অবধ্য আলোচনা- ০২: বাংলাদেশের বৈচিত্রময় লিঙ্গ ও যৌন পরিচয়ের জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ে অন্তরায় গুলো কি?

অনেক গুলো হতাশাজনক খবরের মাঝে বেশ কয়েকটি আশাব্যঞ্জক খবর পাচ্ছি বিশ্বজুড়ে যেমন ইকুয়েডরের সর্বোচ্চ আদালত সমলিঙ্গের বিয়ে, আইনগত স্বীকৃতি প্রদান করেছে এবং ব্রাজিল হোমোফোবিয়াকে ফৌজদারী অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এসব নিউজ যতই পড়ি ততই ভাবি বাংলাদেশে কবে এমন খবর শুনবো! তবে আমি বাংলাদেশে নিকট ভবিষ্যৎ-এ এমন কোনো নিউজ পড়বো বা শুনবো বলে মোটেই আশা করি না। রাষ্ট্র যখন দানবিক আচরণ রূপধারণ করে দেশেরআনাচে-কানাচে ত্রাসের একটি পরিবেশ সৃষ্টি করে রেখেছে এবং তার সাথে যুক্ত হয়েছে মৌলবাদীরা তখন আমি কোনো আশাই দেখতে পাইনা। বাংলাদেশের বৈচিত্রময় লিঙ্গ ও যৌন পরিচয়ের জনগোষ্ঠীর কাছে এই নিরাশার অন্ধকারের মাঝে একটি জ্বলজ্বলে উজ্জ্বল আলো জ্বেলে দিতে পারে, তা হলো “পরমতসহিষ্ণুতা”।রাষ্ট্রের কাছে কিছু আশা করি না, আশা করি আমাদের আশেপাশে থাকা মানুষগুলো বৈচিত্রময় লিঙ্গ ও যৌন পরিচয় সম্পর্কে জানবে এবং এই পরিচয়কে সঙ্গে নিয়ে যারা গোপন ভাবে একান্তে বেঁচে আছে, তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল ও শ্রদ্ধাশীল হবেন।

আমার বাবা যেদিন মারা গেলেন, আমি আব্বাকে কবরে নামিয়ে যখন রাতে ঘুমাতে গেলাম, মনে মনে ভাবছিলাম এটা যদি কোনো স্বপ্ন হতো! যদি সকালে উঠে দেখতাম আব্বা-ই আমাকে ডেকে তুলছেন ঘুম থেকে! ইশ্‌ যদি এমন হতো! কিন্তু না, “বাস্তবতা” কঠিন, নির্মম ও সত্য এখানে আমি চোখ বুঝে থাকলেই কোনো বিপদ, কোনো অনাকাঙ্খিত ঘটনাকে এড়ানোর সামান্যতম সুযোগ নেই, বিপদ সামনে দেখে আমি চোখ বুঝে থাকলেই কেউ এসে আমাকে উদ্ধার করে দিয়ে যাবে এমনটা হয় না। বাংলাদেশের লিঙ্গ ও যৌন পরিচয়ের মানুষ গুলোর সামনে যে হুমকি আছে, বিপদ আছে, তা কেবল নিজেদের আচ্ছাদিত করে রেখে, বা কাজ বন্ধ করে রেখে, কিংবা নিজেদের চোখ বন্ধ করে রেখে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। কারন আপনি চোখ বন্ধ করে থাকলে হয়তো, এই জনগোষ্ঠীর বাইরে কেউ, যারা জনগষ্ঠীর জন্য ভাবে, তারা আপনাদের হয়ে কাজ করার চেষ্টা করবে। কিন্তু সেটা আপনাদের জন্য বরে শাপ হয়ে যাবে। আপনাদের আন্দোলন গুলো, কার্যক্রম গুলো ছিন্তাই হয়ে যাবে। তাই চোখ খুলতে হবে, বিপদকে মোকাবেলা করতেই হবে।

প্রথম খন্ডের পাঠক প্রতিক্রিয়ার কিছু উত্তর!

