়টে চড়ে শেষ উষ্ণতাটুকু শুষে নেয়ার প্রয়াস সবার। ক্ষণে ক্ষণে আকাশ কাঁপিয়ে হেলিকোপটার এর আনাগোনা। আজকাল হেলিকোপটার চড়ে উপর থেকে নিউ ইয়র্ক শহর দেখা খুব পপুলার টুরিস্টদের মাঝে।

এমনি এক হেলিকোপটার -এর আওয়াজ মিলিয়ে যেতেই শুনি দরজায় টোকা। ঘাড় ফিরিয়ে তাকাতেই এক গাল হাসি নিয়ে এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে দিলো।

-I am David

দৃঢ় কিন্তু কোমল হাতের মৃদু ঝাকুনি যেন মুহূর্তেই আমার সকল ইন্দ্রিয়গুলোকে সজাগ করে তুললো। হবেই বা না কেন …প্রায় এক বছর হতে চললো …কোনো পুরুষের স্পর্শ পায়নি এই শরীর।

নিজেকে সামলে নিয়ে ইতস্তত কণ্ঠে উত্তর দিলাম

-Nice to meet you David. ধন্যবাদ কষ্ট করে আসার জন্য।

-My pleasure. Any drinks at home, if you don’t mind?

বলতে বলতে গা থেকে কালো লেদার জ্যাকেটটি খুলে রাখলো চেয়ার এর উপর। আর সেই সাথে উন্মুক্ত হল ওর ভিতরে পরা কালো ট্যাঙ্কটপ এবং পেশিবহুল বাহু দুটো।

-Yes of course. ফ্রিজে বিয়ার আছে, এদিক দিয়ে বের হয়ে ডানে গেলেই পড়বে। Please help yourself.

আমার চোখ জোড়া ডেভিডকে অনুসরণ করলো। আটোসাটো নীল ডেনিমে ওকে ছবির চেয়েও সুন্দর লাগছে।

ডেভিড একজন যৌনকর্মী। আমি কখনো ভাবিনি শারীরিক চাহিদা মেটানোর জন্য একদিন আমাকে কোন যৌনকর্মীর দ্বারস্থ হতে হবে। এমন না যে যৌনকর্মীদের আমি পছন্দ করি না বা তাদের পেশার প্রতি আমার শ্রদ্ধা নেই। জাস্ট কখনো প্রয়োজন পড়েনি। এই দুর্ঘটনাটা হওয়ার আগ পর্যন্ত আমি নিজেকে মোটামোটি হ্যান্ডসামই মনে করতাম। রেগুলার না হলেও কালেভদ্রে দুই একজন সঙ্গী পাওয়াই যেত। একটা সময় একজন বয়ফ্রেন্ডও ছিল যদিও তা ৮ মাসের বেশি টেকেনি।

আজ প্রায় এক বছর হতে চলল আমি হুইলচেয়ারে। দুর্ঘটনার কারণে আমার দুই পা এখন অকার্যকর। এর মধ্যে হুইলচেয়ার জীবনে আমি এক প্রকার অভ্যস্ত হয়ে গেছি, পারিনি শুধু দৈহিক প্রয়োজনকে পাশ কাটাতে। একটু উষ্ণতা, কারও হাতের ছোঁয়া, দুটি দেহের একটু ঘনিষ্ঠতা। খুব বেশি কিছুতো নয়। কিন্তু একটা সময় এর অনুপস্থিতি আমাকে যেন পাগল করে তুলল।

নিজের সাথে অনেক বোঝাপড়া করার পর সকল লজ্জা, গ্লানি, ভয় আর জড়তা ভুলে একদিন সিদ্ধান্ত নিলাম এস্কর্ট সার্ভিস ব্যবহার করার। কেন এস্কর্ট? সত্যি কথা বলতে এত দিন যে সঙ্গী খোঁজার চেষ্টা করিনি তা নয়। Grindr, adam4adam, Scruff এমন অনেক জায়গাতেই ঢুঁ মেরেছি। কিন্তু একজন সক্ষম সমর্থ পুরুষ কেন আমার মতো বিকলাঙ্গের কাছে আসবে? যারাও বা ভদ্রতা করে মেসেজ-এর উত্তর করত, তারা আবার এত হ্যাপা ভেবে দেখা করত না। আর আমি কারও করুণার পাত্র তো হতে চাই না। যৌনতা কি শুধুই সক্ষম মানুষের জন্য?

