সমকামিতার বিবর্তনগত কোনো সুবিধা না থাকলেও কেন তা টিকে গেলো?

-প্রলয়স্রোত

প্রকৃতিতে বিবর্তন ঘটছে। ন্যাচারাল সিলেকশনের মুল কথা হলো, যে কমিউনিটি সবচেয়ে শক্তিশালী এবং প্রকৃতির সাথে মানাতে পারবে, সে টিকে থাকবে, এজন্য অন্য কমিউনিটি মারা খেলে খাক। আবার বিবর্তনের খেলা এমন যে, এই যুদ্ধ শুধুমাত্র কমিউনিটিতে হবে তা নয়; বরং একই কমিউনিটির ভিতরেও হতে পারে। একটু উদাহরণ দেই, প্রথমত হোমো সেপিয়েন্স নামক কমিউনিটিটা যদি দেখি, এটা দুনিয়ার সব কমিউনিটির প্রজাতিকে নিজের পায়ের নীচে বশীভুত করে রেখেছে। এবার এসব বাদ দিয়ে নিজের দেশের কমিউনিটির দিকে তাকাই।

Image Courtesy: www.charismanews.com
Image Courtesy: www.charismanews.com

আমরা কলেজ ইউনিভার্সিটির দিকে তাকালে, আর মনোযোগ দিলে একটা বিষয় কিন্তু ফুটে উঠবে, সেটা হচ্ছে ক্যাম্পাস গুলোর বয়ফ্রেন্ড আর গার্লফ্রেন্ড গুলোর জুটি। একটু খেয়াল করলে দেখবেন, (ড্যাবড্যাব করে তাকাবেন না, একবার চোখের পলক ফেলেই অন্যদিকে তাকাবেন) বফ আর গফের জুটির মধ্যে বফটা (ক্যাম্পাসের অন্য ছেলেদের তুলনায়) তুলনামুলক স্বাস্থ্যবান, নয়তো হ্যান্ডসাম, আর নয়তো ব্যাকগ্রাউন্ডে বাপের অনেক টাকা। বিপরীতটা খাটে গফের ক্ষেত্রেও, সেও দেখতে যথেষ্ট সুশ্রী। এমনটা কেন হয়? আসলে সব জায়গায় যেটা হয়, আমরা সবাই কিছু ক্রাইটেরিয়া চেতন বা অবচেতনভাবে যাই হোক না কেন ফলো করি।

যখন একটা মেয়ে তার বয়ফ্রেন্ড নির্বাচন করছে, তখন সে চিন্তা করে অনেক দূর পর্যন্ত, সে চিন্তা করে যখন সে রাস্তায় বের হবে, তখন বয়ফ্রেন্ডের সাথে বের হলে, শারীরিক ঝামেলা যদি আসে বয়ফ্রেন্ড তাকে নিরাপত্তা দিতে পারবে তো? আর্থিকভাবে কলেজ/ভার্সিটি লাইফে তাকে সাপোর্ট করতে পারবে তো? বান্ধবীমহলে একটা হ্যান্ডসাম ছেলেকে “আমার ও” বলে পরিচয় দিয়ে বান্ধবীদের চোখে একটা ঈর্ষা বা মুগ্ধতার ছায়া দেখতে পারবে তো? এছাড়াও আরো নানাধরনের ক্রাইটেরিয়া তারা ফলো করে। বিপরীত ঘটনাও ঘটে ছেলেদের ক্ষেত্রে। তারাও চায়, তার গার্লফ্রেন্ড একটু দেখতে সুন্দর হোক। এজন্য ক্যাম্পাসের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েদের বয়ফ্রেন্ড জুটে সবার আগে।

কিছুটা রুঢ় শুনালেও বিবর্তনের খেলায় আমরা সবাই এমনই সেলফিস। আমরা চাই, অন্যদের হারিয়ে নিজেরা টিকে থাকতে এবং এ টিকে থাকার জন্য যা যা দরকার, তার মধ্যে সবচেয়ে সর্বোৎকৃষ্ট উপাদানটা বাছাই করতে। বিবর্তনে টিকে থাকার জন্য খুব সরলভাবে অলিখিত নিয়ম হচ্ছে সঙ্গী নির্বাচন করা, নিজে সারাজীবন যা অর্জন করলাম, তা উত্তরাধিকারের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে নিজের বংশের বাত্তি রক্ষা করা। কিন্তু এখানেই একটা কনফিউশন তৈরী হয়, বিষমকামীরা না হয়, বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গী নির্বাচন করে তার জ্ঞান, ভাবনা, তার জিন, তার উত্তরাধিকারের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারছে। কিন্তু প্রাচীনকালে, যখন সমকামিতার জন্য ধর্মীয় শাস্তি বা আইনত শাস্তি ছিল না, ফলে সমকামীদের বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গী নির্বাচন করার তো কোনো প্রয়োজনই ছিল না, তারপরেও কিভাবে তারা টিকে গেল, এত লক্ষ বছরের বিবর্তনের ছাকুঁনিতে?

বিষয়টা একটু ক্লিয়ার করি, ধরেন, আজ থেকে ৭০ হাজার বছর আগের কথা, তখনো হোমো সেপিয়েন্সদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব ঘটে নি। [১] এখন ওদের তো লুত নবীর কথা বলে সমকামিতার চর্চাকে নিষেধ করার কেও ছিল না। ছিল না পেনাল কোডের কথা বলে, যাবজ্জীবন শাস্তি দেওয়ার, বা পাথর মেরে হত্যা করার কোনো বিধান। তাহলে, তারা যদি সমকামিতায় লিপ্ত থেকে বিষমকামী কারো সাথে সঙ্গম নাই করে, তাহলে আজো কিভাবে পিউর হোমো সেক্সুয়াল দেখা যায়? ধর্মীয় বিধান তৈরী করে, সমকামিতাকে ধর্মীয় যাজক কর্তৃক রুখে দেওয়ার অনেক আগেই তো সমকামিতার বিলুপ্ত হয়ে যাবার কথা ছিল। তারপরেও কিভাবে লক্ষ হাজার বছরের বিবর্তনের ফিল্টারে টিকে রয়েছে সমকামিতা?

আজকে এটাই আলোচনার মুখ্য বিষয়।

২০১০ সালে করা গবেষণায় দেখা গেছে যে সমকামী পুরুষরা; তাদের ভ্রাতুষ্পুত্র ও ভাতিজাকে স্নেহ ও তাদের লালন-পালন করার মাধ্যমে; সমকামিতার এই বৈশিষ্ট্য তাদের কাছে ছড়িয়ে দেয়।[৩]

প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা যখন একবার জন্মগ্রহণ করেই ফেললাম, তখন তো আমরা সম্পুর্ণ জেনেটিক কোড নিয়ে জন্মগ্রহণ করেই ফেলেছি। এখন আমার চাচা সমকামী না বিষমকামী, তাতে আমার কী? সহজ বাংলায় আমার জেনেটিক কোডের কী? আসলে, এর উত্তর টা হচ্ছে এরকম; প্রথমত আমরা গড়পড়তায় ২৫ শতাংশ জেনেটিক কোড আত্মীয়ের সাথে শেয়ার করি। [২] অর্থাৎ, আমার চাচা যদি জেনেটিক্যাল কারণে সমকামী হয়, তাহলে তিনি যে উৎস থেকে সমকামী; একই উৎস থেকে, তার ভাতিজারও সমকামী হবার সম্ভাবনা থাকে। এটা ছাড়াও মজার একটা বিষয় আছে (যেটা আজ আমরা ডিটেইলস আলোচনা করব); আর তা হলো, যদি পরিবারে সমকামী চাচা থাকে, তাহলে সে পরিবারে ভাতিজা-ভাতিজীরা বিষমকামী পরিবারের তুলনায় টিকে থাকার লড়াইয়ে বেশি সুবিধা পায়। সমকামী চাচারা এমনকি, তাদের ভাতিজাদের, তাদের বাবা মায়ের থেকেও বেশি কেয়ার করে; এমনটাই দেখা গেছে এই গবেষণায়। [৩] একটু ডিটেইলসে আলোচনা করা যাক।

গবেষণা নিশ্চিত করেছে যে পুরুষ সমকামীতা কিছুটা হলেও বংশগত [৪] – এবং জমজ ভাইয়েরা; সহোদর ভ্রাতৃসুলভ ভাইয়ের তুলনায় সমকামী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা কিভাবে এই জিনটি চিরস্থায়ী হয়ে রইলো তা নিয়ে ধাধাঁর মধ্যে ছিলেন, কারণ সমকামী পুরুষরা সঙ্গমে; বিষমকামীদের মত প্রজনন তো করতে পারবে না। তাহলে কেন তারা বিলুপ্ত হয়নি?

