ফেরা (পর্ব -৩)


রনি দেখতে খুব সুন্দর ছিল। প্রথম যেদিন রনি কে দেখি সেদিন সারাটা ক্লাস কিছুক্ষণ পর পর রনির দিকে তাকাচ্ছিলাম। আমি ভেবেছিলাম রনি নিজে থেকে আমার সাথে বন্ধুত্ব করবে। সবাই তাই করে। কারন আমি জমিদারের নাতি। কিন্তু কিসের কি। রনি আমাকে দেখেও না দেখার ভান করে। তার ইতোমধ্যে বন্ধুও হয়ে গিয়েছে। আমার ওহমে লাগলো। আমার প্রচণ্ড রাগ হচ্ছিলো রনির উপর। কেন রনি নিজে থেকে আমার সাথে কথা বলবে না?
সেদিন বাড়ি যাওয়ার পথে দেখি রনি তার চ্যালা দের নিয়ে বিড়ি খাচ্ছে। আমি ক্লাস মনিটর । কেউ বিড়ি সিগারেট খেলে নালিশ করার নিয়ম। আমি ভাবলাম রনি কে টাইট দেয়ার উপায় পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু নালিশ করা কি উচিৎ হবে? দোটানায় ভুগতে লাগলাম। শেষ পর্যন্ত প্রধান শিক্ষকের কাছে গিয়ে নালিশ করে আসলাম।
স্যার রনি আর তার চ্যালাদের ডেকে নিয়ে গেলেন। ভিতরে কি হল জানি না। কিছুক্ষণ পর রনি চোখ মুখ লাল করে বের হয়ে আসলো। সারাটা ক্লাস সে মাথা নিচু করে বসে থাকলো। আমি বুঝতে পারলাম ভিতরে ভিতরে সে ফুঁসছে। আমার খারাপ লাগছিল। আর কোন দিন রনির সাথে বন্ধুত্ব হবে না তা বুঝে গেলাম। কেন যে নালিশ করলাম!
আমি একটা ব্যাপার ভুলে গিয়েছিলাম রনি বাচ্চু সাহেবের শ্যালক। আর সম্পদ আর ক্ষমতার দিক দিয়ে বাচ্চু সাহেব এখন দাদারও উপরে। দাদার এখন শুধু সম্মান টাই রয়েছে। ক্ষমতা বা সম্পত্তি তেমন কিছুই নেই।

পরের দিনও রনি কিছু বলল না । চুপ করে বসে রইলো। ঘটনা ঘটলো টিফিন টাইমে। আমি মাঠে গেলাম খেলতে। ক্লাস পুরো ফাঁকা। এই ফাঁকে আমার বই আর খাতা গুলো ইচ্ছে মত ছিঁড়া হল। ক্লাসে এসে আমার মাথায় যেন বাজ পড়লো । আমি স্বপ্নেও ভাবি নাই বই গুলো ছিঁড়বে কেউ। অধিক শোকে পাথর হয়ে গেলাম। আমি বুঝলাম কে ছিঁড়েছে। আমি নালিশ করলাম না। ঠিক করলাম ছোট কাকু কে যেয়ে বলবো। উনি ব্যবস্থা নিবেন।
কাকু সব কথা শুনলেন। শুধু বললেন নতুন বই কিনে দিবেন। আমি খুব অবাক হলাম। এর আগে নালিশ করলে সাথে সাথে কাকু ব্যবস্থা নিতেন। আর এইবার এতো বড় একটা অপরাধ করেও রনি পার পেয়ে গেলো? কিন্তু আমি একবারও ভাবি নাই কাকু এমন ব্যবস্থা নিবেন যাতে আমাদের পরিবার ২ টা চিরস্থায়ী শত্রু হয়ে যাবে।