যারা প্রথম খন্ডের লেখাটা পড়ার সময় পেয়েছেন তাদের সকলকে ধন্যবাদ। প্রথম কথা হচ্ছে যারা মন্তব্য করেছেন তাদের সংখ্যা নিতান্তই কম! প্রায় সবাই আমার সাথে সহমত পোষণ করেছেন তাই আক্ষরিক অর্থে আমি মন্তব্য পড়ে খুশি হতে পারিনি। আমি চাচ্ছিলাম কেউ একজন আমার বিপরীতে গিয়ে কিছু লিখুক, যুক্তি দিক,আমি পাল্টা যুক্তি দিবো একটা আলোচনা হবে।

আমাদের এক্টিভিজমের পরিবেশটাকে মুষ্টিমেয় ক’জন মানুষ হাতের মুঠোয় বন্ধ করে রেখেছেন, তাঁরা আমার মতো লেখকের লেখা পড়তেও আগ্রহী নয়, দূরে থাক সেগুলো নিয়ে আলোচনা! তাঁরা সাধারণকে প্রবেশ করতে দিতে চান না, খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন কারা পটেনশিয়াল এক্টিভিস্ট হতে পারেন তাদেরকে। এক কথায় বাংলাদেশের বৈচিত্রময় লিঙ্গ ও যৌন পরিচয়ের মানুষ গুলো আন্দোলন দায়িত্বে কিংবা নেতৃত্বে আসছেন কিছু বাছাই করা মানুষ, আমি মোটেই বলছিনা তারা অযোগ্য কিংবা অদক্ষ। কিন্তু এর মাঝেও যে মুখচোরা কিছু পটেনশিয়াল এক্টিভিস্ট থাকতে পারে সেই বিষয়ে কারো কোনো মাথা ব্যাথা নেই।

অনেকের কাছে মনে হতে পারে লেখক “এটেনশন সিকার” আমাদের এতে মাথা ঘামানোর কিছু নেই। অবশ্যই তা মনে করার পূর্ণ অধিকার আপনার রয়েছে। কিন্তু তাঁরা যদি বুঝতেন তাঁদের এই মৌনব্রতে কারো কোনো উন্নতি সাধিত হবে না! তবে তাঁরা হয়তো তাদের মৌনব্রত ভেঙ্গে হয়তো আমার লেখার বিপক্ষে কিছু বলার থাকলে বলতেন। দুটা গালি হলেও দিয়ে যান না কষ্ট করে! আমরা যারা নিয়মিত সামাজের প্রচলিত নিয়মের বিরুদ্ধে লিখছি, তারা গালি খেয়ে অভ্যস্ত, বিশ্বাস করুন প্রতিউত্তরে একটা গালিও দিবো না। বরং আলোচনার জন্য আপনাকে অনুপ্রাণিত করবো।

 এক্টিভিস্ট বা কর্মী

এখানে এসে আমি গত লেখার একটা ভুলের জন্য ক্ষমা চাচ্ছি আমি “জুলহাজ মান্নান” নামটিকে জুলহাস মান্নান লিখেছি। উনার একান্ত কাছের একজন আমাকে শুধরে দিয়েছেন, এবং বলেছেন জুলহাজ তার নামের বানান জুলহাস করাকে অপছন্দ করতেন।

এখানে এসে একটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করি। প্রায় বছর দুই কি আড়াই বছর আগে, আমাকে একজন নেতৃস্থানীয় এক্টিভিস্ট ফোন করে বললেন অমুক তারিখে একজন অতিথী আসবেন, আমি উপস্থিত থাকতে পারলে জানাতে। আমার তখন চলছিলো মিডটার্ম, পরীক্ষার আগের রাতে আমার ঘুমানোর অভ্যাস নেই, সারারাত পড়ি সকালে গিয়ে পরীক্ষার খাতায় সব উগ্‌রে দিয়ে আসি। তো যে তারিখে আমার যাবার কথা, সেই তারিখেই আমার পরীক্ষা ছিলো, যাক ঘুমকে জলাঞ্জলী দিয়ে আমি গেলাম ঢাকার একটি অভিজাত এলাকায়, আসলেন তাদের অতিথী তারা কথা বললেন নানান বিষয়ে, মাঝে আমিও একটু কথা বলার সুযোগ পেলাম! ভিডিও কলে আরো একজন সম্মানিত ব্যক্তি কথা বললেন, তারপর বাসায় ফিরে আসলাম। বাসায় এসে আমার মনে হলো কেন গেলাম ওখানে! আমার ঘুমানো তো আরো বেশী যৌক্তিক ছিলো। আমার তো কিছু বলার সুযোগ ওখানে নেই! আমি কিভাবে উনাদের সাথে এক্টিভিজম করবো! আমার কথা তো তারা গ্রহন করতে প্রস্তুত নয়!

