দ্য এডিটর (১ম পর্ব)

শেষের শুরু

‘ক’ তে কাদের মোল্লা, তুই রাজাকার! তুই রাজাকার!

ফাঁসি চাই! ফাঁসি চাই!

স্লোগানে মুখরিত শাহবাগ চত্বর। চারদিকে হাজার হাজার মানুষ গিজগিজ করছে। হাঁটার জন্য তিল পরিমাণ জায়গা নেই। তরুণ, তরুণী, বৃদ্ধ – সকল বয়সের মানুষ একটি দাবি আদায়ের জন্য হাজির হয়েছে। বিশ বা একুশ বছর বয়সী এক তরুণী মাইকে চিৎকার করে স্লোগান দিচ্ছে, ‘ক’ তে কাদের মোল্লা। তুই রাজাকার! তুই রাজাকার! ‘তুই রাজাকার’ বলার সময় আশেপাশের মানুষ একসঙ্গে গর্জন করে উঠে। ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের যুদ্ধ কোনো  জাগরণই দেখা হয়নি। এমন বৃহৎ একাত্মতা দেখে বুঝা যায় চেতনা কতো বড় শক্তি! কাদের মোল্লার বিচারের রায় শেষে যখন তিনি ‘ভি’ চিহ্ন দেখালেন তখনই জাতির বিবেক, জাতির চেতনা, জাতির রাগ ফুলে ফেঁপে ছিটকে বেড়িয়ে এলো।

৫ ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া আন্দোলন দেখার ইচ্ছে সবার মধ্যেই ছিল। শুধু কি দেখার ইচ্ছে? না! নিজে এতে শরীক হওয়ার প্রবল অভিলাষ সব বয়সী মানুষের মধ্যে টগবগ করছিল। নাদীর নিজেও এ দলে অন্তর্ভুক্ত। দেশে এতো বড় জাগরণ হচ্ছে আর সে যাবে না? তা কি করে হয়?

শাহবাগের যে পাশে ফুলের দোকানগুলো আছে সেগুলোর সামনে অনেক স্টল বসানো হয়েছে। নাদীর স্টলগুলোর খুব পাশ ঘেঁষে হেঁটে যাচ্ছে। তার হাতের ডানদিকে শতশত মানুষ বসে স্লোগান দিচ্ছে, ভাষণ শুনছে। এইতো কিছুক্ষণ আগে একজন বিখ্যাত ব্যক্তি কথা বলে মঞ্চ থেকে নামলেন। চারদিকের মানুষ আর শব্দে মাথা ঝিমঝিম করছে নাদীরের। মানুষের মন বড়ই বিচিত্র। যে জাগরণ দেখার জন্য যার আগ্রহ ছিল আকাশচুম্বী এখন তা স্বচক্ষে দেখার পর তেমন কোনো অনুভূতি তার মধ্যে কাজ করছে না। তাহলে কি বলা যায় কি তার বিবেক কর্পূরের মতো  উড়ে চলে গিয়েছে? তার মন সজীবতা হারিয়ে ফেলেছে? আচ্ছা সবাইকে কি জাগরণের স্রোতে ভেসে যেতে হবে? অবশ্য এ কথা তারা যদি শুনে তাহলে খবরই আছে! তাড়িয়ে দিবে। নাদীর ধীরে ধীরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। শাহবাগের জাগরণ দেখা হল এবার বইমেলায় যাওয়া যাক। গত ১০বছর ধরে সে বইমেলায় আসছে, কখনও মনে হয়নি ‘না, এবার যাবো না’। না যাওয়ার চিন্তা করা তার পক্ষে অসম্ভব। বই পোকা এ ছেলের কাছে বইমেলা হল স্বর্গ। টিএসসি সামনে চলে এসেছে নাদীর। পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে সময় দেখল। সাড়ে পাঁচটা বাজে। আর কিছুক্ষণের মধ্যে সূর্য ডুবে যাবে। চারদিক ঝাঁকিয়ে শীত নামবে। রাতে বইমেলায় ঘুরতে নাদীরের তেমন ভালো লাগে না। তবে আজ বাধ্য হয়ে আসতে হয়েছে। অনুরাগের অফিস শেষ হয় সাড়ে ৪টায়, আসতে আসতে ৬টা বাজবেই। গুলশান থেকে আসতে ২ঘন্টা? সে নিজে মোহাম্মদপুর থেকে চলে এলো দেড় ঘণ্টায় আর ও আসবে ২ঘন্টায়? ভালোই অনুমান করা হল। দিনদিন গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে আর সেই সাথে বাড়ছে মানুষ। এমন এক সময় আসবে যখন কোন জায়গায় যেতে হলে পায়ে হেঁটে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না। ইতিমধ্যে তা শুরু হয়ে গিয়েছে।

