বৈচিত্রময় যৌন পরিচয়ের মানুষগুলোর মুক্তিযুদ্ধ।

 

মাঝে মাঝে ভাবি, আচ্ছা এইদেশ যে এতো ত্যাগের  বিনিময়ে যে স্বাধীনতা অর্জন করলো, তার একমাত্র কৃতিত্ব কি কোনো রাজনৈতিক দলের? কোনো বিশেষ ধর্মের মানুষের? কোনো বিশেষ লিঙ্গের অর্জন? যুদ্ধ যখন হয়েছিলো তাতে কি কোনো বিজ্ঞান-মনষ্কমানুষের অংশগ্রহন ছিলো না, কোনো নারীর অংশগ্রহন ছিলো না? কোনো হিন্দুর? অথবা কোনো নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ? কিংবা এতো এতো মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে কেউ কি বৈচিত্রময় লৈঙ্গিক পরিচয়ের মানুষ ছিলো না? ভিন্ন ভিন্ন পেশার মানুষ ছিলো না? সব কি শুধু স্বাধীনতার বর্তমান সুবিধা ভোগীরা ছিলো? কিন্তু তা তো সম্ভব না, ইতিহাস তো বলো ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। ইতিহাস বলে ওই যুদ্ধ ছিলো জনযুদ্ধ। সেই গনযুদ্ধ ছিলো গন মানুষের অংশগ্রহনে, যেখানে ছিলো সকল শ্রেণী,পেশা,বর্ণ,গোত্র,মানসিকতার মানুষ। আচ্ছা সেই যোদ্ধাদের মধ্যে, সেই নির্যাতিতাদের মধ্যে, সেই শহীদদের মধ্যে কেউ কি ছিলো না বৈচিত্রময় যৌন আকাঙ্খার মানুষ?

 

০১.

হাসছেন? হাসুন, হাস্যকর প্রশ্নইতো করলাম বটে, যুগে যুগে বৈচিত্রময় যৌন আকাঙ্খার মানুষগুলো প্রত্যেক সভ্যতা, সমাজের সাথে মিশেই ছিলেন। কিন্তু সমাজ নামক রাক্ষসের করালগ্রাস থেকে নিজেকে বাঁচাবে বলে কখনো নিজেদের প্রকাশ করতে পারেনি তারা। এই দেশে, আজও তা প্রকাশ করা সম্ভব নয়। এই বৈচিত্রময় যৌন আকাঙ্খার মানুষ গুলোর অস্তিত্ব অনেকটা কল্পনা বিলাসীদের, কল্পনার সেই রক্তপিয়াসী ভ্যাম্পায়ারদের মতো, কল্পনার বিলাসীরা ভাবে হয়তো তারা আমাদের মাঝেই মিলে মিশে আছে, আমরা তার প্রমান পাইনা। অনেকটা মোল্লাদের ভাবনার মতো “জ্বীণ আমাদের সাথে সহ অবস্থাণ করে, আমরা তাদের উপস্থিতি টের পাই না”। কিন্তু বৈচিত্রময় যৌন আকাঙ্খার মানুষগুলো কল্পনা বা ভাবনার মতো কোনো কিছু না, তারা অত্যন্ত বাস্তব। মাঝে মাঝে ভাবতাম “আচ্ছা জ্বীন যদি থাকেই কিংবা ভ্যাম্পায়ারও যদি থাকে, তবে কেন তারা আমাদের সামনে আসে না” ? যথাযথ উত্তর খুঁজে না পেয়ে একদিন করলাম কি ওই জ্বীন, ভ্যাম্পায়ারদের জায়গায় দাঁড় করিয়ে দিলাম “বৈচিত্রময় যৌন আকাঙ্খার মানুষ”গুলোকে, আশ্চর্য উত্তর পেয়ে গেলাম! আসবে কিভাবে!  আসলে তো কুপিয়ে, ছিড়ে, খাবলে, ফতোয়া দিয়ে, আন্দোলন করে, ঘৃণা করে, বিদ্বেষ দিয়ে ভ্যানিশ করে দিবো আমরা তাদের। যেমনটা বৈচিত্রময় যৌণ আকাঙ্খার মানুষগুলো কে আমরা দেই।