আমার গত খন্ডেই আমি শ্রেনী বৈষম্যের কথা লিখেছিলাম এখানে আর তা নিয়ে কিছু লিখছি না। এখানে আমি বোঝাতে চাইছি, যারা এক্টিভিজমের সাথে নতুন সম্পৃক্ত হচ্ছে তাদের মতামতকে শোনা তো দূরের কথা অবমূল্যায়ণ করা হচ্ছে। বয়সে যারা অনুজ কিংবা একটু ধীর বুদ্ধি সম্পন্ন এক্টিভিস্ট তাদের কে ওই দূর্বলতার জায়গায় বিবেচনা করে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে, এবার সে ব্যক্তিটি যতই কাজ করুক আর যতই যোগ্য হোক। এমনটা হওয়া তো অন্যায়!

কে একটি আন্দোলনের নেতৃত্ব দিবে তা কিন্তু আগে থেকে যদি নির্ধারণ করা হয়, তবে সেই আন্দোলন অনেকটা গুটিকয়েক মানুষের করতলে থাকা ঘটনায় রূপান্তরিত হয়। এই ক্ষেত্রে বলবো কোটা বিরোধী আন্দোলনের কথা, কে জানতো আগে থেকে যে নূরুলের মতো সাধারন একজন ছাত্র এমন দমনপীড়নের মাঝেও একটি অগ্নিমশাল হয়ে এই অনমনীয় সরকারকে কোটার মতো একটি ইস্যুতে নমনীয় হতে বাধ্য করবে! কেউ না, কিন্তু যদি ওই আন্দোলন কোনো নিধার্রিত নেতা দিয়ে পরিচালনা করা হতো, তবে সবার আগে ওই নেতারই হালুয়া টাইট করতো সরকার। তাই বলছি কি, কে কেমন যোগ্যতা সম্পন্ন তা প্রামনের জন্য তাদের সুযোগ দেয়া উচিত! দয়া করে কেবল মাত্র পছন্দের মানুষকে নিয়ে এক্টিভিজম করা বন্ধ করা হোক। পছন্দের মানুষকে আমি বাদ দিতে বলছি না, বলছি যারা কাজ করতে আগ্রহী,যারা কাজ করার জন্য সুযোগ খুঁজছেন তাদেরকে গ্রহণ করা হোক।

অধিকার আদায়ের দাবীতে বাঁধা গুলো কোথায়?

প্রথম খন্ডের শুরুতেই কিছু সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেছিলাম। সেই বাস্তবতায় বর্তমানে বাংলাদেশে বিদ্যমান কোনো এলজিবিটি সংগঠন তাদের কার্যক্রম আক্ষরিক অর্থে পরিচালনা করতে পারছে না সংগত কারণেই। এবং যেসব বেসরকারী প্রতিষ্ঠান (NGO) তাদের নিয়ে কাজ করছে তারাও চাদরের নীচে থেকে কাজ করছেন বলে প্রয়োজনীয় যে সহযোগিতা প্রয়োজন তা সরবরাহ করতে পারছেন না। কিন্তু একেবারেই যে কেউ কোনো কাজ করছে না তাও কিন্তু ঠিক নয়, কাজ কিছুটা হচ্ছে ঠিকই কিন্তু তা হচ্ছে বিশেষ কিছু লোকজনকে নিয়ে। এবং যা কাজ হচ্ছে তার বেশিরভাগই প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষগুলোকে স্পর্শতো দূরের কথা কোনো ভাবে তাদের অংশগ্রহন ও করার সুযোগ থাকছে না ওই উদ্যোগগুলোতে।

ঐতিহাসিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবেই বাংলাদেশ সঠিক পরিকল্পনার অভাবে ভোগান্তির শিকার হয় , যার কারণে বাংলাদেশের সরকারী ক্ষেত্রগুলো যতটা ব্যর্থ, ততটাই সফল বাংলাদেশের বেসরকারী ক্ষেত্র গুলো। এর প্রধান কারণই হলো যথাযথ পরিকল্পনার অভাব, আর পরিকল্পনা যদি থাকেও তার যথাযথ বাস্তবায়ন করা হয় না বলে সরকারী উদ্যোগ গুলো মুখ থুবড়ে পড়ে। ঠিক একই সমস্যায় আচ্ছন্ন বাংলাদেশের এলজিবিটি সংগঠন গুলো, এদের মাঝে প্রচণ্ড পরিমাণে সম্বন্নয়হীনতা ও পরিকল্পনার অভাব, তার চেয়ে বেশি অভাব হলো কোনো নির্ভরযোগ্য থিংক-ট্যাঙ্ক এই সংগঠনগুলোর নেই। সমকামী জনগোষ্ঠীর মানুষজন সব সময় একটা মানসিক চাপে থাকার কারণে, সংগতই এরা অনেক বেশি স্পর্শকাতর এবং আবেগপ্রবণ হয়। যার প্রভাবটা সাংগঠনিক কাজ করতে আসা মানুষগুলোর মাঝে থেকেই যায়, তারা অধিকাংশ তাদের এই স্পর্শকাতরতা এবং আবেগপ্রবণ মানসিকতার উর্দ্ধে উঠতে পারে না, তাই সংগঠনভিত্তিক কাজগুলোর সিংহভাগই ব্যার্থতায় পর্যবসিত হয়।

উক্ত জনগোষ্ঠীর জন্য যারা কাজ করছেন, তাদের নেই কোনো দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা, নেই কোনো বিকল্প ভাবনা, কিংবা কোনো একটি দাবী আদায় করতে গেলে কৌশল নির্ধারণের ক্ষেত্রেও নেই কোনো সম্বন্নয়। বিক্ষিপ্ত ভাবে একের পর এক কাজ হচ্ছে। হয়তো পরিকল্পনা করে এগুলেই সবকাজে সাফল্য আসবে না, কিন্তু বর্তমানে যে উদ্যোগ গুলো ব্যার্থ হচ্ছে সেগুলোর সাফল্য পাবার হার আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি পাবে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও কর্মপন্থা প্রণয়ের মধ্য দিয়ে।

এলজিবিটি কমিউনিটি নিয়ে এনজিও কিংবা ব্যক্তিপর্যায়ের  যারা কাজ করছেন তারা আসলে জানেই না সম্প্রদায়ভূক্ত জনগোষ্ঠীর কি ধরনের সহায়তা প্রয়োজন,সংগঠন গুলো গোপনে কাজ করতে গিয়ে এতোই আচ্ছাদিত হয়ে গেছে যে, কমিউনিটি ফ্রেন্ডলি সংগঠন ও ব্যক্তিরাও জানে না যে কমিউনিটি ভিত্তিক সংগঠন গুলো কি কাজ করছে, কিভাবে কাজ করছে। ফলে দেখতে পাচ্ছি হুটহাট করে কমিউনিটি ফ্রেন্ডলী কিছু ফেইসবুক পেইজ কিংবা ব্যক্তি, নিজেদের এলজিবিটি কমিউনিটির ত্রাতা হিসেবে আর্বিভূত হয়ে, উপকারের করতে গিয়ে, বিপদে ফেলে দিচ্ছে সবাইকে। তাই কমিউনিটি বেইজড সংগঠন গুলোর উচিত হবে নিজেদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই নিজেদের কার্যক্রম গুলো অন্তত কিছুটা হলেও প্রকাশ করা উচিত। কারন সংগঠন গুলো উদ্যোগ গুলো এতই গোপন আর মুষ্টিমেয় মানুষকে নিয়ে হচ্ছে যে, যারা সম্প্রদায়ভূক্ত তারাই জানে না, তাদের নেতৃস্থানীয় সংগঠন গুলো আসলে কি কাজ করছে!

আর এলজিবিটি সম্প্রদায় ভূক্ত মানুষ গুলোর দাবী আদায়ে সবচেয়ে বড়ো বাঁধা,

০১. নিজেদের চাওয়া কি নিজেরাই জানে না!

০২. কিভাবে, কিসের জন্য কাজ করছে বুঝতেই পারছে না!