টিএসসিতে মানুষ গিজগিজ করছে। ধাক্কাধাক্কি করে মানুষ এগুচ্ছে। ফেরিওয়ালা ক্রেতা হাঁকাচ্ছে। ফুচকাওয়ালাদের কোনো ফুরসত নেই। অনেকেই পরিবারসহ বের হয়েছে। ছোট ছোট বাচ্চাকাচ্চাগুলো সুন্দর করে সেজে কেউ হেঁটে কেউ বা বাবার কোলে চড়ে বেড়াচ্ছে। শান্তশিষ্ট বাচ্চা নাদীরের বেশ প্রিয় কিন্তু যতবার বাচ্চাকাচ্চাদের সাথে বের হয়েছে তাকে ততবার ভয়ংকর ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়েছে। কেউ মেলায় হারিয়ে যায় আবার কেউ একটা জিনিস কেনার জন্যে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে গলা ফাটিয়ে কাঁদবে আরও কত কি!

নাদীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ঢুকে এক ফুচকার দোকান থেকে লাল রঙের এক চেয়ার নিয়ে নিরিবিলি জায়গায় বসলো। ফুচকাওয়ালা আড় চোখে তার দিকে তাকাল। নাদীর হাত দিয়ে বুঝিয়ে দিলো সে দূরে কোথাও যাচ্ছে না। কাছেই আছে। ফুচকাওয়ালার মুখমণ্ডলের চিত্র অবশ্য পাল্টালো না। চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে ভুরূ কুঁচকে তাকাল। প্রচণ্ড ভিড়। বাংলা একাডেমীর সামনে ভিড় বাড়ছেই। এতো মানুষ বই ভালোবাসে? দেখে তো মনে হয় না। চারদিকের আওয়াজ তাকে বিরক্ত করছে। সে আবারও হাতে রাখা মোবাইলের দিকে তাকাল। ৬টা বাজতে ১০ মিনিট বাকি। সময় কি এগুচ্ছে না?

