ফেরা (পর্ব -১)

বৈশাখ মাস । হজরত শাহজালাল (র) আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর থেকে বের হতেই ঢাকার বিখ্যাত রোদ চোখে এসে পড়লো।কত বছর পর এলাম? তাও ১০ বছর হবে। এই এতো গুলো বছরে ঢাকায় নিশ্চয়ই অনেক পরিবর্তন এসেছে।
আমাকে রিসিভ করতে কেউ আসে নাই নিশ্চয়ই। আমি জানি আসবে না। আমার আসার কথা তো শুধু মাত্র জানেন ছোট কাকু। হটাত ইমারজেন্সি কলে ঢাকায় আসা। আসতাম না। কিন্তু ছোট কাকু এমনভাবে ফোনে কথা বললেন না এসে পারলাম না। ছেলে বেলায় তার কাছ থেকেই অপার স্নেহ পেয়েছি। বড় হয়ে পেয়েছি সাহায্য। আমার জীবনের একটি বিশাল অংশ জুড়ে তিনি। তিনি ডাকবেন আর আমি আসবো না?
মিশু আমার সাথে আসতে পারে নাই। হটাত করে ছুটি পেলো না। মিশু আমার বয়-ফ্রেন্ড। তার কথা যথা সময়ে বলবো।
আমার দ্রুত পালইকান্তা পৌঁছাতে হবে। পালইকান্তা আমার গ্রাম। আমার ভালবাসা। সেখানেই আমি বেড়ে উঠেছি ।
বের হয়ে ট্যাক্সি নিয়ে ফার্মগেটের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। ওখানে একটা হোটেলে বুকিং দেয়া আছে। গাড়ি এয়ারপোর্ট রোড ধরে চলছে। সেই পরিচিত রাস্তা অপরিচিত লাগছে। ফ্লাইওভার হয়েছে। রাস্তার দুইপাশে সুন্দর সুন্দর ভাস্কর্য ।মুগ্ধ হয়ে দেখছি। কত পরিবর্তন এই ঢাকা শহরের।
এসি চালানো দেখে রক্ষা। নাহলে বাইরে ঢাকার বিখ্যাত গরম। ভাবছি ভ্রমণ টা কষ্টকর হবে। হোটেলে ফ্রেশ হয়ে লাঞ্চ করেই বের হতে হবে কমলাপুর রেল স্টেশনের উদ্দেশ্যে রওনা দিতে হবে। ট্রেনে করে ময়মনসিংহ। সেখান থেকে বাস তারপর নৌকা যোগে পালইকান্তা গ্রাম।
পালইকান্তা কি এখনো তেমন আছে সেই পুরনো আমলের মত?সেই আমার ছেলেবেলার মত। সবুজ আর সবুজ? নাকি যান্ত্রিকতার ছাপ পড়ে গিয়েছে? ভাবতে ভাবতে চলে গেলাম সেই ১৯৯৬সালে। ২২ বছর আগে।

সময় টা ১৯৯৬।
পালইকান্তা গ্রাম। গ্রামের পাশে ব্রহ্মপুত্র নদ। গ্রামটির তিন পাশে নদী। পাকা রাস্তা নেই। ঢাকা থেকে আসতে হলে নদী পার হয়ে আসতে হবে। সভ্যতার আলো তাই কম পড়েছে এখানে। গ্রামে বিশাল জমিদার বাড়ি। মৃধা বাড়ি। আমার দাদা আলি আকবর মৃধা এই বাড়ির কর্তা। জমিদারি প্রথা সেই পাকিস্তান আমলেই বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। কিন্তু গ্রামের মানুষ দাদা কে এখনো জমিদারের থেকে কম মনে করে না।দাদাউ নিজেকে এখনো যেন জমিদার ই ভাবেন।সেই রকম ঠাট বাঁট বজায় রেখেছেন। যে কোন ধরনের অপরাধ হলে দাদার কাছেই সবাই নালিশ করতে আসে। যে কোন শালিসে প্রধান থাকেন আমার দাদা।আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে এখনো কেউ ছাতা মাথায় দিয়ে যায় না। এতোটা সম্মান করে গ্রামের মানুষ।দাদা রাশভারী মানুষ। অসম্ভব ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন ।কেউ মুখের উপর একটা কথা বলার সাহস পায় না।