০৩. আদৌ তাদের কোনো দাবি আছে নাকি সেটাই নির্ধারণ করতে পারছেনা।

০৪. কোনো দাবী থাকলেও সেটা চাইবার জন্য কি করতে হবে জানে না।

০৫. দাবীদাওয়া উত্থাপনের সাথে সাথে নিজেদের আত্মউন্নয়নের জন্য কোনো উদ্যোগ গ্রহন করা হচ্ছে না।

০৬. টার্গেট অব পপুলেশন নিয়ে কাজ করার কারনে বুঝতেই পারছে না কাজের পরিধি ঠিক কতসংখ্যাক মানুষকে স্পর্শ করছে।

০৭. এনজিও গুলো থেকে কেন সহযোগীতা নিবে, সেই সহযোগীতা নিয়ে কি উন্নয়ন করবে, আর কি করবে না কেউ সুনিশ্চিত করে বলতেই পারে না।

০৮. কমিউনিটি ফ্রেন্ডলী সংগঠন জনগোষ্ঠী থেকে নিজেদের বিছিন্ন করে রাখা হচ্ছে সচেতন ভাবে।

এমন বলতে গেলে লিষ্টের পরিমান বাড়তেই থাকবে, কমবে না বৈকি। বড় কথা হলো আমি সব কিছু একক ভাবে নিরূপন ও করতে পারবো না। এগুলো নির্ধারিত হবে আলোচনা- সমালোচনার মধ্য দিয়ে। কিন্তু সমস্যা হলো আমরা আলোচনা করতেই ভয় পাই! আমাদের আলোচনার “আলো” নেই,সবাই “চনা” নিয়ে দারুণ ব্যস্ত।

থিংক-ট্যাঙ্ক

বলছিলাম থিংক-ট্যাংকের কথা। যে কোনো মুভমেন্টের ক্ষেত্রে সেই মুভমেন্টের ধরন কি হবে, কি ভাবে তারা এগুবে, তাদের লক্ষ্য কি? উদ্দেশ্য কি? কোনো আপদকালীন সময় কি হবে তাদের স্ট্রেটিজি এই বিষয় গুলো কে সমন্বয় করে যারা একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ রেখা দেয় তাদেরকেই থিংক-ট্যাঙ্ক বলা হয়ে থাকে।

বাংলাদেশে যেহেতু এই বৈচিত্রময় লৈঙ্গিক পরিচয়ের মানুষ গুলোর মুভমেন্ট খুব বেশিদিনের না, তাই এদের মাঝে কোনো থিংক-ট্যাঙ্ক এতোদিন ছিলো না। তবে আমার দৃষ্টিতে এখন একটি সময় এসেছে। যারা এতো বছর ধরে এই কমিউনিটির সংগঠন গুলো নিয়ে কাজ করছেন তারা প্রায় তাদের এক্টিভিটির নূন্যতম ১০বছর অতিক্রম করেছেন। নানা চড়াই উতরাই পার করে আমি মনে করি তার একটি ঋদ্ধ অবস্থায় পৌঁছেছেন। হয়তো বাস্তব কারণে কেউ এখন প্রবাসজীবন যাপন করছেন আবার কেউ হয়তো দেশেই আছেন। সেটা কোনো সমস্যা নয়। এখন বাংলাদেশের পরিস্থিতি যাইহোক তারা সবাই মিলে একটি সম্বন্নিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেন নিজস্ব কমিউনিটির মঙ্গলার্থে।

এটা একান্তই আমার ব্যক্তিগত একটি প্রস্তাবনা। তাই আমি আমার মতো করে একটা রূপরেখা তুলে ধরছি। প্রথম কথা হলো

থিংক-ট্যাঙ্ক হিসেবে কাজ করবেন কারা?

ক. এলজিবিটি সম্প্রদায়ভূক্ত সংগঠন গুলোর সাথে যারা দীর্ঘ দিন ধরে কাজ করছেন, কেবল তারাই থিংক-ট্যাঙ্ক হিসেবে কাজ করবেন, এবং তাদের পরিকল্পিত রূপরেখা নিয়ে বিভিন্ন সংগঠন গুলো তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। কোনো সংগঠন যদি মনে করে তারা এর বাইরেও কাজ করবেন, তবে অবশ্যই ওই থিংক-ট্যাঙ্কারদের সাথে পরামর্শ করবেন।

খ. থিংক-ট্যাঙ্ক হিসেবে কেবল তারাই কাজ করবেন যারা বাংলাদেশে স্ব-শরীরে থেকে কাজ করেছেন, কেউ জন্মঅব্দি বাংলাদেশে আসেনি, কিংবা বাংলাদেশে এক্টিভিজমের বাঁধা গুলো নিজে থেকে মোকাবেলা করেনি এমন ব্যক্তিদের পরামর্শ অনেকটা অবাস্তব, কারণ তারা জানেই না যে আসলে কি মোকাবেলা করতে হয় এখানে। হ্যা, সূদূর উন্নত সমাজে বসে অনেকে বাংলাদেশে কাজের সমস্যার গুলো শুনতে পারেন, কিন্তু যিনি বাস্তবে অভিজ্ঞতা গুলো পাননি তিনি কেবল শুনে বাস্তবতাকে বুঝবেন না কখনোই।