অথচ ভাবুন এই মানুষ গুলো কিন্তু আমাদের আশে পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়েই আছে, দিব্যি কেটে যাচ্ছে দিন রাত আমাদের সাথেই, কিন্তু প্রকাশ করতে পারছে না নিজেদের কে। হয়তো সে আপনার পাশে থাকা আপনার সবচেয়ে ঘনিষ্ট বন্ধুটি, কিংবার আপনার সন্তান, হতে পারে যার সাথে আপনি সংসার করছেন তিনিও। কিন্তু তারা অধিকাংশই নিজেদের প্রকাশ করে না, কারন প্রকাশ করলেই “সমাজ” “ধর্ম” “রাজনীতি” মিলে হামলে পড়ে বিভৎসতায় মেতে উঠবে ওই মানুষ গুলোকে নিয়ে। আর তাই হয়তো স্বাধীনতার যুদ্ধে অংশগ্রহনকারী কোনো বৈচিত্রময় যৌন আকাঙ্খার মানুষকে আমরা আলাদা করে জানি না, বা চিনি না, এবং তারাও হয়তো সমাজের ভয়ে কখনো মুখ খোলেননি।  কখনো যদি তাদের মুখে শুনতে পেতাম তাদের জন্য কেমন ছিলো ওই জনযুদ্ধের গনযুদ্ধ!

 

০২.

একবার বন্ধুচক্রের মাঝে আলোচনায় একবন্ধু ঠাট্টা করে বলে উঠলো “আচ্ছা স্বাধীনতা যুদ্ধে সম্ভ্রম কি শুধু কেবল নারীরাই হারিয়েছে? কোনো পুরুষ কি হারায় নি?” ওর প্রশ্নটা নিছকই ঠাট্টা ছিলো আমিও জানি, কিন্তু প্রশ্নটা মনোজগৎ-এ একটা নাড়া দিলো, সত্যিতো বৈচিত্রময় যৌন আকাঙ্খার মানুষযে শুধু এই অঞ্চলে অবস্থান করে তাতো নয়, তবে এটা কি একে বারেই অবান্তর প্রশ্ন যে কোনো ছেলে বা মেয়ে, হানাদেরর সমলিঙ্গ দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়েছে? আমি সিরিয়াসলি প্রশ্নটা নিয়ে ভেবে চিন্তে ওই বন্ধুর সাথে শেয়ার করলাম বিষয়টা, সে বললো “ধুর কেন কোনো বিসমকামী মানুষ তার সমলিঙ্গের কাউকে যৌণনিপীড়ণ করতে যাবে”। আমি ওর আর ভাবিনি বিষয়টা নিয়ে।

কদিন পরে একটা ঘটনা জেনে আমি তাও পরিষ্কার হলাম। দেশের স্বনামধন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর মাঝে একটা বিশ্ববিদ্যালয়। একছেলে পড়তে গেলো সেখানে, তার আচরণে মেয়েলি কিছু স্বভাব ছিলো, এবং তার জন্য বন্ধুমহলে তাকে “গে” বলেই কখনো সামনে, কখনো বা পিছনে তিরষ্কার করা হতো, (আসলে শব্দটা বুলিং হবে), তো সেই ছেলে পড়ে যাবার পরে, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে একটা মেসে উঠলো বন্ধুদের সাথে। ফার্ষ্টইয়ারে পড়ে, বড়ভাইদের সম্মান করে চলতে হয়, আবার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বলে কথা, র‍্যাগ নামক এক খড়্গ আছে তার জন্য।