নাদীর আজ মোটা কাপড়ের হালকা নীল রঙের একটা পাঞ্জাবী পরেছে। তার উপরে পাতলা কালো রঙের উলের সোয়েটার। ছাই রঙের চাদরও জড়িয়েছে। চুলগুলো হালকা কোঁকড়ানো। চুল বড় হতে থাকলে ফুলে যায় তাই সে মাঝারী রাখে। আবার একবারে ছোট করে চুল কাটলে অতি বাচ্চা বাচ্চা ভাব চলে আসে। তখন তাকে ২৪ বছরের যুবক লাগে না। তাকে লাগে সদ্য তের বছরে পা দেওয়া টিনেজার। কৃষ্ণ তার গায়ের রঙ, ছোট চোখ দুটো মোটা ফ্রেমের বিশাল পাওয়ারের চশমা দিয়ে ঢাকা থাকে। গোলগাল চেহারা, সারা মুখ জুড়ে ঘন কালো চাপ দাড়ি। তবে চেহারায় জ্ঞানী জ্ঞানী ভাব দেখা যায়। যেন বুদ্ধির ভাণ্ডার তার চেহারা দেখলেই বুঝা যায়।  শরীরের গড়ন উচ্চতা অনুযায়ী অধিক বেশী নয়। ৫ফুট ৩ ইঞ্চি বলে এই জমানায় কম খোঁটাও শুনতে হয় না। খোঁটা দিলেই কি? সে কি তাদের ছাড়ে? একটা খোঁটা দিলে হাজারোটা খোঁটা শুনিয়ে সে ক্ষান্ত হয়। পদার্থে অনার্স করছে। শেষ বছর। তবে তার সবধরনের গুণ বাংলা শব্দে, বাক্যে প্রকাশ পায়। খুব ভালো লিখতে পারে। লেখার মধ্যে কলিকাতার লেখকদের দাপটতা পাওয়া যায়। পরিবারের জোরজবরদস্তিতে পদার্থে পড়ছে তা ঠিক নয়, তবে একটা ভালো বিষয়ে পড়তে হবে সেটা তখন মাথায় ঘুরত। এখন ঘুরে না। এখন সমাজের বানানো রীতিনীতিগুলো নিয়ে সে ততটা ভাবে না।

নাদীর শরীরে জড়ানো চাদরটা ঠিক করতে করতে আকাশের দিকে তাকাল। কালো আবছা আস্তরণ তৈরি হচ্ছে। শীতের সন্ধ্যা দ্রুত কেটে যায়। আবার মোবাইলের দিকে তাকিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লো। খামোখা বসে থেকে কাজ নেই। হাঁটাহাঁটি করলে শীত কম লাগবে।

এক ঝটিকায় চারদিক অন্ধকার হয়ে গেলো। বইমেলাকে কেন্দ্র করে সারা এলাকা আলোতে ঝলমল করছে। স্ট্রীট লাইটগুলো মরিচা বাতির মতো ঝলকও দিচ্ছে। ভিড় কমছে না। বাড়ছে। গণজাগরণ মঞ্চ থেকে মাইকে চিৎকার করে একজন স্লোগান দিচ্ছে। এতদূর থেকেও যদি কানে এসে বাজে তাহলে যারা মাইকের কাছে আছে তাদের অবস্থা কি?

মোবাইল বেজে উঠলো। অনুরাগ কল করেছে। বের হওয়ার আগেই তাকে বলে দিয়েছিল যেন টিএসসি এর সামনে এসে কল দেয়। নাদির টিএসসি মোড়ে ভিড় ঠেলে খুব কষ্ট সুবিধা মত জায়গায় এসে দাঁড়ালো। তবে এক সেকেন্ডও শান্তি মতো দাঁড়াতে পারছে না। মানুষ ঠেলে তাকে একবার ডানদিকে পাঠাচ্ছে আরেকবার বামদিকে। কয়েক কদম ফেলতেই চায়ের দোকানের সামনে অনুরাগের দেখা মেলল। তার হাতে চায়ের কাপ। কাঁধে হাওয়াই রঙের ঝুলি। এই ঝুলি নিয়ে এমব্যাসিতে যায় কি করে? অবশ্য অনুরাগের কোন ক্ষেত্রে সংকোচ কাজ করে না। খুব কনফিডেন্সের সঙ্গে চলাফেরা করতে পারে। তাদের দুজনকে একসঙ্গে দেখলে মানুষজন ‘যমজ ভাই’ বলে চিৎকার করে উঠে। চিৎকারের পুরো ব্যাপারটা নাদীরের কাছে অসহ্য লাগে। একজনের সঙ্গে আরেকজনের মিল থাকতেই পারে তারমানে এই নয় দেখা মাত্রই ‘এই তোমরা কি আসল ভাই-ভাই?’ ‘তোমরা কি মেলায় হারিয়ে গিয়েছিলে?’ বলে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে দেওয়া। গায়ের রঙ এক হলেই রক্তের ভাই হয়ে গেলো? পাশ্চাত্য সমাজকে আমরা আঙুল তুলি আমাদের রঙ নিয়ে ঠাট্টাতামাসা করার জন্য। তবে কি ভেবে দেখেছি আমরা কিভাবে মানুষকে তার চামড়ার রঙ নিয়ে ভয়াবহভাবে বাক্সবন্দী করে থাকি?, এইগুলো ভাবতে ভাবতে কিঞ্চিৎ মাথা গরম হয়ে নাদীরের।