এবার আসি আমার কথায়।আমি সবুজ। বয়স ১২। আমার বাবা মা বেঁচে নাই। সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছেন। তারপর থেকে আমি দাদার কাছে মানুষ হয়েছি । আমার বাবা ছিলেন বড় ছেলে। আমার আরো ৩ চাচা রয়েছে। এক ফুপুও রয়েছে।ফুপুর বিয়ে হয়ে গিয়েছে ।ঢাকায় থাকেন।দাদু গ্রামে একটা স্কুল দিয়েছেন। আমি সেখানে ক্লাস ফাইভে পড়ি।
ক্লাস ফাইভে পড়লে কি হবে । আমি বয়সের তুলনায় অনেক পাকা।যাকে বলে অকালপক্ব ।সব বুঝি। আমার ফুটফরমাশ খাটার জন্য একটি ছেলে ঠিক করেছেন দাদু। তার সাথে আমার ভারি বন্ধুত্ব হয়েছে। সে আমাকে যাবতীয় গোপন কথা বলে ।বাসার নানা গোপন কথা তার নখদর্পণে ।ছেলেটার নাম মনি। মনির বয়স হবে ১৫-১৬।পড়াশোনা করেছে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত ।
আমাদের বাড়ি টা খুব সুন্দর। ভারতীয় আর্কিটেক্ট দিয়ে আমার দাদার বাবা বানিয়েছিলেন। দোতালা কাঠের বাড়ি। ২০ টি ঘর রয়েছে। বাড়ি টার পিছনে বিশাল একটা দীঘি আর ঘাটলা। সামনে বাগান। মালী কাকু রয়েছেন। বাগানে আমার দাদার বাবার একটা ভাস্কর্য রয়েছে।ভাস্কর্যের একটা কান ভাঙা। একটা নেংটা পরীর মূর্তি রয়েছে। আমার মূর্তিটি দেখলে খালি হাসি পায়। মূর্তি টাকে একটা কাপড় পরিয়ে দিলে কি ক্ষতি হত? বেচারি।
আমাদের বাসায় দাদি মারা যাবার পর থেকে কোন মহিলা নেই। মেজ কাকু আর ছোট কাকু বিয়ে করেন নাই। আর বড় কাকু ছোট বেলায় পালিয়ে ইতালি চলে গিয়েছেন। কিভাবে গিয়েছেন তা জানি না। পালিয়েছেন দাদুর ভয়ে। তিনি আই এ পরীক্ষায় ফেল করেছিলেন। ভেবেছিলেন দাদু পিটিয়ে মেরেই ফেলবেন। অবশ্য এরপরে আমার কোন চাচুই আই এ পরীক্ষাই দেন নাই। আর ফুপু নিজে নিজে বিয়ে করেছেন বলে দাদু তাকে ত্যাজ্য করেছেন। তার নাম উচ্চারণ করাও নিষিদ্ধ ।
আমাদের মূল বাড়ি টার বাইরে একটা নাচঘর আছে। এই ঘর টা কে বলে রঙ মহল। সে এক রহস্যময় বাড়ি। ওখানে আমাদের সবার যাওয়া নিষেধ। এমন কি ছোট কাকু আর মেঝ কাকুরও। শুধু মাত্র দাদা যান। দাদা যখন রঙ মহলে যান ছোট কাকু রাগে জিনিসপত্র ছুড়ে মারতে থাকেন। কেন এতো রাগ কে জানে?
আমি একদিন মনি কে জিজ্ঞেস করলাম
-আচ্ছা রঙ মহলে কি হয়? জানো ? আমাদের নিষেধ কেন যাওয়া ?
-তুমি জানো না? ওখানে নাচ হয়?
-নাচ দেখতে নিষেধ কেন? আমরা তো যাত্রা দলের নাচ প্রায়ই দেখি। তখন তো দাদু না করেন না?
-আরে ওখানে তো বেশ্যারা নাচে।
-বেশ্যা কি?
-তুমি বুঝবা না।
-বুঝায় বল।
-আছে ব্যাপার। তোমাকে নিজের চোখেই দেখাবো।
-কিভাবে?
