কেমন আছ তনয়?

প্রিয় তনয়,

কেমন আছ? তোমাকে অনেকদিন লিখব লিখবো করে শেষ পর্যন্ত লিখতে বসলাম। তুমি খুব চাইতে তোমাকে আমি চিঠি লিখি। কিন্তু সেই একবারই তোমাকে চিঠি লিখেছিলাম, মানে ইমেইল আর কি! আর সেই চিঠি -ই পরবর্তীতে অনেক সম্পর্কের কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আর তোমাকে লিখা হয়নি। এখন অনেক কিছুতেই আক্ষেপ লাগে। তোমার সাথে শেষ ভালোবাসা দিবস পালন করা হয়নি। তখনতো জানতাম না সেটা হবে আমাদের শেষ ভালোবাসা দিবস। আমি আমার অহোমকে প্রাধান্য দিয়ে তোমার সাথে কথা বলিনি। আমার অহোম আর আমাকে ছোঁয় না। তোমার সাথে তোমার শেষ জন্মদিনে রাতে থাকা হলো না, তুমি কয়েকবার করে বলার পরও। তোমার সেই যাবার আগে দেয়া চুমু যে শেষ চুমু হবে সেটা ভাবিনি আর। আরও কেনো চুমু দিলাম না তোমায় সেটা নিয়ে আমার আক্ষেপ। তুমি তোমার জন্মদিনে কেক কাটলে না, আমার আক্ষেপ কেনো তোমাকে জোর করে কেক কাটালাম না। তুমি জন্মসন নিয়ে তুমি অনেক রহস্য করতে পারতে, আমাকে সবসময় ধাঁধায় রাখতে এটা নিয়ে। তোমার জন্মসন আমি ভালো করে দেখেছি তোমার কবরের নামফলকে। জানো, তোমার কবরের চারপাশে যে বেড়া আছে তার রং গোলাপি। তোমার জন্য “আইকনিক” রং। কিন্তূ তুমি লেমন ইয়েলো রং হলে খুশি হতে সেটা আমি জানি।

তুমি বলেছিলে তোমার জন্মদিনের সেরা উপহার ছিল “গেইম অফ থ্রোন্স” এর সিজন ৭। কারন জন্মদিন এপ্রিল ২৪-এ ওটার প্রথম পর্ব প্রচারিত হবে। তোমার আর দেখা হলো না। এপ্রিল ২৫ সন্ধ্যায় যখন জানলাম জুলহাজ ভাইয়ের উপর আক্রমণের খবর, তখন তোমার খবর আমরা কেউ জানতাম না। আমি জানতাম সেদিন তোমার জুলহাজ ভাইয়ের বাসায় যাবার কথা। কিন্তূ আমার মনের ক্ষীণ আশা নিয়ে তোমাকে ফোনের পর ফোন করে গিয়েছি যদি তুমি দেরি করে গিয়ে থাকো কোন কারণে। তুমি ধরোনি। তখন তো জানতাম না সেই ফোন হয়তো তোমার পকেটে ছিল তখন রক্তে মাখা। মানুষ জনকে তখন ফোন দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম। কেউ কিছু বলতে পারলো না। আসলে কেউ আমাকে বলতে পারছিলো না। অবশেষে একজন বলল। তাকে মিথ্যুক মনে হয়েছিলো। অবশেষে আরও একজন বলল। আর পরবর্তী তে খবরে লাইভ এলো। আমার কেমন লেগেছিল মনে নেই। মনে আছে খুব ভয় পেয়েছিলাম। বাসায় জানানোর ভয়ে নিজের রুমেই কাঁদলাম। রাতে খেতে পারলাম না। বার বার মনে হচ্ছিলো তুমি কত খেতে পছন্দ কর, আর তুমি খেতে পারছ না, পরে আছ লাশ হয়ে মাটিতে। আমি ২ সপ্তাহ খেতে পারিনি জানো। একদিন পর অফিসে গেলাম। আমার অফিসের কলিগ আর বস’রা তোমাকে আর জুলহাজ ভাই কে নিয়ে অনেক বাজে মন্তব্য করছিল। সব আমাকে শুনতে হলো। ওদের কথা শুনে মনে হচ্ছিলো তোমরা যেন মানুষ নও। কান্না ঠেকাতে আমাকে টয়লেটে গিয়ে বসে থাকতে হয়েছিলো।

