না-আউযুবিল্লাহ! এদেশে ওসব হয়না

—উল্কা

যেদিন Universal Periodic Review (2013) এর রিপোর্ট বেরুলো সেদিন একটি অনলাইন পত্রিকায় রিপোর্টটি দেখছিলাম – পররাষ্টমন্ত্রী বলেছেন, “এলজিবিটি-দের নাগরিক ও সাংবিধানিক অধিকার সংরক্ষণ করা হবে। যৌন পরিচয়ের ফলে কেউ সহিংসতা কিংবা বৈষম্যের শিকার হলে তার বিপরীতে সুষ্ঠু ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।” স্বভাবতই এই রিপোর্টের নিচের মন্তব্য গুলোতে নজর দিলাম। মনে হলো এদেশে একটি পারমাণবিক বোমা নিক্ষিপ্ত হলেও হয়ত লোকে এতটা সোচ্চার হবে না কিন্তু ‘সমকামিতা’ প্রসঙ্গে তারা বরাবরই দায়িত্বশীল, আদর্শ ‘মুসলিম ও দেশপ্রেমিক’। মন্তব্যগুলোর মাঝে কয়েকটি এমন ছিল- সমকামিরা রোগী এদের চিকিৎসা দরকার, এদের প্রকাশ্যে পুড়িয়ে মারা হোক, আসতাগফিরুল্লাহ! সব পাপীর দল, ইসলামে সমকামিতা পাপ, দেশটা রসাতলে গেল, এসব খবর ছাপায় কেন ইত্যাদি। তন্মধ্যে একটি মন্তব্যে চোখ আটকে যায়- “বাংলাদেশে গে আছে হয়ত কিন্তু লেসবিয়ান নাই। বাংলাদেশের মেয়েরা ভাল, তারা এসব ভুল পথে যায়না।”

হ্যাঁ, আমার দেশটা বাংলাদেশ। যেখানে রাজনৈতিক কোন্দলে মুড়ি-মুড়কির মত মানুষ মরে আর মশা-মাছির মত গায়েব হয়ে যায়। এমনকি মুক্তিযুদ্ধ এর গৌরব গাঁথায় নারী কেবলই ‘বীরাঙ্গনা ( যে অঙ্গ বীর)’। সবকিছুর পরেও দিব্যি যে যার মত চলে, ‘টু’ শব্দটি করেনা। যেখানে ‘নারী’ আরো স্পষ্ট করলে ‘বিষমকামি নারী’ কে কোনোরুপ মানুষের কাতারেই ফেলা হয়না সেখানে ‘সমকামি নারী’ যে উইপোকার ঢিবিতে গিরগিটির মত লুকিয়ে থাকা ‘প্রাণী’ তা বলার অবকাশ রাখেনা। সুতরাং লোকে এখানের লেসবিয়ানদের তাদের কল্পনায়ও ঠাঁই দেয়না তা খুব বেশী অবাক করে না বরং আরো স্পষ্ট করে দেয় তাদের ভাবনাকে।

২৪ জুলাই, ২০১৩। বিডিনিউজ২৪.কম এ প্রকাশিত হয় “দুই নারীর মালা বদল” শিরোনামে একটি অভূতপূর্ব খবর। যেখানে পূজা ও সানজিদা নামের দুই নারীর প্রেমের টানে পালিয়ে আসা এবং ভাড়া বাড়িতে পরস্পর মালা বিনিময়ের মাধ্যমে ‘বিয়ে’ কিংবা গাঁটছড়া বাঁধার গল্প বলা হয়। কিন্তু পরদিনই নুন আর লংকা মিশিয়ে আনকোরা গল্পটিকে আদ্যোপান্ত বদলে ফেলা হয়। পূজা ও সানজিদার ভালবাসা কে সম্পূর্ণ আড়াল করে সেখানে যুক্ত হয় ‘অপহরণ’ নামক অপরাধ। অপহৃত পূজা (১৬), অপহরনকারী সানজিদা (২১)।

বিস্ময় জাগে, যখন দেখি এসময় সকল ‘মানবতাবাদী, নারীবাদী, সুশীল, মুক্তমনা’-রা ভয়ংকর রকমের নিশ্চুপ থাকেন। কেউ প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেনা। এমনকি পত্রিকায় ফিচার অব্দি বেরোয় না ঐ মেয়ে দুটিকে নিয়ে। ঠিক যেনো কিছু ঘটেইনি। আবারো যে যার মতন যাপিত জীবনকে উপভোগকরণ।
সবার মুখে কুলুপ আঁটার কারনটি অবশ্য স্পষ্ট হয় ক-মাস পরে। শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত একমাত্র বাংলাদেশী ড: ইউনূস উগান্ডায় বলেছিলেন ‘প্রান্তিক যৌনতার মানুষদের অধিকার সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।’ এই মন্তব্যের ফলে ইসলামের ঝান্ডাধারী, দায়িত্বপালনকারী, মহান মুসলিমরা পল্টনে সমাবেশ করে ড: ইউনূসকে নাস্তিক আখ্যায়িত করে ফাঁসির দাবি জানায়! তাই উটকো ঝামেলায় কে জড়াতে চায়! পূজা-সানজিদার ব্যাপার, ওরাই বুঝে নিক। চুলোয় যাক মানবাধিকার, আমরা তো ভালো আছি!

যদিও সংবিধানের ৭(খ), ১৯(১), ২৭ নং অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করা এবং আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিক সমান, সকল নাগরিকের মৌলিক মানবাধিকার এবং সকল ক্ষেত্রে সুবিচার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু একদিকে ধর্মীয় বিশ্বাস, অন্যদিকে ভিক্টোরিয়ান আইন ৩৭৭ ধারা ‘গুদের উপর বিষ ফোঁড়া’ এর মতন চেপে বসেছে। সমকামিতা কে ৩৭৭ ধারার আওতাভুক্ত করা হলেও মামলাগুলো সব দায়ের হয় অপহরণ সংক্রান্ত নয়ত ৫৪ ধারায়। প্রতি বছর সংবিধানের ধারা বদলে যায় আধিপত্যশীল গোষ্ঠীর সুবিধেমতন। কিন্তু ৩৭৭ ধারা যে ভিক্টোরিয়ান বাইবেল। তাকে ধরা-ছোঁয়া কি চাট্টিখানি কথা নাকি! তাই তো পররাষ্ট্র মন্ত্রী বিদেশে দাঁড়িয়ে “এলজিবিটি জনগোষ্ঠীর নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ” এর বুলি আঁওড়ালেও দেশে এসে তা বেমালুম চেঁপে যান। কোনো এক সানজিদা নামক দুষ্টু নারী ভূলিয়ে ভালিয়ে ভ্যাবদা পূজাকে অপহরণ করেছে তাতে সুশীল সমাজের কি হয়েছে? সমকামিতা, সে আবার কি? খায় নাকি গায়ে মাখে? ছেলে-ছেলে, মেয়ে-মেয়েতে প্রেম! না-আউযুবিল্লাহ! বাংলাদেশে ওসব নেই। বাংলাদেশে কোনো লেসবিয়ান নেই। এদেশে ওসব হয়না!

(এই লিখাটি পূর্বে কলকাতার স্যাফো ফর ইক্যুয়ালিটির মাসিক পত্রিকা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল)