স্বদেশ

এয়ারপোর্ট এর লাউঞ্জে বসে আছে রনি।তার খুব বিরক্ত লাগছে। ডিসপ্লে তে দেখা যাচ্ছে নিউইয়র্ক থেকে আসা কাতার এয়ারওয়েজের প্লেন ল্যান্ড করেছে। তাও প্রায় এক ঘণ্টা হয়ে এলো। এই ফ্লাইটে সানি এসেছে। তার জন্যই অপেক্ষা। কিন্তু সানির দেখা নাই।

আজকে সানির সাথে প্রথম দেখা হবে। সানি তার চ্যাট ফ্রেন্ড। একটি সমকামী যোগাযোগ সাইটে তার সাথে পরিচয়। সানি বাঙালি। কিন্তু জন্ম হয়েছে নিউইয়র্কে এবং সেখানেই বড় হয়েছে। তার বাবা মা নিউইয়র্কে থাকেন। ছোটবেলায় একবার বাংলাদেশে এসেছিলো। এটা দ্বিতীয়বারের মত আসা। এইবার নাকি আসছে বাংলাদেশ কে দেখতে ,মনে প্রাণে অনুভব করতে। রনি মনে মনে হাসে আমেরিকা থেকে এসে বাংলাদেশে কি দেখবে? আর অনুভব করা? যতসব ফালতু ব্যাপার।

সানি আমেরিকাতে হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা দিয়েছে। এখন ছুটি। আর এদিকে এখানে  রনি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে। এখন সেমিস্টার ফাইনালের পরে ছুটি চলছে। রনি এখানে বন্ধু দের সাথে একটি ফ্ল্যাটে থাকে। সানি হোটেলে উঠতে চেয়েছিল।কিন্তু রনি জোর করলো তার ফ্ল্যাটে উঠার জন্য। শেষ পর্যন্ত সানি রনির ফ্ল্যাটে উঠতে রাজি হয়েছে । আর এখন রনির বন্ধু রা কেউ তো ঢাকায় নাই। ছুটিতে বাড়ি গিয়েছে। ফ্ল্যাট পুরো খালি।

এয়ারপোর্টে প্রিয়জন রা সবাই অপেক্ষা করছে তাদের আপন জনের জন্য। এয়ারপোর্টে এই একটা মজার দৃশ্য দেখা যায়। যখন একজন মানুষ তার আত্মীয় বা বন্ধু কে অনেক দিন পর দেখতে পায়, কাছে পায় তখন যে খুশি , আনন্দ তাদের চোখে মুখে দেখা যায় তা দেখার মত।রনি বসে বসে তাই দেখছে।

ধীরে ধীরে সব প্যাসেঞ্জার , পাইলট , এয়ার হস্টেস, কেবিন ক্রু রা বের হয়ে আসলো। অথচ সানির দেখা নেই। ওর কোন বিপদ হল না তো ?

খুব চিন্তা হচ্ছে রনির। কিন্তু এইবার সে দেখতে পেলো সানি কে। আরে আসছে তো। হলুদ টিশার্ট , কালো জিন্স পরে। হাতে একটা ট্রলি সুটকেস। সানি  কে খুব আপনজন মনে হচ্ছে রনির কাছে।রনির খুব খুশি লাগছে।এতো দিনের পরিচয় অথচ কত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে সানি কে সামনাসামনি দেখার জন্য। দৌড়ে আসলো রনি সানির কাছে।

চিনতে পারছো ?

সানি হাসলো

পারবো না কেন? আমি তোমাকে স্কাইপি তে দেখেছি। আমি এতো ইডিয়ট না রনি।

রনি হেসে দিয়ে হাগ করলো সানি কে।


রনি গাড়ি চালাচ্ছে। পাশে সানি। রনির নিজের গাড়ি। সেকেন্ডহ্যান্ড । কিন্তু রনির কাছে এটা যেন তার প্রাণ ভোমরা। খুব যত্ন করে গাড়ি টা কে। রেডিও ছাড়লো রনি। এফ এম রেডিও। একটা হিন্দি গান হচ্ছে।সানি খুব অবাক হয়ে রনির দিকে তাকিয়ে বললো

বাংলাদেশের রেডিও তে হিন্দি  গান কেন? বাংলা গান কোথায় ?

আমাদের রেডিও তে হিন্দি বাংলা ইংরেজি সব গান হয়।

না না আমি বাংলা গান শুনবো । প্লিজ বাংলা গান ছাড়ো

কিন্তু আমার কাছে তো বাংলা গানের সিডি নেই।

সানির মন যেন কেমন খারাপ হয়ে গেলো। রনি আর কথা বাড়ালো না। মনে মনে ভাবছে বাংলাদেশে ঢুকতেই বাঙালি-পনা দেখাচ্ছে। এসব আদিখ্যেতা  তার খুব বিরক্ত লাগে। এইতো দশদিন পনেরো দিন বাংলাদেশে থেকে আমেরিকা ফিরে গেলেই সব ভুলে যাবে আবার।

হটাত করে সানি চিৎকার করে উঠলো

থামাও থামাও

কি ব্যাপার?

আরে একটা সিডির দোকান। এখানে নিশ্চয়ই বাংলা গানের সিডি পাওয়া যাবে।

রনি গাড়ি থামালো

কি গান শুনবা বল। আমি নিয়ে আসি

দেশের গান আনবে।

রনি ৩ টা সিডি নিয়ে ফিরলো। গান ছাড়লো

শাহনাজ রহমতুল্লাহ গাইছেন

একবার যেতে দেয় না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয় ……………

ধানমন্ডি তে রনির ফ্ল্যাট। ৩ তলায়। খুব ছিমছাম করে সাজানো। দেখলে মনেই হয় না ব্যাচেলর দের বাসা। সানি ফ্ল্যাটে ঢুকেই প্রথমেই বাথরুম খুঁজে বের করলো। গোসল করবে। বুঝাই যায় শুচিবায়ুগ্রস্ত।

রনি গিয়ে ঢুকলো কিচেনে। বুয়া রান্না করে রেখেছে। রনির প্রচণ্ড রাগ লাগলো।এগুলো তো সানি খেতে পারবে না।বাইরে থাকে। এতো স্পাইসি খাবার নিশ্চয়ই সে খায় না।তাদের বাইরেই লাঞ্চ করতে হবে। বুয়া কে পই পই করে কালকে বলে দিয়েছে রান্না না করতে।কিন্তু করলো। এতো গুলো খাবার কে খাবে?সানির গোসল শেষ বের হয়ে রনি কে খুঁজতে  কিচেনে ঢুকলো। খাবার দেখে তো সানি মহা খুশি

বাহ সব রান্না করা আছে। আমার তো খুব ক্ষুধা লেগেছে। চল খেতে বসি।

আরে এসব খেতে পারবে না। প্রচণ্ড ঝাল। চল বাইরে থেকে পিঁজা খেয়ে আসি

বাংলাদেশে এসে বাঙালি খাবার না খেয়ে পিঁজা খাব?