আজ অনুরাগ হালকা বেগুনী রঙের কুর্তা পড়েছে। কুর্তাটি নাদীর গত বছরে জন্মদিনের উপহার হিসেবে দিয়েছিল নাদীর । অনুরাগের সঙ্গে তার অনেক মিল আছে, আবার অমিলের তালিকাটাও ছোট নয়। উচ্চতায় এক হলেও, নাদীরের তুলনায় অনুরাগ বেশ রুগ্ন। ২০০৬ সালে যখন প্রথম তাদের দেখা হয়েছিল তখন নাদীরের বিস্ময়ের সীমানা ছিল না এই ভেবে একটি মানুষ কিভাবে অনুরাগের মতো শুকনো হতে পারে। তবে অনুভূতি প্রকাশ করার পর অনুরাগ বেশ কষ্ট পেয়েছিল, তাই এরপর থেকে কারোর শারীরিক গঠন নিয়ে প্রশ্ন তুলার সাহস করেনি নাদীর। তবে আগের চেয়ে সে এখন শরীর সচেতন। এই নিয়ে নাদীরের অনেক অভিযোগ আছে। সমাজের দশটি মানুষের কথা শুনে অনুরাগ কেন বদলানোর চেষ্টা করছে? এই কথাগুলো বলতে গেলেই অনুরাগ গম্ভীর গলায় নাদীরের সেই অনুভূতির কথা আঙুল তুলে মনে করিয়ে দেয়। তখন নাদীরের বলার আর কিছুই থাকে না।

অনুরাগের ঘন কালো চুল সবাইকেই আকর্ষণ করে। ঘাড় অবধি চুল, আর মুক্তার মতো চকচকে দাঁতের হাসিই হল অনুরাগকে চেনার সবচে উত্তম উপায়। এককালে চিকন ফ্রেমে চশমা পরত, তবে ল্যাসিক করবার পর আর দরকার হয়নি। নাদীর ল্যাসিকের বিরুদ্ধেও আওয়াজ তুলেছিল। অনুরাগ অবাক হয়নি, আবার হতাশও হয়নি। নাদীরের পক্ষের সবই সম্ভব। সে অনেক বৃহৎ ব্যাপারে চুপ থাকে, তবে ক্ষুদ্র বিষয়ে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে।

অনুরাগ চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে মুখ কুঁচকে বলে উঠলো, মিষ্টিতে গা গুলিয়ে এলো।

নাদীর একটু গম্ভীর গলায় বলল, তুমি তো মিষ্টি খুব পছন্দ করো।

অনুরাগ বলল, তাই বলে এক কেজি চিনি দিয়ে চা বানাবে?

ওপাশ থেকে চা-ওয়ালা প্রতিবাদের স্বরে বলে উঠলো, হাফ চামুচ চিনি দিসি। আমাগো চিনি কেনা লাগে, অতো চিনি যদি একজনরেই দেই তাহলে আর ব্যবসা চাইলাইতে পারতাম না।

তৎক্ষণাৎ অনুরাগ দাম মিটিয়ে প্রায় দৌড়ে বেড়িয়ে এলো চায়ের দোকান থেকে। নাদীর কিছু বুঝার আগেই অনুরাগ দরাজ গলায় বলল, চলো মঞ্চের দিকে যাই। এখানে আর কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবো!