ডিসেম্বরের কথা, একবন্ধু ফোন দিয়ে বললো, তোর তো অনেক জানাশোনা আছে, তোর সাথে একাটা কথা শেয়ার করি, “আমার একছোট ভাই আজাদকে চিনিস না (ছদ্মনাম) ও তো ফার্ষ্টইয়ারে। আজকে ওর সাথে একটা ঝামেলা হইছে একজন বড় ভাইয়ের সাথে”। আমি বললাম “পাবলিকে বড় ভাইয়ের সাথে ঝামেলা করতে যায় কেন, আর আমি কি করবো এখানে”, বন্ধু বললো শোন আগে। “আজাদের মেসমেট গুলা বাইরে ঘুরতে গেছিলো, কিন্তু আজাদ রুমেই ছিলো, ওর এক বড় ভাই পাশের মেসেই থাকে, ওর রুমে এসে ওরে রেইপ করছে, প্রায় সারাদিন, ওরে মারছে, গায়ে দাগ ও পড়ে গেছে”। এইটুকু বলো ও থামলো, আমি গম্ভীর হয়ে বললাম “ও কেমন আছে?” বন্ধু বললো “বড় ভাই চলে যাবার পরে, ও কান্নাকাটি করতেছে খুউব, আমি ফোন দিছিলাম, সন্দেহ হইলো মন খারাপ, চেপে ধরতেই হাউমাউ করে কান্নাকাটি করে এইসব বলছে। জানতে চাইলাম “ও কি পুলিশ কমপ্লেইন করবে?” বন্ধু বললো “আজাদ তো গোসল করে নিয়েছে, আর ও পুলিশ কমপ্লেইন করবেও না, বুঝিসইতো এইসব ইস্যুতে কি কমপ্লেইন করা যায়?” বললাম আমি যদি কোনো ল’ইয়ার ধরিয়ে দেই ও কি প্রতিকার চাইবে? বন্ধু বললো মনে হয়না। এবার মেজাজ গেলো বিগড়ে বললাম “আমি তাহলে কি সাহায্য করবো, দেখ কথা বলে ও প্রতিকার চাইলে না কিছু করা যাবে”।

 

০৩.

ভাবুন তো এমন একটা পরিস্থিতিতে পড়লে বাংলাদেশে কোনো ছেলে কি কখনো প্রতিকার চাইবে? এই প্রশ্ন নিজেকে করতেই বুঝলাম, আজাদের প্রতিকার চাইবার কথা ও না, এই সমাজ ব্যবস্থায় প্রতিকার চেয়ে কি হবে! একটা শিশু যখন মাদ্রাসায় হুজুর দ্বারা ধর্ষিত হয়, শিক্ষক দ্বার নির্যাতিত হচ্ছে, তাই নিয়েই তো কথা বললার সাহস হয়না ভিক্টিমের। আরে এখানে তো একটা ছেলে তাও ভার্সিটি পড়ুয়া, সমাজ কি বলবে! লোকে কি বলবে? শালার লোক, সামাজ এই কনসেপ্ট গুলোইতো আমাদের পশ্চাদপদ করে রেখেছে। আমি হাসতে গেলে লোকে কি বললে? আমি কাঁদতে গেলে সমাজ কি ভাবে দেখবে এই ভাবনা ভাবতে ভাবতে আমাদের জীবন পার। এই সমাজে বিয়ে না করে, অথবা করে, একজন মানুষ চাইলে গোপন ভাবে শত শত বার সঙ্গমে মিলিত হতে পারে, এবং তা যে একেবারেই সমাজের লোকের বোঝে না তাও কিন্তু নয়, কিন্তু সামাজিক ভাবে যদি কেউ একাধিক বিয়ে করে, বা কোনো ডিভোর্সী সিলেঙ্গ মাদার, অথবা বিধবা যদি বিয়ে করে, তখন ওই সমাজ তার দিয়ে বাঁকা চোখেই তাকায়, এবং সুযোগ মতো একহাত নিতে ছাড়ে না মানুষটাকে

ওই ঘটনা থেকে দুটো বিষয় শিক্ষা নিলাম, আমাদের তথাকথি সমাজে যারা দিনভর হোমফবিয়ায় ভোগে, সময় সুযোগ পেলে তারাই হয়ে যায় ধর্ষক, তাও সমলিঙ্গের। এবং আমার ভাবনা একেবারেই অমূলক বলে কেউ ফেলে দিতে পারেন না যে স্বাধনীতার যুদ্ধে কেবল মাত্র মেয়েরাই যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। যৌন নির্যাতনের শিকার ছেলেরাও হতেই পারে, কিন্তু আমরা সমকামিতাকে ট্যাবু করে রাখার কারনে, এই ধরনের যতগুলো অপরাধ হয়, তা আসলে আঁধারেই থেকে যায়, জেনে বুঝেও এই ধরনের অপরাধ গুলোকে কখনো শাস্তির আওতায় আনা হয় না।

কি খুউব লেইম লাগছে আমার কথাগুলো? এ কেমন কথা, স্বাধীনতারএতো বছর পরে এখন আবার এইসব কথা কেন? থাকনা এইসব কথা!

