একটি পার্সেল

দেখতে দেখতে দুটি বছর পার হয়ে গেল। আজকের এ দিনে আমাদের জন্য লড়া অধিকার কর্মীদের অর্জিত সকল অর্জন, প্রতিটি মাইলফলক বিপদের মুখে ধাবিত।

না, বিপদের মুখে বলব না। আমাদেরতো কোন অস্তিত্বই ছিলো না।  ”এসব পশ্চিমা সংস্কৃতির আমাদের বাংলায় ঠাই নেই। এটি একটি মুসলিম দেশ, এদেশে লুত এর বংশধরকে জনসমক্ষে কুপিয়ে মারা হবে”– এসব হচ্ছে বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু জনগনের মন্তব্য। কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছেও। কুপিয়ে শুধুমাত্র আমাদের প্রিয় এবং রক্তের সম্পর্কের চেয়েও আপন ভাই এর মত একটি মানুষকে হত্যা করা হয়নি, সেদিন জুলহায ও তনয় এর সাথে নিহত হয়েছে আমাদের সমপ্রেমিদের সমমর্যাদার আশা, নিজ পরিচয়ে এ সমাজে বাস করার ইচ্ছে।

জুলহাজ ও তনয় এর সাথে সেই পরিণতিই হয়েছে যেটি বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অভিমত ছিল সমপ্রেমিদের (সংখ্যাগুরুর ভাষ্যমতে কামে আসক্ত সমকামী) প্রতি। কুপিয়েই হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু নিজের জীবনের বিসর্জন দিয়ে তাঁরা দুজন জানান দিয়ে গেছেন যে আমাদের অস্তিত্ব আছে। সংখ্যালঘু ঠিকই, কিন্তু আমরা তোমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠদের মাঝেই বিদ্যমান। কিন্তু, আমাদের কেউই এমন উপায়ে আমাদের সমপ্রেমী জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বের প্রমাণ দিতে চায়নি এটা অসন্দিগ্ধ।

জুলহাজ-তনয় ভাইয়া, শুনেছি তোমাদের ঘাতক একটি পার্সেল পৌঁছানোর ভাণ করে ঘরে ঢুকে নির্মম ভাবে তোমাদের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। আমি ভাবি, এই পার্সেল তোমরা নিজেরাই আমাদেরকে বিপদের হাত থেকে রক্ষা করার সময় নিজেদের জন্য তৈরি করোনি তো?

আমার এই ভাবনার কারণ জানতে হলে সেই কালরাত্রির প্রায় দশ দিন আগে বাংলা বর্ষ ১৪২৩ এর পহেলা বৈশাখে যেতে হবে। সেদিন চারুকলার মঙ্গল-শোভাযাত্রার মধ্যখানে আমাদের ভালোবাসা ও বৈচিত্র্য উদযাপনের ছয় রঙ এর শোভাযাত্রার আয়োজনও বাতিল করা হয়েছিল গুটিকয়েক লোকের হুমকির মুখে, যারা সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর মনোভাব বাস্তবায়ন করছিলো।

তাদের হুমকির মুখে আমাদের রূপবান রংধনু যাত্রার আয়োজন বাতিল করা হলেও বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমরা গিয়েছিলাম নতুন বছরের মঙ্গল শোভাযাত্রার অংশ হতে।

কিন্তু সেটাই আমাদের কাল হলো। পহেলা বৈশাখের কিছুদিন আগে আমার নিজের এবং অন্যান্য কিছু বন্ধুর ছবি দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানারকম হুমকি আর উস্কানিমূলক পোস্ট দেয়া হচ্ছিল। কিন্তু তাদের এই হুমকি যে আসল জীবন নাশের কারণে পরিণত হবে তা ছিল অকল্পনীয়।

পহেলা বৈশাখে বাংলাদেশ পুলিশ আমাদের পাঁচ জনকে ধরে নিয়ে যায় মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণের অপরাধে। যে মুহুর্তে আমাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছিলো, সময় স্বল্পতা ও বিপদের তাড়নায় যত জলদি সম্ভব নিজের বাবা-মা এর নাম্বার ফোন থেকে মুছে জুলহাজ ভাইয়ার নাম্বার আব্বু নামে সেভ করলাম এবং অল্প এক লাইনে ঘটনার বিবরণ দিয়ে জুলহাজ ভাইয়াকে টেক্সট করলাম। সাথে সাথে ফিরতি এসএমএস এ জুলহাজ ভাইয়া লিখেছিল, “we are on our way”।

সেদিন আপনি পারতেন আমাদের এড়িয়ে যেতে। এড়িয়ে গেলে হয়তো প্রায়  দশদিন পর আপনাদের জীবনের উপর এই আঘাত আসতো না। কিন্তু আপনি ও তনয় আপনাদের জীবনের তোয়াক্কা না করে আমাদের উদ্ধারের জন্যে পুরোটা দিন লড়াই করে গিয়েছিলেন।

রূপবানের সাথে তখন আমি ছিলাম মাত্র এক বছর। কি হত আমার এই বিপদের ডাকে সাড়া না দিলে? যখন পুলিশ আমাদেরকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, আপনি তো নিজের বাসায় নিরাপদেই ছিলেন। কেন ফিরে এলেন পুলিশ স্টেশনে আমাদের উদ্ধার করতে? কেন আমাদের বিপদ দূর করতে গিয়ে অর্ডার দিয়ে আসলেন নিজের মৃত্যু পার্সেলের?

ভাবনা আসে, যে পার্সেলে করে ওরা নিয়ে এসেছিল আপনাদের চামড়া, মাংস, অস্থি, হাড় ভেদ করে নির্মম হত্যার যন্ত্রণা, সেটি আমাকে বাঁচানোর জন্য আপনারা নিজেরাই ধানমন্ডির ঠিকানায় পাঠাননি তো?

জীবনে যত দিন নিঃশ্বাস ফেলব প্রতিটি নিঃশ্বাসে জুলহাজ, তনয় ও অন্যান্য রূপবান পরিবারের সকলের কৃতজ্ঞতা স্বীকার করব যারা নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমাকে সেদিন পুলিশের হাত থেকে থেকে রক্ষা করেছে। এ এমন এক ঋণ যার প্রতিদান কোনোদিন সম্ভম নয়।

জীবনে আমি নিশ্চয়ই অনেক পুণ্য এর কোন কাজ করেছি যে কারণে আমি জুলহাজ ও তনয় এর মত মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছি। কিন্তু প্রায়ই  নিজেকে অপরাধী মনে হয়, আমাকে সুরক্ষা প্রদানের জন্যে কেন তাঁরা মৃত্যুকে বরণ করে নিয়েছিল?