একটি বিষয় আছে, যার নাম “আত্মীয় নির্বাচন প্রকল্প“। সম্ভবত, সমকামীরা জৈবিকভাবেই তাদের ভাই বোনের বা আত্মীয়স্বজনদের সন্তানসন্ততি, পালন করতে আগ্রহী থাকে।
কানাডার লেথব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তনবাদী মনোবিজ্ঞানী পল ভাসে বলেন,

সমকামী পুরুষরা তাদের আত্মীয়দের প্রতি কল্যানকামী হওয়ার মাধ্যমে তার জিন ছড়িয়ে দিতে থাকে।

ভাসি ও তার ছাত্র ডুগ ভান্ডারল্যান; সামোয়ার প্যাসিফিক দ্বীপে ফাফাফাইন নামক পুরুষদের একটি গ্রুপের মধ্যে এই হাইপোথিসিস পরীক্ষা করেছেন। ফাফাফাইনরা জন্মসুত্রে পুরুষ যারা কেবলমাত্র যৌন সহচর হিসাবে পুরুষদের প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং তারা সেই সমাজে সাধারণত একটি স্বতন্ত্র লিঙ্গ শ্রেণী হিসেবে স্বীকৃত। তাদের পুরুষ ও মহিলা কোনো ক্যাটাগরীতেই ফেলা হয় না। ফাফাফাইন সম্বন্ধে জানতে দেখুন [৫]

http://boschenamericansamoa.blogspot.de/2013/04/
চিত্রঃ একজন ফাফাফাইন পুরুষ। সংগ্রহীতঃ http://boschenamericansamoa.blogspot.de/2013/04/

গবেষকরা প্রায় ৩০০ ফাফাফাইন এর উপর এই প্রকল্পটির পরীক্ষা করেছেন; তারা দেখেছেন, যেকোনো সাধারণ পুরুষ বা নারীর তুলনায়; এমনকি সন্তানের মাতা বা পিতার তুলনায়; সন্তানের ফাফাফাইন চাচা; তার ভাতিজার প্রতি বেশি স্নেহপ্রবণ। বিজ্ঞানীরা এই স্বভাবকে এভানকুলার বা ‘চাচার ভালোবাসা’ বলে অভিহিত করেছেন।

ফাফাফাইনরা তাদের ভ্রাতুষ্পুত্র ও ভাতিজার জন্য চিকিৎসা এবং স্কুল ফি দিতে অনেক বেশি আগ্রহী থাকে; এমনটা প্রতিবেদনে দেখা গিয়েছে। ফাফাফাইনরা তাদের হোমওয়ার্ক করে, তাদের গান এবং নাচ শেখায় এবং আরো একটি গবেষণা থেকে নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে যে, ফাফাফাইনরা তাদের তরুণ আত্মীয়ের জন্য বিষমকামী ব্যক্তির তুলনায় অধিক খরচ করে।

ভ্যাসে লাইভসাইন্সকে বলেছেন,

“আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে পুরুষ ও মহিলাদের তুলনায় ফাফাফাইনের ভাতিজার প্রতি ভালোবাসার উল্লেখযোগ্য প্রবণতা রয়েছে।”

গবেষণা থেকে এটা বের হবার বাকি ছিল, ফাফাফাইনরা কী সবার প্রতিই এরকম দয়ালু, নাকি শুধুমাত্র তাদের জিনগত আত্মীয়কেই এতটা ভালোবাসে? ভ্যাসে বলেছেন,

আমরা ভেবেছিলাম, তারা হয়তো সব শিশুকেই এতটা ভালোবাসে, তাই আমরা গবেষণায়; তাদের রক্তের সম্পর্কের আত্মীয় ও জৈবিক ভাবে নয় এমন শিশুদের মধ্যে তুলনা করেছিলাম। আমরা যা পেয়েছিলাম, তা তাৎপর্যমণ্ডিতভাবে ভিন্ন।