নাদীর পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছে না। আজকে কি অনুরাগ অন্যান্য দিনের তুলনায় অদ্ভুত আচরণ করতে না? সাধারণত দেখা হলে মানুষজন অন্তত ভদ্রতা খাতিরেও ‘কেমন আছেন’ জিজ্ঞেস করে। অনুরাগের হাব ভাব দেখে মনে হচ্ছে সে গভীর কোন চিন্তায় আছে, নাহলে কোন বাজে ঘটনা ঘটেছে। সে দুঃখকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য সুখী সুখী ভাব ধরে। আর সেটা নাদীরের চোখ এড়ায় না। খুব নগ্ন ভাবে তার চোখে ধরা পড়ে।

তারা আলাদাভাবে এগিয়ে যাচ্ছে গণজাগরণ মঞ্চের দিকে। অনুরাগ সামনে, আর নাদীর পিছনে। অনুরাগ একবারও পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখছে না নাদীর আসছে কিনা। নাদীরের তার ‘রাগ’ এর কোন শ্রেণিবিন্যাস করা করতে সক্ষম হয়নি। হয়তো হুট করেই রেগে ফুলে একাকার হয়ে যাবে, আবার হয়তো অনেক বড় কোন ব্যাপারে কোন কথাই মুখ দিয়ে বের হবে না। তবে এখন অবশ্য তার রাগ ধীরে ধীরে জাগতে শুরু করেছে। যেকোনো সময়ে ছিটকে বেড়িয়ে আসবে।

হঠাৎ অনুরাগ পিছন ফিরে ব্যাকুল গলায় বলল, নাদীর তোমার কি কিছু হয়েছে?

নাদীরের জ্বলন্ত রাগে প্রশ্নটি এক পশলা বৃষ্টি ঝড়িয়ে দিল। হয়তো তার মন ব্যাকুলতার সঙ্গে অনুরাগের মনোযোগ কামনা করছিল। নাদীর ঠাণ্ডা গলায় বলল, আমার কিছু হয়নি। তবে এতক্ষণ ভাবছিলাম তোমার বোধহয় কিছু একটা হয়েছে।

অনুরাগ অবাক কণ্ঠে বলল, আমার? আমার আবার কি হবে?

নাদীর বলল, আজকে এই পাঞ্জাবী কি মনে করে?

অনুরাগ মুখ টিপে হেসে বলল, কখনও গায়ে চড়াইনি তাই ভাবলাম আজ পরে আসি।

নাদীর বলল, এতদিন পরলে না যে?

অনুরাগ বলল, মাঝেমধ্যে মানুষকে চমকে দেওয়ার মধ্যে অন্যরকম আনন্দ পাওয়া যায়।

তারা তিন হাত দূরে দাঁড়িয়ে থাকার সত্ত্বেও স্পষ্টভাবে কথাগুলো কানে যাচ্ছে না। এক কথা দুই থেকে তিনবার চিৎকার করে বলতে হচ্ছে। হবেই না কেন? তারা দাঁড়িয়ে আছে হাজারও মানুষের ভিতরে, যারা প্রতিক্ষণে একবার না একবার ধাক্কা দিয়ে সামনে বা পিছনে হেঁটে যাচ্ছে। আর এরই মধ্যে অনুরাগ এবং নাদীর কথাবার্তা চালিয়ে যাচ্ছে।

এক পর্যায়ে অনুরাগ নাদীরের হাত হ্যাঁচকা টান দিয়ে দ্রুত মঞ্চের দিকে এগিয়ে চলল। নাদীর টু শব্দও করলো না। তার হঠাৎ করেই অন্যরকম লাগছে। হুট করে রাগ নেমে যাওয়ার পর সহজেই আবার রাগ উঠে না, তবে অনুভূতিও খানিকটা শুষ্ক হয়ে যায়।