-কাল কে রংমহলে আসর হবে। সেই আসরে আসবে নাকি মধু বাঈ। সোনালি ঘাগরা আর গহনা পরে নাচবে। সেইরকম নাচ হবে। তুমি আর আমি গোপনে দেখবো। পিছন দিকে জানালা ভাঙা একটা। ওই জানালা দিয়ে সব দেখা যায়।
কিন্তু দাদা জানলে মেরেই ফেলবেন।
জানবে কিভাবে।তুমি বলবা ?
-না। তাও ভয় লাগে।
-তাহলে আমি একাই যাবো। তোমার তো মুরগীর কলিজা।
এইবার আমার গায়ে লাগলো। আমি হাজার হলেও আলি আকবর মৃধার নাতি। মুরগীর কলিজা বলার সাহস কিভাবে হয়??
-না আমিও যাবো।
আমি রাজি হওয়াতে মনি খুশি হয়ে গেলো।সব ধরণের গোপন কথা আমাকে শোনাতে আর দেখাতে পারলে সে দারুণ খুশি হয়। সে এক কথায় এসব বিষয়ের টিচার। এর আগে মেয়েদের নগ্ন ছবি আমাকে দেখিয়েছে। আমি দেখতে চাই নাই। খুব লজ্জা পেয়েছিলাম।
পরের দিন রাতে খাবার টেবিলে দাদা নাই। বুঝলাম রঙ মহল গিয়েছেন। ওখানে গেলে রাতে ঘরে খান না তিনি।খাবার টেবিলে পিন পতন নীরবতা।অন্য সময় ছোট কাকু কত গল্প করে। আজ গম্ভীর মুখে খাচ্ছেন। খাওয়া ভাল হয়েছে ।তারপরও মেজো কাকু কিছুই খেলেন না। বুঝলাম দাদুর রংমহলে যাওয়া তাদের পছন্দ না। অথচ দাদুর মুখের উপর কিছু বলার সাহস নাই। আমি দ্রুত খাওয়া শেষ করে নিজের ঘরে চলে আসলাম। দেখলাম মনি খেয়ে দেয়ে বসে আছে আমার অপেক্ষায়। আমি বললাম-
-কখন যাবা?
-আরেকটু রাত হোক। ছোট সাহেব আর মেঝ সাহেব ঘুমাক।
আমি উৎসাহে টগবগ করছি। কিন্তু সময় আর পার হয় না। আরো এক ঘণ্টা পর মাথা চাদর দিয়ে ঢেকে আমরা বের হলাম। বর্ষা কাল। বিকেলে বৃষ্টি পড়েছিলো। মাঠ ভিজা।নিকষ কালো রাত। শুধু ঝি ঝি পোকা ডাকছে।আমার ভয় ভয় লাগছে। মনি আমার হাতে স্পর্শ করে সাহস দিচ্ছে । রঙ মহলের কাছাকাছি আসতেই গানের আওয়াজ শুনতে পারলাম। বাংলা গান নয়। সম্ভবত হিন্দি গান। আমার শুনতে বেশ লাগছে। তালে তালে নাচতে ইচ্ছা করে। আমার তো গান শুনা হয় না। ছোট কাকু ক্যাসেটে গান শুনেন তখন শোনা হয়। তাও সব বাংলা গান।
রঙ মহলের পিছনের দিকের দেয়ালে একটা ভাঙা জানালা। আমি আর মনি গা ঘেঁষা ঘেঁষি করে দাড়িয়ে জানালা দিয়ে উঁকি মারলাম।কিন্তু কোথায় মধু বাঈ? কোথায় সোনালী ঘাগরা? এতো আমার বয়সী একটি মেয়ে।ফ্রক পরে নাচছে।মাথায় বেণি, ঠোঁটে যাত্রা দলের মহিলাদের মত রঙ মাখানো, পায়ে ঘুঙুর। কিছুক্ষণ পর বুঝলাম এ মেয়ে নয়। ছেলে। মেয়ে সাজানো হয়েছে।একদিকে হারমোনিয়াম, তবলা বাজাচ্ছে কিছু মানুষ। দাদা একটি পাত্রে কি জানি খাচ্ছেন। সাথে আরও ৩ জন রয়েছেন।তারাও খাচ্ছেন।আমি ফিস ফিস করে মনি কে জিজ্ঞেস করলাম
-দাদাজান কি খাচ্ছেন?