কাকু রাতের আঁধারে বাচ্চু সাহেবের বজরা পুড়িয়ে দিলেন। বুঝিয়ে দিয়ে আসলেন জমিদারের নাতির সাথে পাল্লা দিলে কি হয়। এদিকে বাচ্চু সাহেব ছেড়ে দেয়ার পাত্র না। তিনি রাজনৈতিক ভাবে অনেক ক্ষমতা সম্পন্ন। আগামী ক্ষমতাশীল দলের হয়ে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দাঁড়াবেন। আমি দেখলাম এইভাবে চলতে থাকলে শত্রুতা শেষ হবে না। ছোট কাকু জেলে গেলে মেজো কাকু বা দাদু কি বাচ্চু সাহেব কে ছেড়ে দিবেন না। জনম জনম চলতেই থাকবে প্রতিশোধ। আমি এই সমস্যার সূচনা করেছি। আমাকেই শেষ করতে হবে। আমি ঠিক করলাম রনির সাথে কথা বলবো। তিনি পুলিশের কাছে ছোট কাকুর বিরুদ্ধে ডায়রি করলেন।
বজরা পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনায় আমি ভয় পেয়ে গেলাম। সামান্য এই ঘটনায় এত বড় ঘটনা হবে ভাবি নাই। আসলে বাচ্চু সাহেবের উপর ছোট কাকুর ব্যবসা সংক্রান্ত কারনে আগেই রাগ ছিল। সেই ঝাল তিনি ঝেড়েছেন।

রনি কে একা পাওয়াই মুশকিল। সারা দিন তার চ্যালারা তাকে ঘিরে থাকে।কিন্তু সুযোগ টা উল্টা তার পক্ষ থেকে আসলো। তার কোন এক চ্যালা কোন এক ফাঁকে আমার ব্যাগে একটা চিরকুট রেখে গিয়েছে।
“আমি তোমার সাথে কিছু জরুরি বিষয় নিয়ে একান্তে কথা বলতে চাই। বিকেল ৫ টায় পুরনো মন্দিরের চত্বরে আমি থাকবো। তুমি পারলে এসো”
চিরকুট পেয়ে আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম। এটা কোন ফাঁদ নয়তো ? আমার ক্ষতি করার জন্য? ভাবলাম একবার ছোট কাকু কে বলবো। পরে ঠিক করলাম গিয়ে দেখি কি বলে? আমার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। পাঁচটা বাজার আগেই আমি মন্দিরে পৌঁছে গেলাম। গিয়ে দেখি রনি আগে থেকেই বসে আছে। আজকে তাকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে।লাল শার্ট পরেছে। আমাকে দেখে রনি একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে বলল-
– ধন্যবাদ আসার জন্য
– ধন্যবাদ দেয়ার কিছু নাই। আমারও নিজের কিছু কথা আছে। সেগুলো বলতে চাই।
– কি কথা?
– আগে তোমার কথা বল
– শুনো একটা ব্যাপার নিয়ে আমি ভাবছি।
– ব্যাপার ?
– তোমার আমার শত্রুতা এখন আমার আর তোমার মাঝে নেই। আমাদের পরিবারে ছড়িয়ে পড়েছে। ভীষণ ভাবে ছড়িয়ে পড়েছে । আমি চাই না তা।এর জন্য আমাদের পদক্ষেপ নেয়া দরকার। কি বল তুমি?
– আমি আর কি বলবো আমার মনের কথাই তুমি বলেছো। এটাই আমি বলতে চেয়েছিলাম।
– তাহলে আমরা ২ জন বন্ধু হয়ে যাই যাতে আমদের একে অপরের পরিবার নিজেদের উপর প্রতিশোধ নেয়া বন্ধ করে।
– কিন্তু শুধু বন্ধু বললেই কি বন্ধু হয়?
– কেন আমরা কি সত্যি সত্যি বন্ধু হতে পারবো না? তুমি চাও না আমার বন্ধুত্ব ?
– আমি চাই । কিন্তু তা তো আমাদের পরিবার কেও দেখাতে হবে।
– মানে?