গ. থিংক-ট্যাঙ্কার হিসেবে যারা থাকবেন তাদের বয়স বা শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো ইস্যু থাকতে পারে বলে আমি বিশ্বাস করি না, এটা সম্পূর্ণই অভিজ্ঞতার বিষয়। তবে যে ব্যক্তি যেই ক্ষেত্রে অধিক দক্ষ তার মতামত গুলো সেই ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেয়াই শ্রেয়।

ঘ. থিংক-ট্যাঙ্ক হবার জন্য দেশেই থাকতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, এবং যারা থিংক-ট্যাঙ্ক হবেন তাদেরকে সম্মুখ সমরে অংশ নিতেই হবে এমনও কোনো কথা নেই। তারা কেবল কর্মপন্থা নির্ধারণ করবেন।

আরো অনেক গুলো বিষয় সংযুক্ত হতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো তারা কি অভিন্ন ভাবে একসাথে কাজ করতে প্রস্তুত হবে? বলছিলাম তাদের স্পর্শকাতর ও আবেগপ্রবন মানসিকতার কথা। এটা একটা বড় সমস্যা এই কমিউনিটির মানুষগুলোর জন্য। ব্যক্তিগত মতামতের জায়গাগুলোকে সেক্রিফাইস করে, পরমতসহিষ্ণু হয়ে তারা কি পারবে বৃহৎ স্বার্থে একীভূত হয়ে সম্পূর্ণ সম্প্রদায়ের জন্য একক একটি বুদ্ধিমত্তা হিসেবে কাজ করতে? যদি তারা পারে, তবে আমি  বলবো বাংলাদেশে এই মুভমেন্ট একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ-এর দিকে এগিয়ে যাবে। কিন্তু যদি না পরে, তবে তারা আলাদা আলাদা সংগঠন নিয়ে আলাদা আলাদা কাজ করতে করতেই নিঃশেষ হয়ে যাবে, কিন্তু তাতে অদূর ভবিষ্যৎ-এ আদৌ কারো কল্যাণ সাধিত হবে না।

প্রত্যেকটা মানুষের স্ব-স্ব আদর্শের জায়গা থাকবে, একটি মুভমেন্ট পরিচালনা করতে গেলে, সব যে আপনার নিজস্ব আদর্শের সাথে মিলরেখে হবে এমন চাওয়াটা অন্যায়। ছাড় দিতে হবে প্রচুর, আপনার নিজস্ব আর্দশিক জায়গাকে ছাড় দিয়ে, বৃহৎ স্বার্থে সংগঠকদের কাজ করতে হবে। আমার নিজের আদর্শের সাথে সাংঘর্ষিক তাই আমি উমুক সিধান্তে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখবা বলে যদি দায় এড়াতে চান, তবে তা ক্ষতিগ্রস্থ করবে সমগ্র জনগোষ্ঠীকে। আমি চাইছি না কেউ তার নীতি আদর্শকে জলাঞ্জলি দিক, আমি চাইছি সকলে মিলে একটি সমষ্টিগত অর্থে নীতিমালা প্রনয়ণ করুক।

সম্মিলিতি শীর্ষ সংগঠন।

একটা সময় ছিলো যখন হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ সংগঠন গুলোর নেতৃত্ব দিতন কিংবা এক্টিজিমের সাথে জড়িত ছিলেন, সংগঠন ও ছিলো গুটি কয়েক। এখন নানা ফেইসবুক গ্রুপ হিসাব করে অনেক সংগঠন। তাই এই এতো গুলো গ্রুপ /সংগঠনকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য একটি শীর্ষ সংগঠন গড়ে ওঠা প্রয়োজন। যদি এটা আরো পরে করতে চায় সম্প্রদায়ভূক্ত সংগঠন গুলো, তবে সম্বন্নয় আরো বেশি কঠিন হয়ে পড়বে। তাই আমি মনে করি এমন একটি সংগঠন অতিসত্ত্বর গঠন করা উচিত। তবে থিংক-ট্যাঙ্ক যারা হবেন, তারাই আলোচনার মাধ্যমে শীর্ষ সংগঠন সৃষ্টির জন্য কাজ করতে পারেন। আবার বলছি থিংক-ট্যাঙ্ক এক্টিভিজমে জড়িত থাকতেই হবে এমনটা জরুরী না। কাজ করার জন্য আলাদা কর্মী বা এক্টিভিস্ট থাকবে, কাজ তারাই করবে। কিন্তু একটা শীর্ষ সংগঠন থাকবে।