মণি ফিস ফিস করে বলল
-মদ। কিন্তু আর কথা নয়। চুপ করে নাচ দেখো। আমাদের কথা শুনতে পারলে মেরেই ফেলবে।
মদের কথা শুনে আমার খুব অবাক লাগলো। মদ খাওয়া তো মন্দ। দাদাজান খাচ্ছেন কেন! ছেলে টা খুব সুন্দর নাচছে। কিন্তু তার চোখ দেখে আমার মনে হল তার অনেক দুঃখ ।অনেক অভিমান। আমি অবাক হয়ে জানালা দিয়ে দেখছি। রংমহলের ভিতরের সাজ সজ্জা খুব সুন্দর। ঘরের মাঝখানে বিশাল একটা ঝাড়বাতি ঝুলানো । দেয়ালে বেলজিয়ান গ্লাসের আয়না। মেঝে তে আলপনা আঁকা। বিশাল ২ টি শ্বেত পাথরের ঘোড়া। আর মেঝে তে গদি বিছানো।
হটাত ছেলেটা নাচতে নাচতে জানলার দিকে তাকালো।আমাদের দেখে ফেললো।তার চোখ পড়লো আমার চোখে। সে ভুত দেখার মত জোরে চিৎকার দিলো। চিৎকার শুনে আমরা দিলাম দৌড়। একদম আমাদের ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে দিলাম। হাঁপাচ্ছি জোরে জোরে। গলা শুকিয়ে গিয়েছে।বুকে হৃৎস্পন্দন বেড়ে গিয়েছে।এতো ভয় আর কোন দিন পাই নাই। কেউ দেখে নাই তো আমাদের? নাহ তাহলে এতক্ষণে আমাদের ঘরে এসে উপস্থিত হত। কেন যে ছেলেটা এতো জোরে চিৎকার দিলো।আমি এতই ভয় পেয়েছি যে নিজের বুকের ধুক ধুক শব্দ শুনতে পাচ্ছি।
কিছুক্ষণ পর আমি বোকার মত মনি কে জিজ্ঞেস করলাম-
– কোথায় মধুবাঈ ? এ তো একটা ছেলে!
মনিও বোকা হয়ে গিয়েছে। কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল-
– এ মনে হয় ঘেঁটু দলের ছেলে । এরা মেয়ে সেজে থাকে। নাচ গান করে। এদেরকেও অনেকে পছন্দ করে।
– আমি বললাম
– কিরকম পছন্দ?
এইবার মনি লজ্জা পেয়ে বলল-
– তুমি বুঝবা না।
– আমি বুঝবো বল।
– ওরা সেক্স করে।
আমি সেক্স কথাটা আগেও শুনেছি।ক্লাসের ছেলেরা বলাবলি করে। কিন্তু মানে জানি না।
– সেক্স মানে কি?
সেদিন মনি আমাকে সৃষ্টি জগতের একটি বিস্ময় কে আমার সামনে তুলে ধরলো। অপ্রাপ্ত বয়সেই আমি প্রাপ্ত বয়স্ক হয়ে গেলাম। সারা রাত আমি ঘুমাতে পারলাম না। কেন জানি পুরো পৃথিবী কে কর্কশ আর নোংরা মনে হচ্ছিলো। আর মধুবাঈ এর জন্য চোখ জলে ভিজে আসছিলো । আহা ছেলেটা আসলেই তো অসহায়।
কিন্তু ওরা কোথায় উঠেছে আমি জানতে চাইলাম।
– নদীর ঘাটে মনে হয়। ভাটি অঞ্চলে থাকে এরা। বর্ষাকালে এই অঞ্চলে আসে। মনে হয় নদীর ঘাটেই বসতি গড়েছে।
সেইদিনের ঘটনা নিয়ে আর কোন হইচই হল না। কিন্তু এরপর আসর বসলে শহীদ চাচা (দারোয়ান) রংমহল ঘিরে টহল দিতেন। আমাদের আর সাহস হয় নাই রংমহলের ধারে কাছে যাওয়ার।

মধুবাঈয়ের সাথে আমার আরেকবার দেখা হয়।একটি নিষিদ্ধ জায়গায়। একদিন মনি এসে খবর দিলো মেলা বসেছে গ্রামে। আমি তো মহা-খুশি। মেলায় যাবো । কদমা , বাতাসা খাবো । খেলনা কিনবো।চরকি তে উঠবো । কিন্তু মনি বলল অন্য কথা।তার কথা অনুযায়ী নিশুতি রাতে মেলার আসল মজা পাওয়া যায়। তখন নাকি মেলা জমে উঠে ।
– এতো রাতে মানুষ মেলায় যায়?