আচ্ছা আমি নিজে নাহয় কালকে একদম কম ঝাল দিয়ে রান্না করবো। তখন খেয়ো।

আরে আমি এই খাবার খেতে পারবো

আরে জিদ করছো কেন? তুমি পারবা না খেতে

আরে দেখ পারি কিনা

রনি অল্পতেই রেগে যায়। এখনো তাই হল। তার মনে হচ্ছে একদিনের জন্য বাঙালি হওয়ার জন্য সানি আদিখ্যেতা করছে।

সানি তোমাকে একটা কথা বলি ।অন্যভাবে নিও না।একদিন বাংলা গান শুনে আর বাঙালি খাবার খেলেই বাঙালি হওয়া যায় না।

সানি চুপ হয়ে গেলো । কিছু বলছে না।পিন পতন নীরবতা । এইবার সানি মুখ খুলল

রনি কথা গুলো আমি বলতে চাই নাই। কিন্তু মনে হচ্ছে বলা উচিৎ । বাংলা গান আমি ছোট বেলা থেকেই শুনি। আমার মা বাংলা গান গায়। এমন কি আমি নিউইয়র্কে বাংলা উৎসবে গানও গেয়েছি। আর খাবারের কথা যদি বল আমি তোমাকে বাঙালি খাবার রান্না করে খাওয়াবো বেশি করে ঝাল দিয়ে। আশা করি তুমি আমার কথায় কিছু মনে কর নি।

রনি আর কি বলবে। কথা খুঁজে পাচ্ছে না। সে বলল

আমি সরি। আমি আসলে তোমার ভাল ভেবেই বলেছিলাম। আমি তো জানতাম না যে তুমি আমেরিকায় বড় হয়েও এতো কিছু পারো

ইটজ ওকে । চল খেতে বসি।

দুপুরের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি বিকেলেই স্বাভাবিক হয়ে গেলো । সানি খুব মিশুক ছেলে। রনি কে একদম স্বাভাবিক করে ফেললো । টিভি দেখছে ২ জন মিলে। রনি বলল

আর যাই বল এখন বাংলা সিনেমা দেখবা এই কথা বল না

কি বল! দেখবো তো হলে যেয়ে । আমি খোঁজ নিয়ে এসেছি।  মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা।

মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা কেন হটাত ?

কারন আছে। পরে বলবো ।আচ্ছা শুনো তুমি টিভি দেখো ।আমি একটু আমার ঘর থেকে আসছি

সানি নিজের ঘরে এসে সুটকেস খুলে কিছু গিফট বের করলো। রনির জন্য এনেছে।গিফটগুলো নিয়ে বসার ঘরে এসে রনির হাতে তুলে দিলো

তোমার জন্য কিছু জিনিস এনেছি। দেখো পছন্দ হয় নাকি। তাড়াহুড়ো করে কিনেছি তো ।

একটি পারফিউম, বড় ডায়ালের ঘড়ি , একটা সানগ্লাস আর এক বাক্স চকলেট ।

রনি উপহার পেয়ে খুব খুশি

এতো কিছু কেন এনেছ? বাহ পারফিউমের গন্ধ টা জোস। আর

সানগ্লাসের কালার টা খুব সুন্দর। থ্যাংকস। অনেক অনেক থ্যাংকস

তাহলে এখন আমাদের প্ল্যান কি কালকে?

চল বসি প্ল্যান নিয়ে।

রনি একটি কাগজ আর কলম নিয়ে আসলো।

বল কোথায় কোথায় যাবা? আমি লিখি।

ঢাকা পুরোটা ঘুরবো। আমাদের গ্রাম সরিষা-পুর আর সময় পেলে কক্সেসবাজার।

এই? বান্দরবন, সিলেট দেখবা না? সুন্দরবন?

এইবার না। আরেকবার এসে দেখবো ।

ওকে তোমার যা ইচ্ছা।কালকে থেকে ঢাকা ঘুরতে বের হব।

খুব সকাল সকাল উঠলো সানি। উঠেই গোসল করলো। কিন্তু রনি তখনো ঘুমিয়ে। সানি ঠেলা মেরে রনির ঘুম ভাঙ্গালও।উঠে কোন মতে হাত মুখ ধুলো। সানি এদিকে ব্রেকফাস্ট রেডি করছে। নাস্তা করে বের হতে হতে ১০ টা বেজে গেলো। সানি বলল রিকশা, সিএনজি তে ঘুরবে। গাড়িতে না। রনি বাধ্য হয়ে গাড়ি নিলো না।

প্রথমেই যাবে শপিং এ । মায়ের জন্য শাড়ি কিনবে। রিকশা করে লালমাটিয়া আড়ঙে গেলো ২ জনে।প্রচণ্ড রৌদ্রোজ্জ্বল দিন।  ২ জনে খুব ঘেঁষা ঘেঁষি করে বসছে। কেন জানি ২ জনই ২ জনের উষ্ণতা নিতে চাইছে।আড়ঙে এসে নীল সুতির একটি শাড়ি পছন্দ করলো সানি। তারপর বাবার জন্য কিনলো একটি সাদা পাঞ্জাবি।কেনাকাটা শেষ

চল যাই

আর কিছু কিনবে না?

না

স্পেশাল কারো জন্য?

এমন কেউ নেই আমার। চল তো। অনেক ঘুরতে হবে। সময় নেই।

রনির কথাটা শুনে কেন জানি খুব ভাল লাগলো। এই প্রশ্ন  টা বুকে নিয়ে কতদিন যাবত বয়ে বেড়াচ্ছে । আজকে জিজ্ঞেস করেই ফেললো। বুক টা কেমন হালকা লাগছে। আচ্ছা এমন কেন লাগছে ? সে কি তাহলে সানির প্রেম পরে গেলো ?

 

ধানমন্ডির রাস্তা ধরে হাঁটছে ২ জন। লেকের পাশে। হটাত সানির চোখে পড়লো রাস্তার ধারে একজন আইসক্রিমওয়ালা আইসক্রিম বিক্রি করছে।

আমি আইসক্রিম খাবো।

রনি ২ টা ললি আইসক্রিম নিলো । একটা লেমন আরেকটা অরেঞ্জ।

সানি কিছুক্ষণ খাওয়ার পর বললো

এই তোমার আইসক্রিমে একটি কামড় দেই?