আমি এতো ভীত মানুষ যে তোমার লাশ ঢাকা মেডিকেলের মর্গে পড়েছিল, সেটা জেনেও যেতে পারিনি। তোমার শেষকৃত্যতেও যেতে পারিনি। কেমন মানুষ আমি? আমার নিজেকে খুব অপরাধী মনে হয়েছিলো। নিজেকে অনেক অপরাধী মনে হতো তোমাদের এর চলে যাওয়ার পেছনে। জীবন নাশক মূলক হুমকি গুলো কে কেন আমরা আরও গুরুতর ভাবে নেইনি বলে। তুমি আমার স্বপ্নে আসলে আর বললে আমার কোন দোষ নেই। তোমার মনে আছে কিনা জানি না, তোমাকে আমি আগেও অনেকবার স্বপ্নে দেখেছি যে তুমি মারা যাচ্ছ বা মারা গেছো। তুমি প্রতিবার হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলতে, “হ্যাঁ। আমিতো অনেক তাড়াতাড়ি মারা যাবো”। তখনতো বুঝিনি আসলেই তা সত্যি হয়ে যাবে। তুমি চাইতে অনেক বিখ্যাত হতে একদিন। তুমি বিখ্যাত হয়েছিলো। তুমি আর জুলহাজ ভাই ছিলে জাতীয় দৈনিক আর টিভি চ্যানেল গুলার প্রধান খবর। কিন্তূ তুমি তা দেখে যেতে পারলে না। আম্মু এখনো জানে না। আমার ছোট ভাই কৌশলে খবরের কাগজ আর টিভি থেকে আম্মু কে ভুলিয়ে রাখল কয়েকদিন। তোমার নাম নিয়ে অনেক বিভ্রান্তি ছিল সবখানে। এখন অবশেষে সবাই ঠিক করে নিয়েছে। স্কয়ার হসপিটাল এর সামনে জুলহাজ ভাইয়ের বাসার যে গলি টা দেখা যায়, সেটার সামনে দিয়ে যেতে এখনো আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে, অন্যদিকে ফিরে রাস্তা পার হতে হয় আমার।

ছয়মাস পরে অনেক সাহস করে তোমার বাসায় গিয়েছিলাম। তোমার ছোট মামা সহ সবার সাথে দেখা ও কথা হয়েছে। তোমার ছোট মামা আমাকে অনেক জিজ্ঞাসা করছিলেন, ওনার মনে অনেক প্রশ্ন। উনি জানতে চান কেন তোমাকে অচিরে এভাবে চলে যেতে হল। তোমার মা অনেক কিছুই মানুষকে জানাননি, যা উনি জানতেন। তোমার পরিবার কে আত্মীয়স্বজনরা অন্য চোখে দেখে এখন, তারা বলে তাদের ছেলে নাকি নাস্তিক কর্মকাণ্ড করতো বলে মৃত্যুবরন করেছে জঙ্গিদের হাতে। অনেক বুঝানোর চেষ্টা করেছি তুমি কতো ধর্ম প্রাণ ছিলে কিন্তূ ধর্মান্ধ নও। জানি না তারা হয়তো বুঝেছে, কিন্তূ বাকি সবাইকে কিভাবে বুঝাবে? তোমার সেই ছোট্ট রুমটা এখন খালি পড়ে থাকে। তিনবার গিয়েছিলাম আমি।

সিগারেট খাওয়া তুমি আমাকে শিখিয়েছিলে। এরপর নিজেই আমাকে বাদ দিতে বললে, কারন দর্শালে, সিগারেট খেলে যদি আমি বেশিদিন না বাছি! আমি কিন্তূ লুকিয়ে লুকিয়ে খেতাম। আর এখন আরও খাওয়া বেড়েছে। এখন সিগারেট খেতে গিয়ে মনে হয় তুমি হয়তো দেখছ আর আফসোস করছো। এক এতো রূপ আমি আর কোথাও দেখিনি। তুমি কিভাবে যেন নিজের রূপ পরিবর্তন করে ফেলতে পারতে। এই তুমি এক গোঁফওয়ালা গম্ভীর পুরুষ, এই তুমি হয়ে যাও কোমল পুরুষ, আর এই তুমি আবার হয়ে যেতে পারো নারী। আমি অবাক হতাম অনেক। আর ভাবতাম আমি কতো সৌভাগ্যবান তোমায় পেয়ে। তুমি আমার অনেক “জেন্ডার ভিত্তিক ট্যাবু” ভেঙে দিয়েছো। আমায় ভাবতে শিখিয়েছ অন্য ভাবে। দেখতে শিখিয়েছ নতুন ভাবে।