– হ্যাঁ। যারা সত্যিকারের পুরুষ তারা যায়।
– আমি বললাম
– দাদু তো যেতে দিবে না।
– না জানিয়ে যাবো।
– কিন্তু ধরা পড়লে ?
– ধরা পরবো না।
আমার কেমন জানি ভয় লাগছে। আবার যেতেও ইচ্ছা করছে। শেষ পর্যন্ত যেতে রাজি হলাম। আসলে নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি সবার আকর্ষণ থাকে। আর আমার বয়সে তো আরও বেশি।
আবার সেই রাতের মত নিশুতি রাতে বের হলাম আমরা মাথায় চাদর ঢেকে। দেয়াল টপকালাম। কারন মূল ফটকে শহীদ চাচু রয়েছেন। দেখে ফেলবেন তিনি। মনি আমাকে হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছে। যাতে হারিয়ে না যাই।কণকণে ঠাণ্ডা ।শিশির পরছে ।অন্ধকার।মাঝে মাঝে জোনাকি পোকা জ্বলছে নিভছে। মনির কাছে একটা টর্চ লাইট ছিল। টর্চ লাইটের আলোয় পথ দেখে যাচ্ছি। কেমন ভয় ভয় করছে। ভুত নেই তো আশে পাশে। মেলা বসেছে নদীর তীরে।
মেলায় এসে দেখলাম এতো রাতেও পুরুষ মানুষের ভীর। বেশ কয়েকটা বাতির ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই বাতির আলোয় আলোকিত চারিপাশ।মেলায় কেউ তাস খেলছে।নানা রকম জুয়ার আসর বসেছে। কোনটার নাম ওয়ান টেন, কোনটা ডাবব, কোন টা চরকি। কেউ মদ খাচ্ছে । ব্যাটারি দিয়ে একটা টেলিভিশন চালানো হচ্ছে। সেখানে মেয়েদের নগ্ন শরীর দেখাচ্ছে।সবাই ঘুরে ঘুরে আমাকে দেখছে। এত অল্প বয়স্ক কোন ছেলে তো নেই। আমি চাদর দিয়ে মুখটা আরও ভালভাবে ঢেকে নিলাম যাতে কেউ চিনতে না পারে। কেমন ভয় করছে।
মনি আমার কাছ থেকে টাকা নিয়ে তাস খেলতে বসে গিয়েছে। আমার কাছে প্রায়ই দাদা কিছু টাকা রাখতে দেন। সেখান থেকে দিলাম। আমি মেলায় ঘুরে বেড়াচ্ছি। একপাশে দেখলাম নাচ হচ্ছে ।একজন গানও গাইছে।
আমার মনের বেদনা
সে বিনে কেউ জানে না
কালা যখন বাঁজায় বাঁশি
তখন আমি রান্তে বসি
বাঁশির সুরে মন উদাসী
ঘরে থাকতে পারি না
আমার মনের বেদনা
সে বিনে কেউ জানে না।
অনেকেই দাড়িয়ে দেখছে। আমি গিয়ে দেখলাম এ আর কেউ নয় মধুবাঈ। আজো মেয়ে দের পোশাক পরে নাচছে। পায়ে ঘুঙুর।
নাচ শেষ হলে সে আমার পাশে এসে দাঁড়ালো।
– তুমি জমিদারের নাতি না?
– হ্যাঁ ।
– এখানে কি কর? এখানে ছোট দের আসা নিষেধ।
– কিন্তু তুমি তো এসেছো ?
– আমি আর তুমি এক হলাম? আমি হলাম ঘেঁটু পুত্র। আর তুমি জমিদারের নাতি।
এই কথাটা বলতে বলতে ছেলেটা মুখ করুন হয়ে গেলো । আমাকে জিজ্ঞেস করলো-
– তোমার অনেক খেলনা না?
আমি কিছু বললাম না।
– আমার জানো কোন খেলনা নাই। কেউ আমাকে খেলতে নেয় না। আমি সারা দিন একা থাকি। আমার ভাল লাগে না। আর রাত হলেই তো নাচ আর…।
– আর কি?