আমি বলি থাকবে কেন? যারা ছিলো সর্বদা, যারা আছে, যারা থাকবে আমাদের মাঝে, তাদের অবদান গুলো আমরা কেন তাদের স্বপরিচয়ে জানবো না?  দেখুন তো বাংলাদেশে মোটামুটি সব ভিন্নমতের মানুষগুলোর সরব উপস্থিতি থাকলেও বৈচিত্রময় যৌন আকাঙ্খার মানুষগুলো উপস্থিতি অনেকটা অদৃশ্য।

 

০৪.

প্রায় বছর বছর চারেক আগে “রূপবান” নামক একটা ম্যাগাজিন বৈচিত্রময় যৌন আকাঙ্খার মানুষগুলোর থাকার প্রমান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলো। যাত্রার দ্বিতীয় বছরেই সেই ম্যাগাজিনের প্রকাশককে কুপিয়ে মারা হয়েছিলো। কিন্তু রূপবানএকটা কাজ করেছে তা হলো বাংলাদেশে “তারা আছে” এটা ব্যাপক আকারে জানিয়ে গেছে। জুলহাজ মান্নান হয়তো দুইবছরে অতটা সাড়া ফেলতে পারে নি, কিন্তু তার মৃত্যু মেইনস্ট্রিম মিডিয়া থেকে শুরু করে সব শ্রেণীর মানুষে কাছে একটা মেসেইজ দিয়ে ছিলো “তারা আছে”। কিন্তু আহা, মুক্তিযুদ্ধের সাথে যদি কোনো বৈচিত্রময় যৌন আকাঙ্খার মানুষ থেকে থাকে, এবং তারা যদি স্বাধীনতা পরবর্তীতে, স্বপরিচয়ে নিজের পরিচয় তুলে ধরে বলতেন হ্যা আমি একজন বৈচিত্রময় যৌন আকাঙ্খার মানুষ এবং আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা

তবে এই দেশের মানুষেরা আরো ৪৭ বছর আগেই জানতো তারা আছে। হয়তো যে অস্তিত্ব জানান দেয়ার চেষ্টা বর্তমানে বাংলাদেশের বৈচিত্রময় যৌন আকাঙ্খার মানুষগুলো করছে, তা অনেকটা অগ্রসর হতো। কিন্তু আমাদের তীব্র ভয়, আমারা প্রাণের ভয়ে কথা বলি না, আমরা সম্মানের ভয়ে কথা বলি না। আর বৈচিত্রময় যৌন পরিচয়ের মানুষ গুলো তো এলিয়েন না, যৌন পরিচয় ভিন্ন হলেও তারাও জাতিতে বাঙালী তা, ওই লোকলজ্জা, চক্ষুলজ্জা, সম্মানহানির ভয়ে হয়তো কোনো বৈচিত্রময় যৌন পরিচয়ের মুক্তিযোদ্ধা নিজেকে কখনো আমাদের সমাজে পরিচয় করায় নি।

কিন্তু এই চুপ থেকে কি বাঁচতে পারছেন কেউ? একে একে সবাইতো মরছেই, মরবেই। যদি নিজেদেরকে প্রকাশ করার উদ্যোগ গুলো দেশের জন্য অবদান রাখা বৈচিত্রময় যৌন আকাঙ্খার মানুষগুলোর কাছ থেকে আরো আগে থেকেই আসতো , তবে হয়তো এতোটা ট্যাবু আজকের বাংলাদেশের মাইনোরিটি গ্রুপ গুলোকে মোকাবেলা করতে হতো না। একটা সেন্স থেকে বিবেচনা করলে আসলেই নিজেদের অস্তিত্বকে প্রকাশ করা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আত্মহত্যা করা বা মৃত্যুকে আমন্ত্রণ জানানো। তবে যদি আজকের বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠিত মানুষ যারা বৈচিত্রময় যৌনআকাঙ্খা লালন করে, তারা যদি নিজেদের সত্তাকে প্রকাশ করতো, হবে হয়তো বাকিদের চলার পথটা আরেকটু মসৃণ হতো, হয়তো সমাজ ও এই মানুষগুলোর অবদানের কথা স্বরণ করে আরেকটু সমীহ করতো। হয়তো, এই বৈচিত্রময় যৌন পরিচয়ের মানুষ গুলোকে নতুন করে মুক্তির জন্য যুদ্ধ করতে হতোনা।