ভিড়ে মধ্যে অনুরাগ হাত ধরে নাদীরকে নিয়ে যাচ্ছে মঞ্চের কাছে। দৃশ্যটি অদ্ভুতে নাটকীয়। অনুরাগের টেনে নিয়ে যাওয়ার মধ্যে রুক্ষতা আছে, তাই নাদীরকে পরোতে পরোতে মানুষজনের কাছে ক্ষমা চাইতে হচ্ছে। হঠাৎ অনুরাগ থেমে গেলো। নাদীর ধাক্কা খেলো এক মাঝবয়সী মহিলার সঙ্গে। মহিলা চোখ ড্যাপ ড্যাপ করে নাদীরের দিকে তাকাতেই সে করুণ গলায় বলল, আমাকে মাফ করবেন। আমি সত্যি দেখিনি।

অনুরাগ পিছন ঘুরে নাদীরের দিকে তাকিয়ে বলল, মাফ চাচ্ছ কার কাছে?

নাদীর আর কথা না বাড়িয়ে অনুরাগের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। যেখানে নড়াচড়ার এক বিন্দু জায়গা নেই সেখানে তারা দুজনে একবার ডানে, আরেকবার বামে যাচ্ছে। তবে যে জায়গায় এখন দাঁড়িয়ে আছে সেখান থেকে নড়বার দরকার নেই।

মশাল হাতে একদল ছেলেমেয়ে লাইন করে দাঁড়িয়ে আছে মঞ্চের সামনে। স্লোগান বিরতিহীন ভাবেই চলেই যাচ্ছে। কারোর বাড়ি ফেরার কোন বিকার নেই। অল্পবয়সী এক মেয়ে মঞ্চে গগনবিদারী চিৎকারের স্বরে পাকিস্তানী অপশক্তি সম্পর্কে মানুষজনকে সাবধান করছে। পাশে কয়েকজন চেয়ারে মলিন চেহারায় ভিড়ের দিকে তাকিয়ে আছে।

নিঃশব্দে কিছু মিনিট দাঁড়িয়ে থাকার পর অনুরাগ আবারও হাঁটতে শুরু করলো। নাদীরের পড়ে যাওয়া রাগ আবার জাগ্রত হল। এই ছেলেটাকে নিয়ে আর পারা গেলো না! মঞ্চ থেকে বেশ দূরে ফুটপাথের উপর কাঠের ছোট্ট টুল দেখতে পেলো অনুরাগ। সে নিজে তো উঠে পড়লই তার সঙ্গে জোর করে নাদীরকেও উঠাল। কাঠের টুল কেঁপে উঠলো। নাদীর কর্কশ গলায় বলল, যথেষ্ট নাটক হয়েছে অনুরাগ। এবার থামো।

অনুরাগ বলল, আমি থেমেই বা কি করবো? সারা দেশ জুড়েই যে পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা শুরু হয়েছে সেখানে আমার এই নাটক অতি নগণ্য।

নাদীর দাঁত কড়মড়িয়ে বলল, আস্তে বোলো।

অনুরাগ বলল, আস্তে বললে ওরা কি আমায় আস্তে মারবে?

নাদীর ভুরূ কুঁচকে বলল, তোমার ছেলেমানুষি সহ্য করতে কষ্ট হচ্ছে।

অনুরাগ বলল, সেই! শুধু ছেলেরাই ছেলেমানুষি করবে, বুড়ারা করলেই দোষ।

নাদীর প্রসঙ্গ পালটাবার জন্য বলল, কেমন লাগছে এই জাগরণ?

অনুরাগ কয়েক সেকেন্ড ভেবে বলল, অনেকগুলো মানুষ একসঙ্গে হয়েছে দেখে খুব ভালো লাগছে। তবে এর আদর্শিক নীতি নিয়ে আমার হাজার প্রশ্ন আছে।

নাদীর কৌতূহলী গলায় বলল, যেমন?

অনুরাগ বলল, একদিনে সব কট্টর নাস্তিক ব্লগারা গলা চেঁচিয়ে সবার চেতনা উদ্ধার করতে নেমেছে ঠিক আবার ওদিকে কট্টর মোল্লারা তাদেরকে ছিঁড়ে ফেলার জন্য ছুরি সাফ করছে।

নাদীর অবাক হয়ে বলল, মানে?