উহু আইসক্রিম আমি শেয়ার করি না।

সানি কপট রাগ দেখালো

লাগবে না

আহা রাগ কর কেন বাবু। চল একটা সিদ্ধান্তে আসি। আমি তোমার অরেঞ্জ আইসক্রিমে একটা কামড় দিবো আর তুমি আমার সবুজ আইসক্রিমে।

ধানমণ্ডি লেকের ব্রিজে দাঁড়িয়ে আছে তারা।আকাশটা অন্ধকার হয়ে এসেছে। বৃষ্টি হবে। সবাই দৌড়ে কোন ছাউনির নিচে আশ্রয় নিচ্ছে। রনি  সানির হাত ধরে বলল

চল

কোথায় ?

আরে বৃষ্টি নামবে । ভিজে যাবো তো ।

না আমি যাবো না। বৃষ্টিতে ভিজবো । শুনেছি বাংলাদেশের বৃষ্টির মত সুন্দর বৃষ্টি আর কোথাও হয় না। বৃষ্টি তে না ভিজে আমি কোথাও যাবো না।

ঠাণ্ডা লাগবে।

লাগুক

তুমি ভিজো। আমি নাই।

বলতে না বলতেই ঝুম বৃষ্টি নামলো। রনি সানির হাত ছেড়ে দিয়ে ব্রিজ থেকে নেমে একটি ছাউনির নিচে যেয়ে দাঁড়ালো। সানি কেমন আড়চোখে রনি কে দেখলো। তারপর নিজের মনে ভিজতে লাগলো। সানি দুই হাত মেলে আকাশের দিকে মুখ রেখে চোখ বন্ধ করলো আর টপ টপ করে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে মুখে।কি চমৎকার সেই অনুভূতি ।সানি মনে মনে একটা দৃশ্য কল্পনা করছে। কেউ এসে তার ঘাড়ে গভীর ভালবাসায় হাত রাখবে। কি আশ্চর্য সত্যি কেউ তার ঘাড়ে হাত রেখেছে। চোখ খুলে পিছনে তাকালো। রনি তার ঘাড় স্পর্শ করেছে।রনির চোখে কি দেখল সে? চোখ দুটি তো ভালবাসার গভীরতায় আদ্র হয়ে রয়েছে।

তুমি?তুমি না ভিজবে না ? তোমার ঠাণ্ডা লেগে যাবে?

আহা তোমাকে রেখে আমি কি করে থাকি বল?

সানির হটাত কেন জানি খুব ভাল লাগছে। রনির স্পর্শ ভাল লাগছে , রনির কথা ভাল লাগছে। এই বৃষ্টি ভাল লাগছে। এই দেশ ভাল লাগছে।সব।

 

পরের গন্তব্য সিনেমা দেখা। বসুন্ধরা সিটির স্টার সিনেপ্লেক্সে। গেরিলা মুভি টা চলছে। সেটাই দেখবে সানি। ১ প্যাকেট পপ-করন  আর ২  টা কোল্ড ড্রিঙ্কস নিয়ে হলে ঢুকলো তারা। সানি উত্তেজিত। গেরিলা মুভি টা নাকি খুব ভাল। সে রিভিউ পড়েছে। অপরদিকে রনির খুব একটা ভাল লাগছে না। বাংলা সিনেমা সে একদম দেখে না। হোক সেটা যুদ্ধের। কেমন জানি ঘুম পাচ্ছে। ভাবলো মুভি দেখার পুরোটা সময় ঘুমোবে। একগাদা বিজ্ঞাপন হচ্ছে।জাতীয় সঙ্গীত শুরু হল। সবাই দাঁড়ালো। রনির ঘুম ঘুম লাগছে। দাঁড়াতে ইচ্ছা করছে না তার। বসেই রইলো ।সানি আড়চোখে দেখলো ব্যাপারটা। কিন্তু কিছু বললো না। এরপর পুরো সিনেমা দেখার সময় আর একটা কথাও বললো না সে। সিনেমাটা আসলেই ভাল। রনি ভেবেছিল ঘুমাবে। সেও দেখলো শেষ পর্যন্ত ।হল থেকে বের হওয়ার পর থেকে সানি কেমন চুপচাপ হয়ে গেলো। কেন জানি একদম কথা বলছে না

কই যাবা এখন?

বাসা

এত দ্রুত? কেন? এখনো তো কতকিছু দেখা বাকি।

আর দেখবো না।

কেন?

ইচ্ছে করছে না

ওকে চল বাড়ি যাই

সিএনজি নিলো তারা । সিএনজি তেও  সানি একদম চুপ। রনি ভাবছে নিশ্চয়ই কিছু হয়েছে। তা নাহলে এমন করার কথা না সানির। বাসায় যেয়ে ভাল মত চেপে ধরতে হবে। কি হয়েছে বের করতে হবে

বাড়ি এসে সানি টিভির রিমোট নিয়ে বসে আছে। চ্যানেল চেঞ্জ করছে। কোন কথা বলছে না।

এই কি হয়েছে তোমার।

আমার মনে হয় এখন কথাটা বলা উচিৎ। শুধু শুধু চেপে রেখে লাভ নাই। আমি তোমার একটি কাজে খুব বিরক্ত। আমার ভাল লাগছে না।

কি কাজ?

জাতীয় সঙ্গীত বাজলে যে দাড়াতে হয় তা জানো না?আজকে সিনেমায় তুমি বসেছিলে। আমি এতে খুব কষ্ট পেয়েছি। আমার এতো ভাল বন্ধু কিন্তু তার দেশের প্রতি ভালবাসা এত কম! এটা মানতে পারছি না।

রনির খুব রাগ হল

২ দিন বাংলাদেশে এসে দেশের প্রতি ভালবাসা দেখাচ্ছো ? আমরা এই দেশে থাকি। এই দেশের জন্য কাজ করি। কিন্তু তুমি তো থাকো আমেরিকা। ২ দিনের জন্য বেরাতে এসেছো। নিজেকে খুব বাঙালি ভাবছো তাই না? দুই দিনের বৈরাগী ভাতেরে কয় অন্ন। বাংলাদেশের আসল রূপ গ্রামে। সেখানে অনেক জায়গায় এখনো বিদ্যুৎ যায় নাই পর্যন্ত। সেখানে থাকতে পারবা? যদি পারো তারপর দেশের প্রতি ভালবাসার কথা বল

তুমি বোধ হয় জানো না যে আমরা যারা বাইরে থেকে যে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করি তার একটি পারসেন্টিজ কিন্তু দেশে আসে। যাই হোক তা তুমি বুঝবা না। বরং এখন এমন একটা কথা বলবো যেটা শোনার পর তুমি আমাকে এই ব্লেম আর দিতে পারবা না।

কি?