– মানে বন্ধু সুলভ আচরণ করতে হবে। একসাথে ঘুরাঘুরি, খেলা , একে অপরের বাসায় যাওয়া।
– এটা কোন ব্যাপার? এগুলো সব আমি করবো। তাহলে এখন থেকে আমরা বন্ধু।
আমার খুব আনন্দ লাগছে রনি কে আমি মনে মনে অনেক পছন্দ করি। শেষ পর্যন্ত তার সাথে আমার বন্ধুত্ব হল ।
– হ্যাঁ এখন থেকে আমরা বন্ধু। আসো হাত মেলাই।

সেদিনের পর থেকে সত্যি সত্যি আমরা ঘনিষ্ঠ হতে লাগলাম।অনেকে ভাবতে পারে এইভাবে এরেঞ্জ করে বন্ধুত্ব হয় নাকি? আমাদের হয়েছে। কারন আমরা ২ জন ২ জন কে আগে থেকেই পছন্দ করতাম।কিন্তু ইগোর কারনে বন্ধুত্ব হচ্ছিলো না।আমরা ক্লাসে সব সময় পাশাপাশি বসি। এক সাথে বসে টিফিন খাই। একজন আরেকজনের টিফিন শেয়ার করি। পরীক্ষার খাতাও নকল করি।
ক্লাস শেষে আমরা প্রতিদিন কোথাও না কোথাও ঘুরতে যাই। কখনো নদীর ধারে ঘুরতে যাই। কখনো সরিষা ক্ষেতে বসে সূর্যাস্ত দেখি ।কখনো দীঘির ঘাটে বসে গল্প করি।
একদিন ২ জন স্কুল থেকে বাড়ি যাচ্ছি । বর্ষাকাল আকাশ কালো হয়ে আছে। পা চালিয়ে হাঁটছি আমরা। যেকোনো সময় বৃষ্টি শুরু হবে। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না। মুষলধারে বৃষ্টি নামলো । আমরা দৌড়ে একটা ভাঙ্গা বাড়িতে আশ্রয় নিলাম। পুরো ভিজে গিয়েছি আমি। তাকিয়ে দেখলাম রনির একই অবস্থা। ঠাণ্ডা লাগছে। রনি শার্ট ভিজে শরীরের সাথে লেপটে গিয়েছে। রনির চোখে চোখ পড়লো।রনি আমাকে দেখছে। দেখলাম রনির চোখে মুগ্ধতা এবং কাম হঠাৎ করে রনি জড়িয়ে ধরে আমার ঠোঁটে কামড় দিলো। আমি ঘটনার আকস্মিকতায় কিছু বুঝতে পারছিলাম না। এক পর্যায় নিজেকে আবিষ্কার করলাম রনির বাহুডোরে। আমি রনির ভেজা বুকে চুমু খেলাম। কিন্তু এক পর্যায় আমরা শান্ত হলাম কারন যে কোন মুহূর্তে মানুষ চলে আসতে পারে। সেই দিনের পর থেকে আমাদের জীবনে পরিবর্তন আসলো। কারন আমরা বুঝতে পারলাম আমরা একে অপর কে ভালবাসি।
আমার আর রনির বন্ধুত্বের কথা দুই পরিবার জেনে গেলো । তারাও স্বাভাবিক হলেন। বাচ্চু সাহেব মামলা তুলে নিলেন।

যেদিন প্রথম আমি রনিদের বাসায় থাকতে গেলাম আমাকে যেন রাজকীয় অভ্যর্থনা দেয়া হল। রাতের খাবারে কি নেই? কম পক্ষে ২০-২৫ পদ ছিল।বাচ্চু সাহেব নিজের প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছিলেন
– ভাইয়া আর দিয়েন না। খেতে পারবো না। পেটে আর এক বিন্দু জায়গা নেই।
– কি বল মিয়া। তোমার বড় বাবা আবুল ফজল মৃধা শুনেছিলাম বিশাল একটা পিতলের থালায় ভাত নিয়ে কমপক্ষে ৩০ পদ নিয়ে খেতেন। আর তুমি সেই বাড়ির ছেলে হয়ে এটুকু খেতে পারবা না? আরে নাও নাও…………।
অনেক সময় আদরও অত্যাচার মনে হয়। আমার ক্ষেত্রে তাই মনে হচ্ছিলো। একসময় খাওয়ার পাট চুকলো। আমি আর রনি দোতালায় ছাদের ঘরে গেলাম। ওখানেই থাকবো আজকে রাতে। গ্রামের এক মাত্র পাকা বাড়ি বাচ্চু ভাইয়ের বাড়ি। ছাদে পাটি বিছিয়ে ২ জন আকাশ দেখছি। আকাশ পরিষ্কার অসংখ্য তারা চোখে পড়ছে। আমি মুগ্ধ।
– কি সুন্দর লাগছে রাতের এই আকাশটাকে। তাই না?