অনুরাগ বলল, কেন শুনোনি? এক ব্লগারকে তো জবাই করেছে। আর তার ধর্ম বিরোধী লেখা সব জায়গায় ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে।

নাদীর তীক্ষ্ণ গলায় বলল, তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে মোল্লাদের প্রতি তোমার নতুন করে ভক্তি জন্মেছে।

অনুরাগ স্বাভাবিক গলায় বলল, মোটেও না। তবে আমি অতি এক্সিট্রিমিস্টদের অপছন্দ করি। সেটা আস্তিকই হোক, আর নাস্তিক।

নাদীর বলল, তা ভালোই বলেছ। তবে সব খুনাখুনি কিন্তু সব আস্তিকরাই করে।

অনুরাগ বিড়বিড় করে বলল, হ্যাঁ। কেউ করে চাপাতি দিয়ে, আর কেউ করে কলম দিয়ে।

নাদীর ফিসফিস করে বলল, আমি কিন্তু তোমার কথা শুনেছি।

অনুরাগ বুক ভরে নিঃশ্বাস নিলো। তারপর আকাশে উড়তে থাকা পতাকার দিকে তাকিয়ে বলল, আমি রাজি।

নাদীর মুখ কুঁচকিয়ে বলল, কি?

অনুরাগ মিষ্টি করে হেসে বলল, চল ম্যাগাজিনটা নামাই।

নাদীরের শরীরে সামান্য শিহরণ দিয়ে উঠলো। কমিউনিটির ম্যাগাজিন করবার কথা সে অনেকদিন ধরেই অনুরাগ বলে আসছিল। একাই সব দায়িত্ব নিয়ে করবার সাহস তার মধ্যে কখনই ছিল না, আর সামনেও হবে না। অনুরাগের মতো সাহসী সে নয়, তবুও ছাপা অক্ষরে নিজেদের কথা প্রতিষ্ঠা করতে কেইবা না চায়?

অনুরাগ বলল, মনে হচ্ছে এই মুভমেন্ট ফ্রেঞ্চ রেভ্যুলেশনের মতো শেষ হবে। চারদিকে খালি ধরপাকড় হবে আর একে একে করে উপরে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

নাদীর বলল, হঠাৎ করে ফেঞ্চ রেভ্যুলেশন টানছো কেন?

অনুরাগ হাসতে হাসতে বলল, কাল রাত লে মিজারেবল দেখলাম। সুন্দর ছবি। লোম দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।

নাদীর তিরস্কার স্বরে বলল, ওটা সুন্দর লাগছে আর এই জাগরণ দেখে পলিটিকাল কারেক্টনেস উপচে পড়ছে।

অনুরাগ কড়া গলায় বলল, তোমার কি সবকিছু নিয়ে সমালোচনা করতেই হবে?

নাদীর বলল, তুমি তো মুভি দেখো না, বইপত্রও পড় না। কি মনে করে লে মিজারেবল দেখলে?

অনুরাগ বলল, সেটার কৈফতও দিতে হবে?

নাদীর বলল, দিতে হবে না তবে টেল অফ টু সিটিস পড়লেও হতো। সেখানে আরও ইন্টারেস্টিংলি ডিকেন্স সাহেব রেভ্যুলেশন তুলে ধরেছেন।

অনুরাগ জিজ্ঞেস করল, তোমার কি মনে হয়? ফ্রেঞ্চের মতো কিছু ঘটবে?

নাদীর নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল, হতেও পারে। এমনও হতে পারে এই শাহবাগ চত্বরে বিশাল বিশাল গিলোটিন বসবে। এখন কারা কার কল্লা নিবে সেটা জানি না। যেহেতু চাপাতি নিতে অভিযান শুরুই হয়েছে সেহেতু বিশেষ কিছু বলার অবকাশ নেই।

অনুরাগ জিজ্ঞেস করল, আর যদি এই গিলোটিনেই কাদের মোল্লার শাস্তি হয়ে যায়?