বলছি। আগে  ২ কাপ চা নিয়ে আসি।

চা খেতে খেতে বলতে লাগলো সানি

এইবার দেশে শুধু মাত্র বেরাতে আমি আসি নাই। একটা উদ্দেশ্য রয়েছে

কি উদ্দেশ্য ?

বলছি। তার আগে আমি তোমাকে একটি কাহিনী শোনাবো আমার বাবার কাহিনী। আমার বাবার নাম শিপন।

সরিষাপুর। ময়মনসিংহ জেলার একটি গ্রাম। অপরূপ সুন্দর গ্রাম। গ্রামের পাশে নদী। আর আছে মাঠের পর মাঠ সরিষা ক্ষেত। শীত কালে হলুদ চাদর বিছানো থাকে যেন এই গ্রামে। সরিষাপুরেই শিপন দের বাড়ি।

শিপন দের পরিবারটি যৌথ পরিবার। বাবা, চাচা, চাচি, চাচাতো ভাই , দাদি আর দাদা কে নিয়ে তার সংসার। চাচাতো ভাই আকাশ আর শিপন একই ঘরে থাকে। তাদের ২ জনের মাঝে অনেক ভাব। আকাশ ভাই অন্ত প্রাণ। আর শিপনও আকাশ ছাড়া কিছু বুঝে না। শিপন পড়ে গ্রামের স্কুলের ক্লাস টেনে আর  আকাশ বরিশাল মেডিকেল কলেজে।আকাশ কে নিয়ে পরিবারের অনেক স্বপ্ন। এই পরিবার থেকে সেই প্রথম ডাক্তার হচ্ছে। দাদা আফসার সাহেব গ্রামের মাতবর। গ্রামের মানুষ জন অনেক সম্মান করে তাকে। সহায় সম্পদও তার কম না।অত্যন্ত রক্ষণশীল মানুষ তিনি। শিপনের মা বেঁচে নেই। চাচি রুনার কাছেই শিপন মানুষ । রুনা কক্ষনোই আকাশের থেকে শিপন কে আলাদা করে দেখেন নাই। আকাশ তার কাছে তার বড় ছেলে আর শিপন ছোট ছেলে।

মুক্তিযুদ্ধের সময়। জুন মাস। সরিষাপুর গ্রামে তখনো মিলিটারি আসে নাই।  আফসার সাহেব মনে করেন মুক্তিযুদ্ধ ভারতের একটি ষড়যন্ত্র। পাকিস্তান ভাঙার জন্য এই ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। আর ষড়যন্ত্র থামাতে গিয়ে মিলিটারি একটু কঠোর হয়েছে। হায় রে বাঙালি। হুজুগে জাত। গুজব শুনে হই হই শুরু করলো। কোথায় মানুষ মরেছে? মরে নাই। এসব সব গুজব।

প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাড়িতে আড্ডা বসে। গ্রামের হেডমাস্টার আনিস সাহেব আর বড় ব্যবসায়ী আজমল সাহেব এই আড্ডায় যোগ দেন। তারাও মনে প্রাণে পাকিস্তানি। ভাবেন মুক্তিযুদ্ধ বলে কিছু হচ্ছে না। তাদের মতে এগুলো বিচ্ছিন্নবাদি কিছু সন্ত্রাসীর কাজকর্ম। আর ভারত তাদের ইন্ধন যোগায়।

আফসার সাহেবের মনে একটা ইচ্ছা এই গ্রামে রাজাকার বাহিনী গঠন করবেন। তিনি হবেন প্রধান। এইভাবে দেশের সেবা করবেন তিনি। কিন্তু এই স্বপ্নের কথা তিনি কাউকে বলেন নাই।

এদিকে আকাশ এমন ভাবে না। সে সব কিছু সম্পর্কে খুব ভাল মত জেনেছে। রেডিও শুনে সে নিয়মিত। ২৫ মার্চে ঢাকায় কি হয়েছে তা সে জানে।হাজার হাজার মানুষ মানুষ মারা গিয়েছে সেই রাতে তা জানে।সারা দেশে এখন কি চলছে তাও বুঝে।কিন্তু দাদাজানের মুখের উপর কথা বলার সাহস তার নেই। আবার মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ারও  সাহস পায় না। কেমন অপরাধবোধে ভুগে সারাক্ষণ । সঙ্গী বলতে শিপন। কিন্তু তাকে সব কথা বলতে ইচ্ছা করে না। ছোট মানুষ ভয় পাবে।

আকাশ ভাবে তার বন্ধুদের অনেকেই হয়তো মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছে। সে তো তা জানেনা।কিন্তু আন্দাজ করতে পারে। এই গ্রামেরও সোহেল ভাই বলছিলেন মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার কথা।আকাশ অনেক ভিতু। ভাবে বন্ধুকই তো চালাতে পারে না। মুক্তিযুদ্ধে যেয়ে কি করবে? সোহেল ভাই বলেছেন ভারতে ট্রেনিং দেয়া হবে। ওখান থেকে ট্রেনিং নিয়ে তো সকলে যুদ্ধ করছে। তাও আকাশের ভয় লাগে। সে কক্ষনোই কাউকে মারে নাই। মারবে কি ঝগড়াই তো করে নাই কারো সাথে। সে অনেক নরম মনের। রক্ত দেখলে ভয় পায়। কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনীর অত্যাচারের কথা সে শুনেছে।সবচেয়ে কষ্টের হল মেয়েদের উপর অত্যাচার। এসব শুনলে প্রতিশোধ নিতে ইচ্ছা করে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই তার আবার মনে হয় তার দ্বারা যুদ্ধ হবে না।

 

বর্ষাকাল ঝুম বৃষ্টি পরছে। আক্কাস , বাড়ির কাজের লোক আফসার সাহেব কে এসে খবর দিল

হুজুর মিলিটারি তো আয়া পরসে।

আফসার সাহেব চোখ বন্ধ করে হুক্কা টানছিলেন। আচমকা এই কথা শুনে তিনি বুকে যেন একটা ধাক্কা খেলেন

কি কইলি

হুজুর মিলিটারি গ্রামে আইয়া পরসে। বাজারে আস্তানা গারসে।

কখন?