ডেভিডকে পেয়েছি বেশ কয়েকদিন খোঁজার পর। অনলাইনে শত শত প্রোফাইল। শুঠাম শরীর, আকর্ষণীয় বর্ণনা আর কারও কারও উত্থিত পুরুষাঙ্গের গর্বিত ছবি। সবাই ব্যাস্ত নিজেকে বিক্রি করার জন্য – টাকা নয়ত অন্য কিছুর বিনিময়ে। ডেভিড-এর প্রোফাইলটা একটু ব্যতিক্রম মনে হয়েছিল। ওর হাসিটা ছিল অনেক উষ্ণ, আন্তরিক আর একই সাথে দুষ্টুমির একটা প্রচ্ছন্ন আবেদন সম্পন্ন। আর ৪৬ বছর বয়সেও শরীর একদম ফিট। এই শরীর সর্বস্ব LGBT সমাজে আমি অনেক সময় নিজেকে অদৃশ্য ভাবতাম…সবার দৃষ্টির আড়ালে। কিন্তু ডেভিডকে মনে হয়েছে আমার সকল অপূর্ণতা আর অপ্রাপ্তির জবাব।

আমি ডেভিডকে মেসেজ পাঠালাম সব বিস্তারিত জানিয়ে। কয়েক ঘণ্টা পর উত্তর এলো। আমাকে আশ্বস্ত করে বলল এর আগেও শারীরিক প্রতিবন্ধী লোকদের সেবা দিয়েছে। সময়, স্থান, পারিশ্রমিক ইত্যাদি ঠিক করা হোল। যখন ওর সাথে এসব নিয়ে কথা হচ্ছিল তখন আমি সত্যি খুব উত্তেজিত হয়ে ছিলাম। কিন্তু যতই দিন যেতে লাগল আমার মধ্যে এক প্রকার ভয় দানা বাঁধতে শুরু করলো। পঙ্গুত্ব বরন করার পর এই প্রথম অন্য কোন পুরুষ আমার শরীর ছোঁবে! এতদিন একমাত্র আমার পরিচারক গ্যাব্রিয়েল ছিল আমার অসহায়ত্বের সাক্ষী। ডেভিড কি আমাকে পছন্দ করবে? ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিবে না তো? কিংবা তার চেয়ে বড় ভয় ও যদি আমায় করুণা করে?

-You have a very nice place.

ডেভিড-এর কথায় চিন্তায় ছেদ পড়লো। আমি অপ্রস্তুত হাসি দিলাম। বিয়ার ক্যান-এ এক চুমুক দিয়ে ডেভিড এর প্রশ্ন

-So what do you want?

অনেক দিন ধরে এই প্রশ্নের উত্তর আমি বুনে চলেছি আমার সর্বগ্রাসী কল্পনা আর চাহিদার সাথে রূড় বাস্তবতার টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে। আমি জানি আমার শরীর কি চায়। ও চায় ডেভিড তাকে স্পর্শ করুক। ওর দৃঢ় বাহু দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে আদর করুক। ওর ঠোঁট যেন চষে বেড়াক আমার ঠোঁট, গ্রীবা, বুক, কোমর, শরীরের আনাচ কানাচ। কিন্তু আমি চাই না ও আমার সাথে ভালোবাসার অভিনয় করুক। আমার সাথে প্রণয়ে মাতুক। একজন অভুক্ত ব্যক্তির কাছে খাবার কিভাবে রান্না হবে সেটা শোনার চেয়ে খাবার খাওয়াটাই বেশি প্রাধান্য পাবে বৈকি!

কিন্তু এই মুহূর্তে ডেভিডকে আমি কিছুই বলতে পারছি না। পায়ের সাথে সাথে বিকলাঙ্গতা যেন ভর করেছে আমার জিহ্বায়। চোখ নিচু করে ইশারা ইঙ্গিত আর গুটি কয়েক শব্দে বললাম আমাকে বিছানায় নিয়ে যেতে হুইলচেয়ার থেকে।

-Do you have a transfer device?

-না। তুমি আমার পা দুটো তুলে ধরো। আমি ছাদ থেকে ঝুলানো রিং ধরে উঠতে পারবো।

আমাকে বিছানায় শুয়ে দিয়ে ডেভিড আরেকবার বিয়ার ক্যান-এ চুমুক দিলো। বিছানার প্রান্তে বসে আমার কাছে ঝুঁকে আসতেই আমি হাত বাড়িয়ে ওর মুখটা আমার মুখের উপর টেনে আনলাম। ও আমাকে আরও দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরলো। এক হাত দিয়ে আমার শার্ট খুলতে খুলতে ও আরেক হাত দিয়ে নিজের ট্যাঙ্কটপ খুলে ফেলল। দেহের সাথে দেহের সংস্পর্শ! ত্বকের সাথে ত্বকের। কিসের কি ডিজেবিলিটি! শিহরন খেলে গেলো সারা শরীর জুড়ে। নিজেকে অনেক দিন পর পুর্নাঙ্গ মনে হল।