১৪ই এপ্রিল তুমি ভলান্টিয়ার ও আমাদের বন্ধুদের গ্রেপ্তারের পর পুরোটা সময় পুলিশ স্টেশনে ছিলে। আরও বাকিদের সাথে একসাথে হয়ে ওদের ছাড়িয়ে তবে বাসায় গেলে। তুমি আমার উপর রাগ করেছিলে আমি যাইনি কেনো। বিশ্বাস করো, আমি অনেক ভিতু ও কাপুরুষ। আমি এখনো নিজেকে ক্ষমা করতে পারিনি। এমন একজন ভীতু আর কাপুরুষ কি পারে তোমার যোগ্য হতে? তুমি কি এমন কাউকে চেয়েছিলে?

ভয় হয় একদিন তোমায় না সবাই ভুলে যায়। আমি ভুলবো না আর যাই হোক। গুগোল “স্ট্রিট-ভিউ” তে তোমার ছবিটা এখনো আছে একদম তোমার বাসার সামনে, আমি মাঝে মাঝে খুলে দেখি। মাঝে মাঝে ভাবতে ইচ্ছা করে, হয়তো তুমি আসলে বেঁচে আছো অন্য কোথাও। আমি তো তোমার লাশ দেখিনি আড়, শুধু ভুল করে তোমার মামাতো বোনের ফেবু প্রোফাইল দেখে ফেলেছিলাম, শুয়ে আছো তুমি লাশের খাটে, চুপচাপ নিষ্পাপ মুখ নিয়ে। শুধু এক পলক দেখেছিলাম, আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। দৌড়ে বাথরুমে গিয়ে তবে সবার সামনে থেকে চোখের পানি লুকিয়েছি। যখন ছোট ছিলাম, অনেক কান্না করতাম। চাইতাম, কবে আমি এই ছিঁচকাঁদুনে স্বভাব থেকে রক্ষা পাবো। এরপর অনেকবার কান্না বন্ধ হয়ে গিয়েছে। কিন্তূ তুমি আর জুলহাজ ভাই চলে যাওয়ার পর আর থামার নাম দেখিনা। এখন অভ্যেশ হয়ে গেছে। শুধু লোকারণ্যে থাকলে বাহানা দিয়ে চোখের পানি লুকাতে হয়, এই আর কি! কিন্তূ কাঁদতে এখন আর খারাপ লাগে না, হাল্কা লাগে অনেক। আর কান্নার আবার ছেলে-মেয়ে লিঙ্গ কি? আমরা সবাই-ই তো কাঁদি, কম আর বেশি।