এইতো ঘণ্টা তিনেক হইবো

আফসার সাহেব কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে ভাবলেন। মিলিটারি পাশের গ্রামে এসেছে শুনেছেন। কিন্তু এতো তাড়াতাড়ি সরিষাপুর চলে আসবে তিনি ভাবেন নাই।তার এই সুযোগ। তিনি সবার প্রথমে মেজর সাহেবের সাথে দেখা করবেন। তারপর শান্তি কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিবেন। নিশ্চই মেজর সাহেব তাকেই প্রধান করবেন। যা ভাবা তাই কাজ।আফসার সাহেবে দ্রুত ঘরে গিয়ে পোশাক পালটে একটা ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি পরলেন। আতর লাগালেন। তিনি যে গ্রামের মাতবর। সবার মাথা তা তো বুঝাতে হবে। তা না হলে তো আদর যত্ন পাবেন না। তাই এত সাজগোজ।

গ্রামের রাস্তা। বৃষ্টি পরে কাঁদা হয়ে আছে। হাঁটতে অসুবিধা হচ্ছে আফসার সাহেবের।পরিষ্কার লুঙ্গি টায় কাঁদা লেগেছে। তাও দ্রুত হাঁটছেন। পথে দেখা গ্রামের আরেক বৃদ্ধ আখতার সাহেবের সাথে। তার বন্ধু মানুষ

কোথায় যাও আফসার?

আরে মিলিটারি চলে আসছে শুনো নাই। দেখা করতে যাই।আমাকেই তো যেতে হবে।

হেড মাস্টার তো তোমার আগে দেখা করে আসলো । দেখলাম ক্যাম্প থেকে বাড়ি যাচ্ছে

এই কথা আফসার সাহেবের মুখ অন্ধকার হয়ে গেলো। খুব হিংসা লাগছে।তিনি প্রথম হতে পারলেন না। ঈশ আরেকটু আগে কেন খবর পেলেন না। যাই হোক তিনি মেজর সাহেব কে দুপুরে খানা খাওয়ার দাওয়াত করে আনবেন। হেডমাস্টারের এত সামর্থ্য নাই। এই ভেবে খুশি হলেন তিনি।

আচ্ছা সাবধানে যাও। মিলিটারি ভয়ানক। হেড মাস্টার কে  দেখলাম মুখ অন্ধকার করে বাসায় ফিরেছে। কি হয়েছে কিছুই বলল না আমাকে।

আরে আমি কি হেডমাস্টার নাকি। আমি গ্রামের মাতবর। গ্রামের মাথা। আমাকে কি সম্মান দিবে না?

মিলিটারি সবাই কে একই রকম ভাবে।

আফসার সাহেব আর কথা না বাড়িয়ে ক্যাম্পের দিকে চললেন। মনে মনে বলছেন আমাকে দাম দিবে না আবার। আমি গ্রামের মাতবর।

ক্যাম্পের চারপাশে মিলিটারি অস্ত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আফসার সাহেবের কেমন ভয় লাগলো। তিনি যা ভেবেছিলেন তার কিছুই হল না। তাকে মিলিটারি রা নানানভাবে অপদস্থ করলো। পারলে লুঙ্গি খুলে পরীক্ষা করে। বড় চাপ দাড়ি আর বৃদ্ধ মানুষ দেখে ছেড়ে দিলো। মেজর সাহেবের তাঁবুর বাইরে গরমে রোদে দেড় ঘণ্টা দাড়িয়ে থাকলেন তিনি।কিন্তু তাঁবুতে ঢুকার অনুমতি পেলেন না। ভেবেছিলেন তিনি গ্রামের মাতবর। মিলিটারি রা গেলেই আদর আপ্যায়ন করে মেজর সাহেবের সাথে দেখা করায় দিবে। কিন্তু তা  হল না বরং তাঁবু তে ঢুকে আরেক দফা অপদস্থ হলেন।

মেজরের বয়স খুব কম। নাম গালিব। বেশি হলে ২৭-২৮। আকাশের চেয়ে কিছু বড়। মেজর এর পাশে একটা চেয়ার খালি থাকা সত্ত্বেও তিনি আফসার সাহেব কে বসতে বললেন না।দাড় করিয়ে রাখলেন বরং উর্দু তে কেন এসেছেন তা খুব বিশ্রী ভাবে জিজ্ঞেস করলো। আফসার সাহেব  ভাঙ্গা ভাঙ্গা উর্দুতে তাকে দুপুরে খানা খাওয়ার দাওয়াত দিলেন। এইবার মেজরের মুখে হাসি ফুটলো । মেজর  আফসার সাহেবের ঘাড় চাপড়ে দাওয়াত গ্রহণ করলো।

বাড়ি যাওয়ার পথে আফসার সাহেবের খুব ক্লান্ত লাগছিলো। ক্যাম্পে এই ব্যবহার পাবেন তা তিনি আশা করেন নাই। নাতির বয়সী একটি ছেলে তাকে দাড় করায় রাখবে তা অভাবনীয়। তিনি এই গ্রামের সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি। কক্ষনোই এমন ব্যবহার কারো কাছে পান নাই। এর থেকে অনেক বড় বড় মানুষ তার বাড়িতে এসেছেন। কই তারা কক্ষনোই তো এমন করে নাই। তার খুব অপমান লাগছে। অপমানে চোখে পানি এসে গিয়েছে।যাওয়ার পথে হেডমাস্টারের বাড়ি হয়ে যাবেন। তাকে দাওয়াত দিবেন দুপুরে খাওয়ার

কিন্তু হেডমাস্টার ঘুমচ্ছেন। তার ছেলে বলল

চাচা আব্বু ক্যাম্প থেকে ফিরে খুব মন খারাপ করে ছিলেন। কিছুই আমাদের বলেন নাই। এখন ঘুমচ্ছেন।ডাকবো ?

আফসার সাহেব মনে মনে ভাবলেন মন খারাপ করারই কথা। এমন অপমান নিশ্চয়ই হেডমাস্টার কেও করেছে।

আচ্ছা ডাকার দরকার নেই। শুধু বল দুপুরে আমার বাসায় দাওয়াত।মেজর গালিব কেও দাওয়াত করেছি।

ছেলেটি বলল একটা কথা বলি চাচা? বেয়াদবি মাফ করবেন

বল বেটা

চাচা মিলিটারি কে কি বাসায় ঢুকানো ঠিক হচ্ছে?

এই কথা টা শুনে আফসার সাহেবের মাথাটা কেমন চক্কর দিলো। এইভাবে তো কক্ষনোই ভেবে দেখেন নাই। তিনি বাড়ি ফিরলেন অসুস্থ হয়ে। বুকে ব্যথা শুরু হয়েছে।

এই অবস্থায় বাড়ি ফিরেই আফসার সাহেব বিশাল আয়োজন করলেন খাওয়া  দাওয়ার। ২ টা গরু জবেহ করলেন। রুনা আফসার সাহেবের অবস্থা দেখে বললেন

বাবা আপনি বরং একটু ঘুমান। আমি দেখছি সব। আপনাকে খুব অসুস্থ লাগছে।

তুমি পারবে?

