নেতৃত্ব ছিনতাই

 

৩৭৭-ধারা, পেনাল কোডের এমন একটা ধারা, যার সাথে বাংলাদেশের সমকামীরা কমবেশি সবাই পরিচিত। যখনই ৩৭৭ ধারার কথা আসে সমকামীদের মধ্যে একটা হায় আফোসস শুরু হয়, এই ধারাই বুঝি আমাদের সব হরণ করে নিলো। ইশ্‌ যদি ধারাটাকে ভারতের মতো করে বাংলাদেশও বাতিল করে দিতো! আচ্ছা মনে করুন বাতিল করে দিলো ৩৭৭-ধারা। তারপর? কি হবে? এতে করে কেবল পায়ুকাম অপরাধ নয় বলে আইনগত ভাবে ঘোষনা হবে, কিন্তু তাতে করে সমকামীদের মূল যে সমস্যা “সামাজিক অগ্রহনযোগ্যতা” তার সমাধান হয়ে যাবে? রাতারাতি কোর্টের রায়কে মেনে বাংলাদেশের জনগন সমকামীদের মেনে নিতে শুরু করবে?

আমি আমার পূর্ববর্তী লেখাতেও পরিষ্কার করেছি ৩৭৭-ধারা সম্পর্কে এখানেও উল্লেখ করছি আবার। ব্রিটিশদের তৈরি করা ১৮৬০ সালের সাবস্টেন্টিভ ল “পেনাল কোড” এর ধারা ৩৭৭। এই ধারার শিরোনাম হলো “প্রকৃতিবিরুদ্ধ অপরাধ” যেখানে বলা আছে “কোন ব্যক্তি যদি স্বেচ্ছায় কোন পুরুষ, নারী বা পশুর সাথে প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে যৌন সঙ্গম করে, তবে তাকে আজীবন কারাদণ্ড দেয়া হবে, অথবা বর্ণনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট কালের কারাদণ্ড প্রদান করা হবে যা দশ বছর পর্যন্ত বর্ধিত হতে পারে, এবং এর সাথে নির্দিষ্ট অঙ্কের আর্থিক জরিমানাও দিতে হবে”। আইনের ব্যাখ্যায় বলা আছে “ধারা অনুযায়ী অপরাধ প্রমাণে যৌনসঙ্গমের প্রয়োজনীয় প্রমাণ হিসেবে লিঙ্গ-প্রবেশের প্রমাণ যথেষ্ট হবে”। ৩৭৭ ধারার ব্যাখ্যায় পায়ুসঙ্গমজনিত (Anal Sex) যে কোন যৌথ যৌন কার্যকলাপকে এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একারণে, পরস্পর সম্মতিক্রমে বিপরীতকামীদের(Heterosexual) মুখকাম (Oral Sex) ও পায়ুমৈথুনও উক্ত আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হতে পারে। ধারা ৩৭৭ নিয়ে মোটামুটি সবাই জানেন, তবে জানে না যে বিষয়, তা হলো এই ধারা ৩৭৭ কিন্তু বিপরীতকামী লোকজনের উপর ও সমান ভাবে প্রযোজ্য কিন্তু আমরা তা কেবলই সমকামীদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য বলে ভাবি।

০১.

যে জন্য আজকের এই লেখাটি অবতারণা সেই বিষয়ে আসি এবার। এতক্ষন যা পড়লেন সেটা মাথায় নিয়ে সামনে চলুন। কিছু দিন পরপর কিছু মানুষের মাঝে বেশ একটা উন্মাদনা ওঠে এই ৩৭৭-ধারাকে রীট করা নিয়ে। তার ধারবাহিকতায় ২৫ আগষ্ট ২০১৯-এ একটা খবর সামনে আসলো যে, কেউ একজন বাংলাদেশের এই ৩৭৭ ধারা নিয়ে জনস্বার্থে মামলা করবে। একটু মনোযোগ দিয়ে পড়বেন পাঠক, নতুন মানুষটি রীট করবে না, জনস্বার্থে মামলা করবে। এখানে রীট আর জনস্বার্থে মামলা করা নিয়ে কিছু পার্থক্য আছে যা আমি ধারাবাহিক ভাবে এই লেখাতে ব্যাখ্যা করবো। তার আগে আসি কেন ৩৭৭-ধারা বাতিল নিয়ে এতো আয়োজন?