প্রশ্ন উঠতে পারে কি প্রয়োজন শীর্ষ সংগঠনের? আসলে কোনো প্রয়োজন নেই, কিন্তু অনুধাবন করতে গেলে খুউবই প্রয়োজন। কারন বিক্ষিপ্ত ভাবে অনেকেই কাজ করছেন এবং এই কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় অনাকাংখিত কিছু কাজ ও হচ্ছে। এবং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হয়ে ভাগ হয়ে যাবার কারনে, সম্বন্নিত ভাবে চৌকস মেধা গুলোকে এক সাথে পাওয়া যাচ্ছে না। আর কোনো পুরাতন সংগঠনের সাথে কাজ করতে গেলে তার প্রধানদের স্বেচ্ছাচারীতার স্বীকার হয় অন্য সংগঠন বা ব্যক্তি এক্টিভিস্টরা। এতে করে অনুৎসাহিত হয়ে এক্টিভিজমে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন অনেকেই। এমন একটি সংগঠন হলে, ছোট-বড়, নবীন-প্রবীন সব সংগঠনের একটি সমতার জায়গা তৈরি হবে, যেখানে কোনো ব্যক্তি তার নিজের পছন্দকে প্রাধান্য দিয়ে অন্যের মতকে অগ্রাহ্য করা তো দূরের কথা প্রভাবিত ও করতে পারবেন না। এখানে বলার মতো অনেক ইস্যু আছে কিন্তু বিতর্ক এড়ানোর জন্য আমি আর অর্থনৈতিক ইস্যুতে গেলাম না।

বর্তমানে করণীয় কি?

প্রথম কথা হলো করণীয় কি তা ঠিক করার আমি কেউ না। এই করণীয় ঠিক করতে হবে, আমার প্রস্তাবিত সেই সব মানুষদের যাদের আমি থিংক-ট্যাঙ্ক হবার জন্য বলছি। সবচেয়ে বড়কথা হলো বৈচিত্রময় লিঙ্গ  ও যৌন পরিচয়ের একজন মানুষের কোনো দায় নেই যে  সম্প্রদায়ভূক্ত সকল মানুষকে নিয়ে ভাববার দায় সে একাই নিবে। কিংবা এখানে এমন কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনও নেই যাদের উপর সম্পূর্ণ সম্প্রদায় কেবল একক ভাবে নির্ভর করে। তাই প্রথম কথা হলো এই স্বেচ্ছাসেবী কাজের সাথে যারা জড়িত তাদের কে দোষারোপ করে কাঁদা ছোড়াছুঁড়ি খুবই বিব্রতজনক একটা বিষয়। কারন তার কোনো দায় নেই কাজ করার, তবে হ্যা কেউ যদি কাজ করার নাম করে তার ব্যক্তিগত লাভে মনোনিবেশ করে তবে তাকে ছেড়ে কথা বলার কোনো কারণ-ও নেই। এবং তার পাশাপাশি এমন কোনো সংগঠন নেই যাদের উপর সম্পূর্ণ বা অধিকাংশ কমিউনিটি সদস্যরা দায়িত্ব দিয়েছে মুভমেন্ট পরিচালনা কিংবা এক্টিভিজমের। তাই কোনো সংগঠনের এখানে একক ভাবে নিজেকে সুপেরিয়র ভাবার কোনো কারণ নেই। বৈচিত্রময় লিঙ্গ ও যৌন সম্প্রদায়ের প্রত্যেকটি মানুষ প্রতিটি সংগঠন সমান ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কাউকে বাদ দিয়ে কিছু ভাবা উচিত বলে আমি মনে করি না।