এই পার্থক্যটা নিশ্চিতভাবেই বিষমকামী নারী ও পুরুষের তুলনায় ভিন্ন। বিষমকামীরা আত্মীয় ও অনাত্মীয় উভয় শিশুর ক্ষেত্রে প্রায় সমরুপ ভালোবাসা প্রদর্শন করে। গবেষকদের মতে, এই স্বভাবটা হয়তো বিবর্তনীয় সংযোজন।
গবেষকরা তাদের ফলাফল জার্নাল সাইকোলজিক্যাল সায়েন্সে প্রকাশ করেন। ১৯৭০ সালে আত্মীয় নির্বাচনমুলক প্রকল্প প্রথম প্রস্তাব করা হয়। শিকাগো ও ইংল্যান্ডে করা গবেষনায় সমকামী ও বিষমকামী এই আত্মীয়ের প্রতি ভালোবাসা সংক্রান্ত কোনো গুরুত্বপুর্ণ পার্থক্য ধরা পরে নি।

ভ্যাসে বলেছেন,

আমরা ভেবেছিলাম আমরা সামোয়াতে এই গবেষণা করব, তারা অ-পশ্চিমীয় সংস্কৃতি এবং আমরা সেখান থেকে একই রুপ ফলাফল পাব, যা দিয়ে এই তত্ত্বের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিতে পারব। কিন্তু আমরা যে ফলাফল পেলাম, তা আমি প্রথমে বিশ্বাসও করতে পারি নি; আমি তাদের বললাম, চলো এই গবেষণাটা আবার করি, আমরা হয়তো কোনো ভুল করছি। কিন্তু পরবর্তী ফলাফল গুলোও একইরুপ এসেছিল।

ভাসে আরো বলেছেন,

“আমরা ভাবতাম, আমরা আমাদের পরিবারের খুব কাছের, কিন্তু না। সামোয়ানরা তাদের পরিবারকে তার চেয়েও বেশি ভালোবাসে। অধিকন্তু ফাফাফাইনদের মধ্যে সমকামীদের প্রতি কোনো বৈষম্য নেই। যা আমাদের পশ্চিমা সমাজে দেখা যায়। যদি এখানে (পশ্চিমে) কোনো সমকামী তার ভাতিজাকে আদর করতে চায়, তাহলে সেই পরিবার তাকে বাধা দিতে পারে।

ভাসে বলেছেন, তার পরবর্তী লক্ষ্য হলো, অন্য পশ্চিমা সংস্কৃতির মধ্যেও কী একইরুপ ট্রেন্ড দেখা যায় কিনা তা অন্বেষণ করা। তিনি আরো বলেছেন, তিনি মনে করেন না, এই আত্মীয় নির্বাচন প্রকল্প সম্পুর্ণভাবে গে জিনে স্থায়ী হয়, কিন্তু এটা অন্যান্য জৈবিক ফ্যাক্টরের কম্বিনেশনে ভূমিকা রাখে নিশ্চয়ই।

পাঠক হয়তো ভাবছেন, আরে, কিছু জায়গায় তো একই ফলাফল আসে নি। তার কী ব্যাখ্যা দেওয়া যায়? এর ব্যাখ্যা আছে, যেসব জায়গায় একই ফলাফল আসে নি, সেগবেষণা গুলো আধুনিক শহর, শিকাগো, জাপানের মত স্থানে করা হয়েছে। ফলে, সেখানে তারা নিজেদের সমকামী হিসেবে স্বীকার হয়তো করতে পারছে, কিন্তু পরিবারের অন্য সদস্যরা তাদের হাতে, নিজেদের সন্তানদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দিতে এখনো সেকেলে ধারণা পালন করে। এখন যদি চাচা ভাতিজার মধ্যে দুরত্ব তৈরী করে রাখা হয়, তাহলে কিভাবে চাচা তার ভাতিজাদের প্রতি প্রকৃত ভালোবাসার উন্মেষ ঘটাবে? একেই সে সমাজগুলোতে এরকম একই ফলাফল না দেখা যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, বিবিসি ও জার্নাল আর্টিকেলে [২]

তথ্যসুত্রঃ

১) স্যাপিয়েন্স- নোয়া হারারি।

২) http://www.bbc.com/news/magazine-26089486

৩) https://www.uleth.ca/dspace/handle/10133/3159

৪) https://www.livescience.com/7056-mom-genetics-produce-gay-sons.html

৫) https://en.m.wikipedia.org/wiki/Fa%27afafine