আমাদের দুজনার একসাথে চষে বেড়ানো ঢাকার রাস্তাগুলোতে আর যাওয়া হয়না। ঘর থেকে বের হতে পারিনি তোমরা চলে যাওয়ার এক বছর পর্যন্ত। এখন একটু সাহস হয়েছে। বুকের ভেতর সদা ধুকপুক এখন করে না। শুধু, মাঝে মাঝে পেছনে চোখ চলে যায় দেখার জন্য কেউ কি অনুসরণ করছে কিনা। তুমি কখনো দেশ ছেড়ে জেতে চাইতে না। তোমার কারণে আমিও দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা বাদ দিলাম। তোমারা চলে যাওয়ার পর দেশে আর নিজেদের নিরাপদ ভাবতে পারি না। মানুষ জন দেখলে আমি নিজের মধ্যে সিঁটিয়ে যেতাম। ধর্মের বুলি ইচ্ছামতন বিকৃত করে মানুষকে বলতে/ ব্যবহার করতে শুনলে ভিতরে আমার আগ্নেয়গিরির মতন লাভা উদ্গীরন হতে থাকতো। আশেপাশের সব বকধার্মিক ও তাদের আচরণ আমাকে ধীরে ধীরে মেরে ফেলছিলো। আমি এক ছোট টাইমবোমার মতন ফুসলাতে থাকি। তোমাদের হত্যার প্রতিশোধ আমি বাংলা ছায়াছবির নায়কের মতন নিতে পারবো না জানতাম, আর এই অনুভূতি আমাকে প্রতিনিয়ত দিশেহারা করে দিচ্ছিলো। আমি আমার জীবনটা সাজিয়ে ফেলার পরিকল্পনা করেছিলাম তোমাকে নিয়ে। বিশ্বাস করো, আমি বেঁচে থাকার আশা হারিয়ে ফেলেছিলাম। সারাক্ষণ ভাবতাম, আমি কেন এখনো এই বাতাসে শ্বাস নিচ্ছি, যে বাতাস তোমরা আর পাচ্ছ না? কেনো আমি বেঁচে থাকার জন্য খাবার খাচ্ছি, যে খাবার তোমরা আর খাচ্ছ না! সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম দেশ ছেড়ে দিবো। আমি আর থাকতে পারবো না এখানে। আড়শোলা হয়ে অন্ধকার গর্তে লুকিয়ে থেকে, বুকে সারাক্ষণ মৃত্যু ভয়ের ধুকপুকানি নিয়ে আর কতদিন চলা যায়! বাঁচতে যখন হবে, বাঁচার মতন করে নাহয় একটু বাঁচি। ছেড়ে দিলাম দেশ! কিন্তূ আমি কি আসলে এখনো ভালো আছি? জানি না। তোমাদের  উপর খুব রাগ হয় আমার মাঝে মাঝে। কেনো ফেলে গেলে এভাবে আমাদের? কি দরকার ছিল তোমাদের ভারতের সেই সেমিনারে যোগ দেয়ার জন্য ওইদিন একসাথে হওয়ার? ১৪ ই এপ্রিল এর পর সেই ঐদিন তোমরা একসাথে হলে আর অঘটনটা ঘটলো। তোমার সাথে যেদিন আমার শেষ দেখা হলো, তুমি হুমকি নিয়ে কোন কোথাই আড় বললে না। জিজ্ঞাশা করলে এড়িয়ে গেলে। কেন? আমি আবার ভয় পাব বলে? একটু বলে দেখতে, আমি থেকে যেতাম সেদিন তোমার সাথে রাতে। আমি এখন পরকালে আরও বেশি বিশ্বাস করি। আগেও করতাম, কিন্তূ এখন আমার গোঁয়ার ধরেছে, থাকতেই হবে আরেকটা জীবন, নাহলে তোমাদের সাথে আর দেখা হবেই না।

তুমি বলতে, তোমার যদি কিছু হয় বা আমাদের যদি আর সম্পর্ক না থাকে কোনো কারণে তাহলে আমি নাকি বাবা-মা এর পছন্দে কোনো মেয়েকে বিয়ে করে সংসার করবো! না, আমি কিন্তূ তা করিনি। আর করবোও না কখনো। জানো, শিল্পকলাতে আর যাওয়া হয় না, দেশে থাকাকালীন যদি পাশ দিয়ে যেতামও, অনেক কষ্টে কান্না আটকে রেখে রাস্তা পার হয়ে যেতাম। তোমার “সোনাইমাধব” নাটক আর দেখা হলো না। “কুঞ্জুশ” নাটকে কালা মিয়া’র চরিত্রের বদলি নাট্যকর্মী তারা পেয়ে গেছে। এখন নতুন সেই অভিনেতাকে দিয়ে মঞ্চে নাটকের আসর বসে। সব তার নিজের গতিতে চলছে, শুধু তুমি নেই। তোমার প্রিয় “পিপলস লিটল থিয়েটার” ও হয়তো নতুন কোনও এক শিক্ষক পেয়ে গেছে। তোমার আবেগের এক স্থান ছিল সেই সংগঠন, অথচ কতই না বাধা আর প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে তোমার সংস্লিষ্ঠতা, তুমি একজন সমকামী বলে। তোমার নাটকের দলের মানুষও তোমার বিরোধিতা করেছে। এই শিক্ষিত আর সংস্কৃতমনা মানুষ গুলি যদি এখনো সেই মধ্যযুগীয় ধ্যানধারনা নিয়ে থাকে, আর সমকামিতা ও “পেডোফিলিয়া” এর মধ্যে পার্থক্য না বুঝে, তাহলে কিভাবে আশা করবো আমরা সাধারণ জনতার সচেতনা বা তাদের সহযোগিতা?