পারবো কেন বাবা?

আফসার সাহেব রুনা কে খুব পছন্দ করেন। একদম আপন মেয়ের মত।বড় ছেলে জয়নাল হয়েছে কুলাঙ্গার । এই ছেলের জন্য রুনার মত ভাল বউ পেয়েছেন তা হল আল্লাহর অশেষ রহমত।

তিনি রুনার কথা মত বিছানায় যেয়ে একটু শুলেন।ভাবছেন শান্তি বাহিনী  করার দরকার নাই। মিলিটারি তার মত থাকুক। তিনি তার মত। আজকের খানা খাওয়ার ঝামেলা শেষ হোক

আকাশের মন খুব খারাপ। পাকিস্তানি মিলিটারি বাঙালী দের উপর এতো অত্যাচার করছে অথচ তাদের কে দাদাজান ডেকে এনে খাওয়াচ্ছে। বাড়ির কেউ বুঝতে পারছে না যে এটা কত বড় অন্যায় হচ্ছে। কিন্তু প্রতিবাদ করার মত সাহস  তার নেই। নিজেকে তার খুব অসহায় লাগছে। কেন সে এইরকম হল? এতো দুর্বল এত নরম?

দুপুরে মেজর সাহেব বেশ কিছু মিলিটারি নিয়ে খেতে আসলো। তৃপ্তি করে খেলো সবাই। রান্না খুব ভাল হয়েছে।গ্রামের কিছু গণ্য মান্য ব্যক্তিও এসেছেন। এইবার মেজর গালিব উর্দুতে জানতে চাইলো

খাবার কে রান্না করেছে?

আফসার সাহেব তো বেশ খুশি। খাওয়া পছন্দ করেছে মেজর। তাহলে নিশ্চয়ই আর কোন ঝামেলা করবে না।

স্যার আমার পুত্রবধূ

তোমার পুত্রবধূ কে ডাকো। যে এত ভাল খাবার পাক করে সে না জানি কত সুন্দর।

এইবার তো নুরুল সাহেব ভয় পেলেন

স্যার আমাদের বাড়ির বউ রা পরপুরুষের সামনে আসে না

পিছন দিক থেকে হেড মাস্টার কানে কানে বললেন

একি বলছেন? একদম গুলি করে ফেলবে আমাদের সবাইকে। ডাকেন আপনার পুত্রবধূ কে। কে বলেছিল মিলিটারি কে বাসায় ঢুকাতে ।ভাগ্য ভাল থাকলে কিছু হবে না। ডাকেন রুনা কে।

আফসার সাহেব ভয়  পেলেন।আল্লাহর নাম নিচ্ছেন।

তা কিভাবে হয়? রুনা আমার মেয়ের চেয়েও আদরের।

হেড মাস্টার বললেন

না ডাকলে নিজেরাই রুনা কে ধরে নিয়ে আসবে। আর আমরা সবাই মরবো। আপনি ডাকেন বলছি।

আফসার সাহেবের নিজের কোন মতামত আর নেই। এতো গুলো মানুষের জীবন যাবে। সেটা কিভাবে?

তিনি ডেকে পাঠালেন পুত্রবধূ রুনা কে। সব আকাশের চোখের সামনে ঘটলো।

রুনা দেখতে সুন্দরী। তখনো বয়সের কোন ছাপ পরে নাই। মেজরের একবার দেখেই পছন্দ হয়ে গেল। বললো

পাকিস্তানের সমৃদ্ধির জন্য একদিনের জন্য আপনার পুত্রবধূ নিয়ে গেলাম। একদিন পর ফিরিয়ে দিয়ে যাবো

আফসার সাহেব কথা শুনে বাক হারা হয়ে গেলেন। কি বলবেন কিছুই বুঝতে পারলেন না। তার চোখের সামনেই রুনা কে নিয়ে গেলো ।আকাশ বাক রুদ্ধ হয়ে দেখছে। সে বুঝতে পারছে না কি হচ্ছে? মা কে কেন নিয়ে গেলো ? খুব রাগ উঠছে। ইচ্ছা করছে সব ভেঙে চুরমার করে দিতে। সে পারলো না চুপ থাকতে। জোরে চিৎকার দিলো “আম্মু” বলে। কিন্তু জিপ টা অনেক দূর চলে গিয়েছে। রুনা সেই ডাক শুনতে পেলো না।রুনা আর কোন দিন শুনতে পায় নাই আকাশের ডাক

আফসার সাহেবের প্রতি ঘৃণায়  আকাশের গলা পর্যন্ত বমি উঠে আসলো।থুতু ফেললো মাটিতে। যেয়ে নিজের দাদার (আফসার সাহেবের) শার্ট এর কলার ধরে টান দিয়ে  বলল

পারলেন কিভাবে নিজের পুত্রবধূ কে মিলিটারির হাতে তুলে দিতে? নিজের মেয়ে হলে পারতেন?

আমার আর কিছুই করার ছিল না বেটা। আমরা সবাই মারা যেতাম। বৃহত্তর স্বার্থে আমি এটা করেছি।

বৃহত্তর স্বার্থে না। আপনি আপনার নিজের স্বার্থে করেছেন। ছিঃ

কেউ আকাশের এরকম রণচণ্ডী মূর্তি কোন দিনও দেখে নাই। আকাশের বাবা জয়নাল এসে আকাশের গালে একটা চড় বসালো। দাদার সাথে এইভাবে কথা বলে?

তুমি আমাকে মারলে? আমি তো  সব ঠিক বলেছি। তোমার স্ত্রী কে নিয়ে গেলো আর তুমি চুপ করে দাঁড়িয়ে ?

আব্বা তো ঠিক করেছে একজনের জন্য আমরা সবাই মরতাম নাকি?