নাদীর হেসে বলল, তাহলে আমার কল্পনায় ফুলচন্দন পড়বে!

নাদীর এবং অনুরাগ দু’জনই চোখ বন্ধ করে ফেলল। কল্পনায় দেখল মঞ্চের উপর এক বিশাল গিলোটিন। সবাই উল্লাস করছে, বিকট আওয়াজে চিৎকার করছে। দু’জনের হাতই রশি দিয়ে বাধা। এক পর্যায়ে জোরজবরদস্তি করে তাদের মাথা বসানো হল।

নাদীর দেখল অনুরাগের মাথা, আর অনুরাগ দেখল নাদীরের মাথা। এক ইশারায় চারদিকে রক্তাক্ত অবস্থা।

চোখ খুলে দু’জন দুজনের দিকে তাকাল। মেকি হাসি দিয়ে সহজ হবার চেষ্টা করলো।

সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হতে চলল। একসুরে স্লোগান দিয়ে যাচ্ছে। তারা দাঁড়িয়ে আছে পলাশ গাছের নিচে। সবে মাত্র একটি দুটো পাতা আসা শুরু করেছে। তাছাড়া পুরো গাছটিতে কোন সবুজের ছোঁয়া নেই।

অনুরাগ স্পষ্ট গলায় জিজ্ঞেস করল, ম্যাগাজিন বের করার পর আমাদের অবস্থা কি হবে?

নাদীর মাথা উঁচিয়ে ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে গাছটি দিকে তাকিয়ে বলল, বিশাল বিশাল গিলোটিনে মুণ্ডু কাঁটা হবে।

অনুরাগ খানিকটা হেসে বলল, তাতে সবপক্ষই খুশি হবে। সমকামী মারার এই মহা দৃশ্য সব টিকেট কেটে দেখতে আসবে।

নাদীর মুখ শক্ত করে বলল, অনুরাগ! ম্যাগাজিন বের করা চাট্টিখানি কথা না। আর বিশেষ করে…

অনুরাগ বলল, বিশেষ করে কি?

নাদীর মাথা নামিয়ে অনুরাগের দিকে চোখমুখ শক্ত করে বলল, তোমার কি মনে হয় এই পরিস্থিতি কি বদলাবে? উহু। আরও প্রকট হবে। কাটাকাটি তো সবে শুরু হল। দেখো সামনে কি হয়।

অনুরাগ নিঃশ্বাস ফেলে বলল, ভয় মানুষকে সারাজীবন তাড়িয়ে বেড়ায়।

নাদীর বলল, ভয়কে জয় করার কথা অনেকেই বলে বেড়ায়। তবে ভয়কে জয় করা আর ভয়কে বশ করার মধ্যে পার্থক্য বিশাল আছে।

অনুরাগ ইতস্তত গলায় জিজ্ঞেস করলো, তুমি কি এডিটর হতে চাও?

নাদীর স্পষ্ট গলায় বলল, জানি না।

দু’জন তাকিয়ে আছে ভিড়ের হাজারও মশালের দিকে। ব্লগার হত্যার পর মানুষজন আরও বেড়ে গিয়েছে। তাদের রাগ আরও ফুলেছে। মশালের আগুনে চারদিকে হলুদ আর লালের সংম্রিশণের এক অদ্ভুত রঙ তৈরি হয়েছে। রঙটি খপ করে তিমির খেয়ে ফেলার সুযোগ খুঁজছে।

মনে হচ্ছে, মশালগুলো আগুনের লেলিহান শিখার জৌলুসে চিৎকার করে বলছে, ‘ক’ তে কাদের মোল্লা – তুই রাজাকার, তুই রাজাকার!

তবে নাদীরের কানে বাজচ্ছে,

‘স’ তে সমকামী –

তুই জানোয়ার! তুই জানোয়ার!

মুণ্ডু চাই! মুণ্ডু চাই!