– হম।
– আকাশ কে কালো শাড়ি আর তারা গুলো কে চুমকি মনে হচ্ছে
– হম।
– কি হম হম করছো ? কিছু বল
– আমার কাছে তো সব কিছুর থেকে তোমাকেই বেশি সুন্দর লাগছে।

আমি লজ্জা পেয়ে গেলাম।
– তোমার যত বাজে কথা!
– সত্যি
এই বলে রনি আমাকে জড়িয়ে ধরলো। সেদিন আমাদের পরিপূর্ণ মিলন হল।
দুজনেই শান্ত হয়ে শুয়ে আছি। আমার মাথা রনির বুকে। রনি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে ।
– রনি আমরা টেন এ উঠে গেলাম। দেখতে দেখতে এস এস সি চলে আসবে। এর পর তো পড়াশোনা করতে হলে গ্রামের বাইরে যেতে হবে।
– আমরা একই সাথে একই কলেজে ভর্তি হব।
– আমার আর পড়াশোনা হবে কিনা তাই তো জানি না। আর এক কলেজ। আমার চাচারা কেউই ক্লাস এইটের বেশি পড়াশোনা করেন নাই।
– আরে বাদ দাও তো। আগে এস এস সি পরীক্ষা দেই। তারপর এইসব ভাবা যাবে।
আমি ভাবলাম এসব চিন্তা করে এতো সুন্দর রাত নষ্ট করি কেন?
এরপর পরীক্ষা শুরু হল । আমাদের আর স্কুলের বাইরে আর দেখা হল না। এদিকে বড় চাচাও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে দাঁড়াবেন বলে ঠিক করেছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী বাচ্চু সাহেব। নির্বাচন উপলক্ষে বড় চাচা দেদারসে খরচ করছেন। যেভাবেই হোক জিততে হবে।


পরীক্ষা শেষ । অনেকদিন খালার বাসায় যাই না। খালা আমার খুব আপন। ছোট বেলা আমার জন্মের সময় খালাই মায়ের পাশে ছিলেন। প্রথম কোলে তিনি নিয়েছিলেন আমাকে।আমার জন্মের পুরো ৬ মাস খালা মায়ের সাথে ছিলেন। খালার কাছে গেলে কেমন মা মা গন্ধ পাওয়া যায়। অনেক দিন দেখি না খালা কে। ঠিক করলাম খালার বাসা যাবো। তাছাড়া আমার খালাতো ভাই জামালের সাথেও আমার ভাল সম্পর্ক। আমার থেকে ২ বছরের বড় জামাল। খুব ভাল গান গাইতে পারে।
দাদা কে বললাম খালার বাসা যাবো। দাদা এক কথায় রাজি হয়ে গেলেন। নৌকা করে যেতে হয়। প্রায় ২ ঘণ্টা লাগলো। ঘাটে জামাল দাড়িয়ে আছে। জামাল কে দেখি না ৩ বছর। জামাল অনেক সুন্দর হয়ে গিয়েছে। পুরুষালী পিটানো শরীর। দেখলে চোখ ফেরাতে ইচ্ছা করে না। আমি মুগ্ধ চোখে দেখলাম জামাল কে। জামাল আমাকে দেখে হাত নাড়লো। মুখে ভুবন ভুলানো হাসি। জামাল হাত ধরে টেনে তুললো আমাকে।এরপর গল্প করতে করতে খালার বাড়ির দিকে রওনা দিলাম। শুনলাম জামালের গান গাওয়ার কথা। সে নাকি খুব সুন্দর গান গায়। উকিল মুন্সির গানের ২ লাইন শুনিয়ে দিলো আমাকে। এত দরদ দিয়ে গেয়েছে যে আমি মুগ্ধ। জামালের জামালের লম্বা লম্বা চুল কপালে এসে পড়ছিল বার বার। আর সে বার বার চুল সরিয়ে নিচ্ছিলো। দেখতে মজা পাচ্ছিলাম।