আকাশ আর পারলো না সেখানে দাড়িয়ে থাকতে। তার মনে হচ্ছিলো একদল পশুর মাঝখানে সে দাঁড়িয়ে আছে। ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো

ঘরের ভিতর শিপন শুয়েছিল। ভাইয়ের এই অবস্থা দেখে দাঁড়ালো। আকাশ চেয়ার বসলো। চোখ থেকে পানি পড়ছে টপটপ করে। শিপনের কান্না আসছে। কিন্তু তার তো কাঁদলে চলবে না। সে তার হাত রাখলো আকাশের ঘাড়ে। শিপনের স্পর্শ পেয়ে আকাশ হাউ মাউ করে কাঁদতে শুরু করলো

আমার আম্মু কে মিলিটারি রা ধরে নিয়ে গেলো আমি কিছুই করতে পারলাম না। আম্মু না জানি কতই কষ্ট পাচ্ছে।

কিছুক্ষণ কাঁদলো আকাশ। তারপর একদম মূর্তির মত চেয়ারে স্থির হয়ে বসে থাকলো। এইবার সময় এসেছে। আর বসে থাকা যাবে না। আর কাপুরুষের মত পালিয়ে থাকলে হবে না। যুদ্ধে যেতে হবে। প্রতিশোধ নিতে হবে। নির্মম প্রতিশোধ। সেই রাতেই সোহেল ভাইদের সাথে যুদ্ধে গেলো আকাশ। যাওয়ার আগে শিপন কে কিছু বলল না। বললে শিপন যেতে চাইবে। কিন্তু তার তো বয়স হয় নাই যুদ্ধে যাওয়ার। শুধু একটা চিঠি লিখে গেলো

শিপন

আমি যুদ্ধে গেলাম। আমার মা যদি ফিরে আসে তাকে আর এই বাড়িতে রাখবি না। ঢাকায় আমার বান্টি মামা থাকে সেখানে যেয়ে উঠবি। আমার মা কে তুই দেখবি আমি যতদিন না আসবো।আমার মাথার কসম রইলো

পুনশ্চ

আমি কোনদিন না ফিরলে তোকেই ডাক্তার হতে হবে মনে রাখিস।

Freedom Fighter
Credit: RAYMOND DEPARDON / MAGNUM PHOTOS

****************

আফসার সাহেব নিজের ঘরে বসে আছেন। অনুশোচনায় বুক জ্বালাপোড়া করছে। রুনা তার কাছে পুত্রবধূ না তার মেয়ে। আর মেয়ে কে মিলিটারির হাতে তুলে দিলেন? কিছুই খেলেন না রাতে। শুয়ে পড়লেন তাড়াতাড়ি। বুকের বাম পাশটা সন্ধ্যা থেকে ব্যথা করছে। তিনি ভাবছেন এখন কি করবেন? কিভাবে উদ্ধার করবেন রুনা কে? মেজরের পা ধরে বসে থাকবেন যতক্ষণ না রুনা কে ছাড়ে। কিন্তু ছাড়বে তো ? ঘুম আসছে না সারা রাত ছটফট করলেন। শেষ রাতের দিকে একটু ঘুম হল। সেই ঘুমই শেষ ঘুম। ঘুমের মাঝেই হার্টএটাকে মারা গেলেন তিনি।

********************

রুনা ফিরে এসেছিলো। বিধ্বস্ত হয়ে। এই সময় তার অসম্ভব ভালবাসার দরকার ছিল।সেই ভালবাসাই তার ভিতরের যে ক্ষত তৈরি হয়েছে তা দূর করতে পারতো । কিন্তু ভালবাসা তো দুরের কথা রুনা কে তার স্বামী  জয়নাল  গ্রহণ করে নাই আর। সারা রাত বাড়ির বাইরে বসেছিল রুনা।বৃষ্টি তে ভিজেছে। অথচ কেউ বাড়ির ভিতর আনে নাই তাকে।শিপনের দাদী আমেনা তখন স্বামী হারানোর শোকে পাগল প্রায়। তাও তিনি কথা বলতে গেলেন জয়নালের সাথে।

বাবা রুনা তো ফিরে এসেছে

আমি কি করবো

ঘরে তুলবি না?

তোমার কি মাথা খারাপ মা? ওই মেয়ে কে ঘরে তোলা  যায়?

এত পাষণ্ড হইলি কিভাবে? নিজের বউ কে ঘরে তুলবি না?

যে বউ মিলিটারি ক্যাম্প থেকে আসছে তাকে ঘরে তুললে সভ্য সমাজ আমাকে কি বলবে ? আমি মুখ দেখাতে পারবো ? এমনি ছেলেটা যুদ্ধে যেয়ে আমাকে বিপদে ফেলেছে। তাকেও তাজ্য করবো। পারলে খুন করতাম। আর শুনো মা রুনা যেন কোন ভাবেই ঘরে ঢুকতে না পারে। শিকল আটকে দাও। আর কেউ যেন কোন খাবার পানি না দেয়। নাহলে সে বিদায় হবে না।

তুই আমার ছেলে? তোকে আমি পেটে ধরেছি? আমার বিশ্বাস হয় না।আমি তোর সাথে আর কথা কমু না। আমাকে মা ডাকবি না।

রুনা গেটের বাইরে বসে আছে। আকাশে মেঘ জমেছে। পরনে একটা শাড়ি রক্তের দাগ লাগা। মাথার চুলগুলো এলো মেলো। দরজা বন্ধ । ঘরে ঢুকতে পারছে না। কেমন অস্থির লাগছে তার। নিজের ঘরে সে ঢুকতে পারবে না? কই যাবে সে? খুব পানি পিপাসা পেয়েছে। আক্কাস কে সামনে পেয়েছিল। বলল এক ঘটি পানি দিতে। কই দিলো না যে? আকাশ গেলো কই? আর বাবা? ২ দিন ছিল না সে তাতেই সব ওলট পালট হয়ে গিয়েছে। ফাঁকে ফাঁকে ক্যাম্পের কথা মনে হয়। কি মাথায় আগুন দপ দপ করে জ্বলে উঠে। ইচ্ছা করে সব ভেঙ্গে চুরমার করে ফেলতে। কিন্তু তার পর পর মনে হয় তার একটা পরিবার আছে। তার জন্য তাকে বাঁচতে হবে।

************************

শিপন নিজের ঘরে চুপ করে বসে আছে। ভিতরে ভিতরে শক্তি সঞ্চয় করছে। কিন্তু সাহস পাচ্ছে না। কিন্তু তাকে পারতেই হবে। আকাশ তাকে একটা কাজ করতে বলেছে আর সে তা করবে না? তা কি করে হয়? রাত ১০টা বাজতেই বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু আজকে ঘুমাচ্ছে না। কারন গেটের বাইরে রুনা। বাড়ির বউ। কিন্তু জয়নালের কোঠর নির্দেশ রুনা যেন বাড়িতে না ঢুকে। আফসার সাহেবের মৃত্যুর পর জয়নাল এখন পরিবারের কর্তা। তার কথা তো শুনতেই হবে। বাইরে রুনা কাঁদছে। কান্নার শব্দ শুনছে শিপন। রাগ হচ্ছে খুব। তার ইচ্ছা করছে জয়নাল কে খুন করতে। শিপন মায়ের আদর পায় নাই। রুনাই তার কাছে মা। জয়নাল ঘুমাতে গেলো। তার কাছে এই ঘটনা আর কোন ব্যাপার না। বরং সে আরেকটা বিয়ের স্বপ্ন দেখছে। বড় সিন্দুকের চাবি জয়নালের কাছে থাকে। জয়নাল শুতেই ঘুমিয়ে পড়লো। শিপন পা টিপে টিপে জয়নালের ঘরে ঢুকলো। তারপর চাবি চুরি করে সিন্দুক থেকে সব টাকা , গহনা বের করে ব্যাগে ভরলো। আর নিলো রুনার কিছু কাপড় আর বোরখা।