– কিছু না। তুমি বুঝবা না।
আমার খুব কষ্ট লাগছিলো। ঈশ একটা খেলনা যদি নিয়ে আসতাম। তাহলে একে দেয়া যেতো।
হটাত একটা বিকট দর্শন মহিলা এসে মধু কে চড় দিয়ে বলল
– তোর না বাইরের মানুষের সাথে কথা বলা নিষেধ ? আয়।
মহিলা আমার দিকেও কেমন জানি সন্দেহর দৃষ্টি তে তাকালও। আমি ভাবলাম চিনে ফেললো না তো ? কিন্তু মহিলা কিছু জিজ্ঞেস করলো না। মধু কে নিয়ে চলে গেলো।মধু একবার পিছন ফিরে করুন চোখে আমার দিকে তাকালো। তারপর মহিলার পিছন পিছন চলে গেলো। চোখ দেখে মনে হল পৃথিবীর সব অভিমান তার চোখে কান্না হয়ে টলমল করছে।
আমার খুব কষ্ট হচ্ছিলো কেন জানি মধুর উপর। কেমন জানি একটা আত্মার বন্ধন অনুভব করছিলাম। অজান্তেই চোখে পানি এসে গেলো । কেন ছেলেটার একটাও খেলনা নেই। ঈশ আমার একটা খেলনা যদি তাকে দিতে পারতাম।
একটু পরে মনি বিড়ি ফুকতে ফুকতে আসলো। যত টাকা দিয়েছিলাম জুয়া খেলতে গিয়ে সব হেরে বসে আছে। কিন্তু তারপরও মনি বেশ খোশ মেজাজে বলল
– চল বাড়ি যাই।
আমরা রওনা দিলাম বাসার উদ্দেশ্যে। যেতে যেতে বার বার মধুর কথাই মনে আসছিল। এদিকে ততক্ষণে যে ছোট কাকুর গুপ্তচর খবর দিয়ে দিয়েছে তা তো জানি না। আসলে আমরা ছোট দেখেই বুঝতে পারি নাই মেলায় ঢুকার পর থেকেই সবাই আমাদের লক্ষ্য করছে। অনেক আগেই তাড়িয়ে দিতো কিন্তু জমিদারের নাতি দেখে কিছু বলে নাই। কিন্তু খবর ঠিকই পাঠানো হয়েছে।
বাড়ি তে ঢুকতেই দেখলাম ছোট-কাকু দাড়িয়ে আছে। চোখ লাল। আমার আত্মা কেঁপে উঠলো। আমাকে কিছু বললেন না। শুধু বললেন উপরে নিজের ঘরে যেতে। সে কি শীতল কণ্ঠ। আমি দৌড়ে চলে গেলাম।অপেক্ষা করছিলেম মনির জন্য। মনি কে কি কাকু খুব মারবে? মনি আর আসে না। ভয় লাগছিলো মনির জন্য। ছোট কাকু খুব রাগী। ঈশ কেন যে মেলায় গেলাম। মনি আর আসলো না রাতে।
সেই রাতের পর থেকে মনি কে আর দেখি নাই আমি। শুধু শুনেছিলাম মালী কাকুর কাছে যে ছোট কাকু মনি কে গ্রাম থেকে বের করে দিয়েছিলেন। এটা নাকি অল্পের উপর দিয়ে গিয়েছে। দাদা জানলে নাকি চাবুক দিয়ে পিটিয়ে মেরেই ফেলা হত মনি কে ……।
সেদিনের পর থেকে মনির অভাব খুব বোধ করতাম। কারন আমার আর কোন বন্ধু ছিল না। স্কুলে সবাই আমার সাথে মিশতে ভয় পেতো। কারন আমি জমিদারের নাতি। সবাই ভয়ে ভয়ে কথা বলতো। জানতো কোন উল্টাপাল্টা হলে ছোটকাকু তার বারো টা বাজিয়ে দিবেন। একমাত্র মনি আমার সাথে কোন চিন্তা ভাবনা ছাড়াই কথা বলতো। কিন্তু সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না। ভুলে গেলাম আমি মনি কে। কিন্তু মনি কি আমাকে ভুলেছে?

ছবিঃ সংগ্রহীত (ডেইলি সান)