খালার বাড়িটা টিনের। চারপাশে গাছপালা। আমার খালু বেঁচে নেই। কিন্তু খালার জমি সম্পত্তি ভালই আছে। খাওয়া পরার অসুবিধা হয় না। আমাকে দেখে খালা আমাকে জড়িয়ে ধরে সে কি কান্না
– এতো দিন পর মনে পড়লো। আমি তো যেতে পারি না বাতের ব্যথায়। তুই তো আসতে পারিস।
আমিও কেমন অপরাধ বোধে ভুগলাম। সেই তো কতদিন পর আসলাম। ইচ্ছা করলেই তো আসতে পারি । তেমন দূরে তো নয়।খালা তো আমাকে এখনো অনেক ভালবাসেন।
জামাল বলল-
– মা ছাড়ো তো ওরে। এতো দূর থেকে আসছে। ওর নিশ্চয় ক্ষুধা লেগেছে।
– হ্যাঁ চল খেতে দেই তোদের ।
খালা অনেক কিছু রান্না করেছেন। আর খালার হাতের রান্না সেইরকম সুস্বাদু। কুমড়া ফুলের বড়া, ঢেঁকিশাক চিংড়ি দিয়ে, মাছের মাথা মুগডাল দিয়ে, লাউ দিয়ে মুরগি আর মাসকলাইয়ের ডাল। তৃপ্তি ভরে খেলাম। বাড়িতে তো রহমত ভাই রান্না করেন। উনি চেষ্টা করেন। কিন্তু কক্ষনই খালার মত এতো ভাল রান্না করতে পারেন না। পারবেনও না। কারন আমার খালার মত রান্নার হাত আর কারো নেই।

বর্ষার মৌসুম। আকাশ কালো হয়ে আছে।বৃষ্টি পড়বে । আমার খুব বের হতে ইচ্ছা করছে। বাসায় থাকতে মন চাইছে না। এদিকে জামাল বের হতে চাইছে না। কারন যে কোন সময় বৃষ্টি নামতে পারে। আমি জিদ ধরলাম বাইরে যাবো। শেষ পর্যন্ত আমার জিদের কাছে জামাল পরাজিত হল। আমাকে নিয়ে বের হল জামাল। গ্রামের দক্ষিণে একটা বিশাল দীঘি আছে। সেখানে সাধারণত মানুষ খুব একটা যায় না। কথিত আছে এই দীঘি তে একটা মেয়ে গোসল করতে নেমে ডুবে গিয়ে মারা গিয়েছিল। তখন থেকেই নাকি প্রায় মেয়েটার অশরীরী আত্মা দীঘির চার পাশে ঘুরাঘুরি করে। গ্রামের মানুষ ভয়ে দীঘি তে নামে না । কিন্তু জামাল ভয় পায় না। সে কক্ষনো কোন অশরীরী আত্মার চিহ্ন খুঁজে পায় নাই । জামালের মন খারাপ হলেই দীঘির ঘাটে বসে থাকে।
দীঘির পানি পরিষ্কার টলটল করছে। চার পাশে গাছ পালা।জায়গাটা আসলেই নির্জন।আমরা গল্প করছি আর আমি পুকুরে ঢিল ফেলছি। পানিতে ঢিল পরে ঢেউ তৈরি করছে।তারপর আস্তে আস্তে মিশে যাচ্ছে। জামালের গান গাইতে ইচ্ছা করলো। খালি গলায় গান ধরলো । হাসন রাজার গান।
লোকে বলে বলে রে
ঘর বাড়ি ভালা নাই আমার।
আমি তন্ময় হয়ে শুনছি। কি সুন্দর ভরাট গলা জামালের। কেমন জানি মনে একটা হাহাকার তৈরি করছে। সত্যি তো ঘর বাড়ি দিয়ে কি হবে? একদিন চলে যেতে হবে। যেমন চলে গিয়েছে মা বাবা।আমার চোখ থেকে পানি পরতে লাগলো। জামাল গান তাকিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে।
– কি হয়েছে?