রাত বাজে বারো টা। রুনা হাউমাউ করে কাঁদছে। তার সংসার যে ভেঙ্গে গিয়েছে তা সে বুঝতে পেরেছে। শিপন বসে আছে তার সামনে। রুনা কে নিয়ে ঢাকা যাবে বান্টি মামার বাসায়। রুনা যেতে চায় না। কিন্তু সে খুব পরিষ্কার বুঝেছে জয়নাল তাকে আর ঘরে তুলবে না। আকাশের শিপনের কাছে দেয়া চিঠিটা রুনার হাতে। এতো কষ্টের মাঝেও তার গর্ব হচ্ছে আকাশের জন্য। সেই নরম মনের ছেলেটা শক্ত হয়েছে। যুদ্ধ করতে গিয়েছে পাকিস্তানি জানোয়ার গুলো কে শিক্ষা দেয়ার জন্য। নাহ তাকে বাঁচতে হবে। যুদ্ধ থেকে ফিরে আকাশ তো তার কাছেই আসবে। আর শিপন তার আরেকটা ছেলে যে তার জন্য সব ছেড়ে রাস্তায় নেমে এসেছে তাকে কে দেখবে? বাঁচতে হলে ঢাকা যেতে হবে। এখানে জয়নাল নামক নরপশুর কাছে থাকার জন্য আর সে কাঁদবে না। সে জয়নাল কে ঘৃণা করে। সেই রাতেই শিপন আর রুনা রওনা দিলো ঢাকার উদ্দেশ্যে। চিরতরে সরিষাপুর ছেড়ে চলে গেলো তারা। আসলে দুর্যোগে বয়সে ছোট মানুষও বড় হয়ে যায়। শিপন যেমন হয়েছিলো।

পুরো ঘটনা বলতে বলতে সানি আবেগ আপ্লূত হয়ে গেলো। তার চোখ থেকে পানি পরছে।

জানো রনি দাদি এখনো পুরো স্বাভাবিক হন নাই। এখনো রাতে যখন ক্যাম্পের দুঃস্বপ্ন দেখেন তখন হাউ মাউ করে কাঁদেন । দাদি কিন্তু এখন নিউইয়র্কে আমাদের সাথেই থাকেন।

তোমার আকাশ চাচার কি হল।

তিনি মুক্তিযুদ্ধের পর আর ফিরেন নাই। তার কোন খবর পাওয়া যায় নাই।সম্ভবত তিনি শহীদ হয়েছেন যুদ্ধে ।

আচ্ছা তোমার বাবা কি ডাক্তার হয়েছেন?

না। কিন্তু আমি হবো।এইবার তোমাকে আসলে একটা তথ্য দেই নাই। এইবার বলি।আমরা আমেরিকায় থাকি। কিন্তু দেশ কে ভুলে যায় নাই। আব্বু পাকাপাকিভাবে দেশে চলে আসবেন। সারাজীবন চাকুরী করে যা সঞ্চয় করেছেন তা দিয়ে সরিষাপুরে হাসপাতাল করবেন।তাই সরিষাপুরে দাদু বাড়িতে যাবো এইবার।সব দেখে আসতে। আর আমি এইবার এখানে মেডিক্যাল এডমিশন টেস্ট দিবো। এখানেই মেডিক্যাল পড়বো ।এই দেশে থাকবো আজীবন ।

রনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো

আমি সরি তোমাকে অনেক খারাপ কথা বলেছি। একদিনের বাঙালি বলেছি। আসলে তোমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে দেশপ্রেম রয়েছে। এতো আমি কারো মাঝে দেখি নাই। আমার ইচ্ছা ছিল দেশের বাইরে যাওয়ার কিন্তু তোমাকে দেখে আমারও দেশে থেকে যেতে ইচ্ছা করছে।

দেশের বাইরের যাবা না কেন অবশ্যই যাবা। উচ্চতর শিক্ষা নিবা। চাকুরী করে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাবা। দেশের বাইরে যাওয়া ব্যাপার না। দেশ কে ভুলে যাওয়া আসল ব্যাপার। আমরা যেন কক্ষনো দেশ কে না ভুলে যাই। কারন দেশ হল মা। মা কে ভুলে যাওয়া যেমন পাপ। দেশ কে ভুলে যাওয়া সেরকম পাপ।

আজ ২৬ এ মার্চ। স্বাধীনতা দিবস। বিকেল বেলা রনি আর সানি সাভার স্মৃতিসৌধে এসেছে। হাতে গোলাপের তোরা।শহীদ দের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবে ফুল দিয়ে। দেখলো একজন ভদ্র লোক ক্র্যাচে ভর দিয়ে এসেছেন। সাথে তার নাতি। ২ জনের হাতেই ফুল। রনি আর সানির লোক টার প্রতি শ্রদ্ধায় মন ভরে গেলো। এত কষ্ট করে তিনি এসেছেন শহীদ দের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে।রনি ভাবছে  আসলে  সবার মাঝেই দেশপ্রেম রয়েছে। শুধু সেটা কে জাগিয়ে তুলতে হবে। যেমন সানির সাথে মিশে সে দেশের প্রতি ভালবাসা কি তা উপলব্ধি করতে পেরেছে।

পরিশিষ্ট

সরিষাপুরে হাসপাতাল তৈরির কাজ চলছে। সব তদারকি করছেন সানির বাবা শিপন সাহেব। রুনা কে বীরাঙ্গনার মর্যাদা দেয়া হয়েছে। সানি ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়েছে। দেশের সবচেয়ে বড় নিউরোসার্জন হবে এটাই তার লক্ষ্য। আর রনি এখন এমবিএ করে একটি মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানি তে আছে। আর সানি আর রনির মাঝে গভীর প্রেম আদান প্রদান চলছে। এখন তারা একজন আরেকজনের স্পেশাল কেউ।

সমাপ্ত।

এই গল্পের সকল চরিত্র , ঘটনা, কাহিনী কাল্পনিক।