তোমার কতো শখ ছিল একবার থাইল্যান্ড এ ঘুরে আসবে। আমরা সবাই মিলে প্ল্যান ও করলাম জুলহাজ ভাইয়ের ৪০তম জন্মদিন আমরা থাইল্যান্ড এ করব সেবার। “নানুর বাসা” থেকে বিশেষ কোটায় গরীব ও মেধাবী ছাত্রদের “বৃত্তি” দিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। হলো না আর সেটা। এরপর আমরা নানুর বাসার অনেকে নিজেরা নিজেরা ঘুরে এসেছি থাইল্যান্ড কতবার, কিন্তূ তোমাদের কথা অনেক মনে পড়েছে প্রতিবার। তোমরা যদি থাকতে তাহলে কতো মজাই না হতো… তোমার মোবাইলটা এখনো নাকি তোমার পরিবার পায়নি হাতে। কতো স্মৃতি আছে আমাদের সেই মোবাইলে, যদি একবার হাতে পেতাম।

তুমি আমাকে শিখিয়েছ কিভাবে নিজের পুরুষত্ব নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় না ভুগতে হয়। একটা ছেলেকে পছন্দ করি বলে তো আমি মেয়ে হয়ে গেলাম না। ছেলে আর মেয়ে’র লিঙ্গভিত্তিক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ব্যবধান আর মেরুকরণ আমাদের সমাজের অন্যতম প্রশ্নবিদ্ধ একটি দিক। তুমি কিভাবে স্বাচ্ছন্দ্যে নিজেকে ২টি স্বত্বায় প্রকাশ করতে পারতে। আমাদের প্রথম একসাথে সমুদ্র দর্শনে তুমি তোমার লাল শাড়ী পরে পতেঙ্গা-কাঠগড় সমুদ্র সৈকতে হাঁটলে। মিথ্যে বলবো না, আমার বুকে কিন্তূ দ্রিম দ্রিম দামামা বাজছিল। ভয়ে ছিলাম এই বুঝি পরিচিত কেউ দেখে ফেলল আমাকে তোমার সাথে। কিন্তু ৫ মিনিট পার হওয়ার পর সকল ভয় কাটিয়ে উঠে আমি স্বাভাবিক হয়ে গেলাম। সেটাই হয়তো ছিল আমাদের জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ বাঁক, যা আমাকে নতুন করে ভাবতে ও দেখতে শিখিয়েছে।

তোমার মতো সুন্দর করে বাংলা বলা আমি খুব কম দেখেছি। তোমার থেকে শিখে আমি এখন সুন্দর উচ্চারণে বাংলা বলতে পারি, বাক্যের মাঝে ইংরেজি একদম কম মেশাই। আগের মতন আর না। কারন আমি দেখেছি তোমাকে কতো সুন্দর করে মাতৃভাষায় কথা বলতে পারতে শুদ্ধ উচ্চারণে। রুপংতির পর আর কোন প্রকাশনা আমরা বের করতে পারিনি। হয়তো তোমরা রাগ করে আছো আমাদের উপর অনেক। কিন্তূ বিশ্বাস করো, আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। কি করবো, এখনো যে ভয় পাই! তোমার আর জুলহাজের মত মৃত্যুকে আমরা এখনো এতো সহজ ভাবে নিতে শিখিনি। যখন হুমকি গুলি আসতো বিভিন্ন দিক থেকে, তুমি আর জুলহাজ ভাই বলতে, কাউকে না বলতে, তাহলে মানুষ ভয় পাবে। যদি জিজ্ঞেস করতাম, আপনাদের ভয় লাগছে না? তোমরা বলতে, কি হবে আর? মরণতো লেখা আছে কপালে, আজকে আর কালকে। এই কারণে জীবন দিতে তোমাদের আপত্তি ছিল না কোনো। তখন বুঝিনি, এটা এটা আসলেই সত্য হয়ে যাবে একদিন এইভাবে! এখন আমরা আর আগের মতন একতাবদ্ধ নই। অনেক কিছু পরিবর্তন হয়ে গেছে তোমরা চলে যাওয়ার পর। অনেকে দেশ ছেড়ে দিয়েছে। আগের মতন ঘন ঘন গেট টুগেদার আর হয় না। মাঝে মাঝে মনে হয় হতাশা থেকে, আমরা হয়তো ১০ বছর পিছিয়ে গেলাম আবার। এখন কে আমাদের সামনে নিয়ে যাবে আবার?

তুমি যেখানে আছো, ভালো থাকো তনয়। অনেক বড় চিঠি হয়ে গেছে। ২ বছরের অনেক না বলা কথা জমে ছিল কিনা, কিন্তু সব বলা শেষ হয়নি এখনো। আরেকটা চিঠি পাবে তুমি শিঘ্রি। আর যদি দেখা হয়, তাহলে সরাসরিই বলা হবে।

ইতি,

সামির হক

পুনশ্চঃ মাঝে মাঝে ভেবে অবাক লাগে, কিভাবে আমাদের দুজনের ছদ্ম নাম প্রায় একই রকম হল!