– কিছু হয় নাই। তুমি গাও। তোমার গান শুনতে খুব ভাল লাগছে। আমার অন্তরের অন্তঃস্থলে পৌঁছে গিয়েছে তোমার গানের কথা কথা গুলো। বহুদিন পর মনে পড়লো নশ্বর পৃথিবীর কথা। আমার বাবা মা যেভাবে চলে গিয়েছে আমাকেও তো চলে যেতে হবে।
জামালে আবার গান ধরলো । কিন্তু প্রকৃতি বাঁধ সাধল সঙ্গীত চর্চায়। অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামলো। আমরা দৌরে ঘাট থেকে হয়ে একটা গাছের নিচে দাঁড়ালাম। কিন্তু বৃষ্টি থেকে রক্ষা পেলাম না। পুরো ভিজে গেলাম। আশেপাশে কোন ছাদ নেই যেখানে যেয়ে দাঁড়াবো। হটাত করেই যেন দেবদূতের মত একটা লোক একটি কাঠের ডান্ডির বিশাল ছাতা নিয়ে আবির্ভূত হল।
আরে তোমরা তো পুরো ভিজে গিয়েছ । ছাতার নিচে আসো।
আমরা ২ জন ছাতার নিচে আসলাম। বৃষ্টি তে ভেজার পর থেকেই ঠাণ্ডা লাগছে। কেমন কাঁপছি। কাছেই একটা বাড়ি চোখে পড়লো। আমরা সেই বাড়িতে আশ্রয় নিলাম। বাড়িতে ঢুকেই জামাল শার্ট খুলে ফেললো। পরনে শুধু একটা স্যান্ডোগেঞ্জি।জামাল এর পিটানো শরীর। ফরসা গায়ের রঙ। আমি চোখ ফিরাতে পারছিলাম না। আমার জামাল এর সাথে চোখাচোখি হয়ে গেলো। আমি যা ভাবছি জামালও কি তাই ভাবছে? জামালও কি আমার মত সমকামী। আমি চোখ সরিয়ে নিলাম। কেউ কথা বলছি না। শুনশান নীরবতা। আমার মনে অপরাধ বোধ জাগলো। রনি থাকতে আমি জামাল কে নিয়ে ভাবছি কেন।
জামাল হেসে পরিবেশ স্বাভাবিক করতে চাইল।
কিরে কি ভাবিস? আজকে ফুটবল খেলবো। খেলবি ? কাদার মাঝে ফুটবল খেলতে খুব মজা।
আমি কক্ষনোই ফুটবল খেলি নাই। আমারও খুব উৎসাহ লাগলো ফুটবল খেলার। বৃষ্টি থামলো বাড়ি গেলাম।পুকুরে গোসল করে খেয়ে দেয়ে মাঠে গেলাম খেলতে।
বিশাল মাঠ কিন্তু পানি জমে কাদা হয়ে আছে। জানি আরেকবার গোসল করতে হবে খেলা শেষে। জীর্ণ শীর্ণ একটা চামড়ার বল রয়েছে। কার বাবা জানি ঢাকা থেকে এনেছিল। সব মিলিয়ে ৮ জন। সবাই আমার আর জামালের বয়সী। এই গ্রামেই থাকে। ৪ জন ৪ জন করে দল হল। আমি আর জামাল একই দলে। একজন গোল কিপার আর তিন জন তিন জন করে মাঠে। কিছুক্ষণের মাঝেই আমি ক্লান্ত হয়ে গেলাম। বাকিদের তখনও কিছুই হয় নাই। বুঝলাম এরা খেলে অভ্যস্ত। তাই পারছে। আমি তো আর খেলি না। বাতাসে আর্দ্রতা খুব। ঘামছি।দর দর করে ঘাম পরছে। বলা নেই কওয়া নেই আকাশ মেঘলা হয়ে গেলো। কিছুক্ষণের মাঝে বৃষ্টি। একদম ঝুম বৃষ্টি। বৃষ্টি তে খেলা বন্ধ হল না। উৎসাহ আরও বেড়ে গেলো সবার। আমারো খুব ভাল লাগছে। আগে এইভাবে ভেজা হয় নাই কক্ষনো। সারা গা কাদা লেগে গিয়েছে।সমস্ত শরীর বৃষ্টি তে ভিজা। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। মাগরিবের আযান দিলো। খেলা শেষ হল। সবাই মিলে পুকুর পারে গেলাম গা ধুতে। পুকুরে অনেকক্ষণ দাপাদাপি করে উঠে দেখি বৃষ্টি শেষ। আকাশ মেঘলা তখনও ।এখন বাড়ি যেতে হবে। এশার আযানের সময় হয়ে গিয়েছে। এর বেশি দেরি করলে খালা মার দিবেন। বাড়ি ফিরলাম।আজকের মত আনন্দ খুব কম হয়েছে আমার জীবনে। জামাল জিজ্ঞেস করলো-
– ফুটবল ভাল লাগলো ?
– খুব।
জামালে হেসে দিলো। ওর হাসি এতো সুন্দর । আমি মুগ্ধ হয়ে যাই। খালা খুব বকা দিলেন-
– বৃষ্টির মাঝে খেলতে তোকে কে বলেছে?  তুই কি ওদের মত? তোর জ্বর আসলে তোর দাদা কে আমি কি জবাব দিবো ?
– আরে খালা কিছু হবে না
– জামাল বদমাশ টা কোথায় ? সে তোকে খেলতে নিলো কিভাবে
কিন্তু জামাল বকা খাওয়ার আগেই উধাও হয়ে গিয়েছে। সেইদিন রাতেই আমার আকাশপাতাল জ্বর আসলো। খালা সারা দিন সেবা করলেন। বাজার থেকে এমবিবিএস ডাক্তার আনলেন । ডাক্তার ওষুধ দিলেন। আমি আসতে আসতে সুস্থ হতে লাগলাম। জামাল ,আমি যখন জেগে থাকতাম আমার পাশে বসে থাকতো । জলপট্টি দিতো , গান শুনাতো , গল্প শুনাতো । আমার যাতে খারাপ না লাগে এই জন্য এতো সময় দিতো। কক্ষনো কক্ষনো মুখে তুলে জোর করে খাইয়ে দিতো। আমি খেতে চাইতাম না। আমি কেমন জানি এক সপ্তাহেই জামালের প্রতি কেমন দুর্বল হয়ে গেলাম। জামাল পাশে না থাকলে খুব অস্থির লাগতো। আমার থাকার কথা ছিল তিন দিন। দেখতে দেখতে ৭ দিন হয়ে গেলো। ৭ দিনের মাথায় আমি বিছানা থেকে উঠলাম। জ্বর কমলো। খালা হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। আমি তো শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছি একদম।