ডেভিড আমার দেহের উপর থেকে নিচে নামল। পরনের সোয়েট প্যান্ট খুলতেই বেরিয়ে পড়লো আমার সমস্ত অসহায়ত্ব, সংকীর্ণতা। আমার অনুভূতিহীন পা জোড়া একে ওপরের উপর পড়ে আছে নিদারুণ বেহায়াভাবে। আমি এখন সত্যিকার অর্থেই নগ্ন। কিন্তু কি আশ্চর্য তাতে ডেভিড-এর কোন ভ্রূক্ষেপ নেই! আমার অসাড় পা জোড়াই যেন ওর সমস্ত সুখের আধার। আমি নিজের মাঝে কুকড়ে যেয়েও পারলাম না। ততক্ষণে ডেভিড নিজেও উলঙ্গ। ওর শাণিত, সুঠাম, একটু ক্ষয়ে যাওয়া শরীর যেন এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে আরাধ্য বস্তু। বুক বেয়ে নেমে যাওয়া সোনালি কেশের সরু পথের শেষটা যেন সকল ভ্রম আর সুখের উৎসে।

বাকি সময়টা এক ঘোরের মধ্যে কেটে গেলো। আমাকে সুখ দিতে ডেভিড কোন কার্পন্য করেনি। কিন্তু আমি ওর জন্য বটম হতে পারিনি। দুর্ঘটনার পর থেকে আমার নিম্নাঙ্গের মাংসপেশি অদ্ভুত আচরণ করছে। বেশি উত্তেজনা হলে মাংসপেশিতে টান পড়ে। তাই আমার অর্গাজম-এর সময় ও খেয়াল রেখেছে কোথাও কোন ব্যথা যাতে না হয়। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি। বীর্যপাতের সময় তীক্ষ্ণ ব্যথায় ককিয়ে উঠলাম। ভাগ্যের কি পরিহাস…আমার কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে আসা শীৎকার আর লিঙ্গ থেকে নিঃসৃত বীর্য আমারই দুই সত্ত্বার দুইরকম বহিঃপ্রকাশ। আমার শারীরিক প্রতিবন্ধীত্ব আর আমার সমকামিতা।

ডেভিড শুয়ে আছে চুপচাপ আমার পাশে। যাওয়ার তাড়া নেই। একটু পর জড়িয়ে ধরে, কপালে চুমু খেয়ে বলল

-I think you are very handsome.

আমার চোখ দুটো কি একটু ভিজে এলো? হয়ত সে সত্যি বলছে। হয়ত আমাকে শুধুমাত্র সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বলা। কিন্তু কারণ যাই হোক এই মুহূর্তে এই কথাগুলো খুব ভালো লাগল। আমার সকল লজ্জা, সংকীর্ণতা, উৎকণ্ঠা উবে গেলো ওর মমতায়।

হ্যাঁ, ও একজন যৌনকর্মী। এসেছে টাকার বিনিময়ে সেবা দিতে। কিন্তু আজ ও আমাকে যা দিয়ে গেলো তার কি কোনো মূল্য নির্ধারন করা যায়? মানুষের কাছে যৌনতার মূল্য আসলে কী?

ডেভিড চলে যাওয়ার পর একটা গভীর প্রশান্তি ছেয়ে থাকল শরীর আর মন জুড়ে। এ কি শুধুমাত্র কামনা মিটে যাওয়ার পরিতৃপ্তি? আমার এই শরীরও যে কারো কামনার যোগ্য হতে পারে, আমিও যে কারও সুখের উৎস হতে পারি…সেই বা কম কি! এটা ছিল আমার জন্য এক নতুন যাত্রা, নিজেকে নতুন করে খুঁজে পাওয়া। বেঁচে থাকার, জীবনকে উপভোগ করার এক রসদ। কি অদ্ভুত ক্ষমতা এই যৌনতার!


গল্পটি প্রাইস অব ইন্টিমেসি: দি টাইম আই হায়ার্ড এ সেক্স ওয়ার্কার এর ভাবানুবাদ। মূল গল্পের লেখক এন্ড্রিউ গার্জা ডেলিসিয়াসলি ডিসাবল কনসাল্টিং নামক একটি প্রতিষ্ঠানের সহ-পরিচালক যেখানে জনপ্রিয় সংস্কৃতি (পপ কালচারে) আর প্রতিচ্ছেদ্য/আন্তঃসম্পর্কীয় জনগোষ্ঠীর কাছে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা গ্রহণসাধ্য করে তোলা হয়। তিনি সমকামীদের মধ্যে শারীরিক সৌন্দর্য্য নিয়ে যে আদর্শ রয়েছে তা বিনির্মাণের মাধ্যমে দেখিয়েছেন ক্যুয়ার শারীরিক প্রতিবন্ধিত্ব প্রতিনিধিত্বের যোগ্যতা রাখে। তার লক্ষ্য শারীরিক প্রতিবন্ধীদের কথোপকথনে সবাই স্বাগত জানানো।