তবে গত ২ বছর ধরে আমি বারবার বলছি বর্তমান বাস্তবতায় একটি সার্ভে হওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন, পূর্বের যেই নীড এসেসমেন্ট সার্ভেটি হয়ে ছিলো, তার রেসপনডেন্টের সংখ্যা খুউবই কম, এবং ডাটা এনালাইসিসের জায়গা গুলো দূর্বল। ২৫ এপ্রিলের ঘটনার পরে কমিউনিটির সাথে সম্পৃক্ত মানুষগুলোর কি ধরনের সহায়তা দরকার, এবং কি ভাবে সক্ষমতা নির্মানে কাজ করা যায় এমন অনেক বিষয় নিয়ে একটি সার্ভে হওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। বলতে পারেন এমন জরিপ করতে গিয়ে পূর্বের অভিজ্ঞতা খুবই তিক্ত। কিন্তু আমি বলবো গত ৫বছর আগে যোগাযোগ ব্যবস্থা এখন আরো বেশি উন্নত, আর রক্ষণশীল আবহওয়ার মাঝে থেকে কিভাবে সুনিপুণ ভাবে কাজ করা যায়, গত ৩ বছরের বৈরী আবহাওয়া বৈচিত্রময় লিঙ্গ ও যৌন পরিচয়ের মানুষ গুলো বোধ করি ভালোই উপলব্ধি করতে পেরেছে। তাই সমীক্ষা হওয়া এখন একটা প্রয়োজনীয় বিষয়।

সম্প্রদায়ভূক্ত মানুষ গুলোর টেকসঁই উন্নয়নের লক্ষ্যে যতগুলো গ্রুপ/সংগঠন আছে বর্তমানে, কাউকে একক ভাবে দায়িত্ব না দিয়ে, সবার মাঝে, তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী দায়িত্ব গুলো ভাগ করে দেয়া যেতে পারে, যেমন কেউ কমিউনিটি পিপলদের নিরাপত্তা ও সচেতনার জন্য কাজ করবে। কেউ স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সহযোগিতা দিবে। যারা নিরাপদ পরিবেশে থেকে উচ্চমানে আর্ট ফর্ম নিয়ে কাজ করতে চান তারা সেই কাজ করবে। কথা হলো সব গুলো কাজ কিভাবে সুপরিকল্পিত হয় সেটা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটা কাজের ফলাফল যোগ করে যাতে বৃহৎ এটা ফলাফল আসে সেই দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। সর্বোপরি, আমরা যাই করি আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত আমাদের দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি, এবং পাশাপাশি সমাজে নিজেদের গ্রহনযোগ্যতা তৈরি করা।

জবাবদিহিতা।

আমার লেখা পড়ে অনেকে বিরক্ত হয়ে বলতে পারেন “এতো কথা লিখতে পারলে এসে কাজ গুলা করুক”। যদি কেউ এমন মনে করেন তবে আমি বিনিত ভাবে বলবো, সবাই সব কিছু করে না! আমি লিখতে পারছি তাই লিখছি ( আমার লেখার মান জঘন্য কোনো দ্বিমত নেই আমারও)। তাই বলে আমিই এক্টিভিজমে করবো এমন ভাবা অনুচিত। তবে হ্যা আমি আমার সাধ্যের জায়গা থেকে অবশ্যই কাজ করবো সুযোগ ও সহযোগীতা পেলে। কাজ করার জন্য ভালো কোনো পরিবেশের আশা করি না, পরিবেশ আমি ঠিক করে নিবো। আমি আশা করি আমার সাথে যারা সহমত পোষণ করবেন, তারা ও নিজেদের কে ঠিক আমার চেয়ে আরো বেশি স্বতঃফূর্ত ভাবে বৈচিত্রময় লিঙ্গ ও যৌন পরিচয়ের মানুষ গুলোর জন্য কাজ করবেন।

কেউকে ছোট করা, আঘাত করা, কিংবা কটাক্ষ করার জন্য আমি একটি লাইনও লিখিনি। আমি যা বিশ্বাস করি তাই লিখেছি। এবং লেখাটা আমি নিজের বিবেকের তাড়না থেকে লিখেছি। যদি আমার লেখার কারনে কোনো সংগঠন ব্যক্তি সংক্ষুদ্ধ হয়ে থাকেন তবে যৌক্তিক ভাবে তা ব্যাখ্যা করবেন এবং কোনো কিছু ভুল মনে হলে তবে আমাকে শুধরে দিবেন। আমি অকপট ভাবে দুটি খন্ডে এই লেখাটি লিখেছি নিজের জানামতে কোনো কপটতা রাখিনি। এবং কেবল মাত্র নিজস্ব সম্প্রদায়ের মানুষ গুলো সুন্দর ও সুনিশ্চিত একটি ভবিষ্যৎ-এর কথা মাথায় রেখে লিখেছি।