৩৭৭-ধারা বাতিল হলে অধিকাংশ সমকামীদের ধারনা বর্তমানে যে গোপনীয়তা তাদের রক্ষা করতে হচ্ছে সেটা সম্ভবত আর করতে হবে না, কিংবা তাদের অস্তিত্বকে তারা ঘোষণা করতে পারবে। কিন্তু আসলেই কি চিত্রটা তাই? সেটা বোঝার জন্য আমাদেরকে বুঝতে হবে আমাদের সামাজিক অবস্থা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি সর্বোপরি মানুষের সংবেদনশীলতা কোন পর্যায়ে আছে তাই।

০২.

ধর্ম এই অঞ্চলের মানুষের কাছে আসলে কি? তা নতুন করে ব্যাখ্যা করার কোনো প্রয়োজন নেই, ধর্মান্ধতা আমাদের অস্থিতে মজ্জায় গেঁথে আছে, আর সমকামীরাও এর চাইতে আলাদা, এমন ভাবার কোনো অবকাশ নেই। এই সমকামীদের বিশাল অংশ যারা সমকামী আধিকার চায় তারাই আবার কোনো নাস্তিকতাকে গ্রহন করা কিংবা অন্যকোনো ধর্মীই ইস্যুতে ঠিক গতানুগতিক মানুষের মতো আচরণ করতে থাকে।

বাংলাদেশে সংবিধানে “রাষ্ট্রধর্ম” ইসলাম থাকবে কি থাকবে না এই সংক্রান্ত একটি রীটের নিঃষ্পত্তি হয়েছে, যেখানে উক্ত রীটটি খারিজ করে দিয়েছিলো উচ্চ আদালত। আদালত রীটটি খারিজ করার আগে, “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম চাই” শীর্ষক শিরোনামে ফেইসবুকে মানুষের প্রোফাইল পিকাচারের সাথে একটি ফ্রেমে ভরে গিয়েছিলো ফেইসবুকে। শুক্রবারে জুম্মার নামাজের পর তৌহিদি জনতা, বাইতুল মোকাররমের উত্তর গেটে নিয়মিত আন্দোলন শুরু করে। এর মধ্যেই হাইকোর্ট রীটটি খারিজ করে দেয়, তারপর সব নিউজ পোর্টাল নিউজ করে যার সার কথা ছিলো “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম থাকছে: সিধান্ত আদালতের”, খুউব কম সংখ্যক মিডিয়াই মূল বিষয়টি তুলে ধরে। সেই মূল বিষয়টি হলো আদালত ওই রীট আবেদনটি শুনানি-ই করেনি। মানে রাষ্ট্রধর্ম কেন থাকবে তা নিয়ে যে যুক্তিতর্ক উত্থাপনের বিষয় ছিলো, সেটিই আদালতে হয়নি। আদালত রীট আবদেনটি খারিজের কারন হিসেবে বলেছেন যারা রীট করেছে তারা রীট করার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষ বা যথাযথ পক্ষ নয়, যথাযথ পক্ষের দ্বারা পুনরায় রীটটি করার কথা বলেছে হাইকোর্ট, কিন্তু সেই রীট আর আজ অব্দি হয়নি। আর কেউ সাহসই করেনি, রাষ্ট্রধর্ম ইস্যুতে রীট করে নিজের জীবনের হুমকির মুখে টেনে নিয়ে যেতে।

এছাড়া সংবিধানের ষোড়ষ সংশোধনী বাতিল করে সরকারে রোষানলে পড়া, প্রধান বিচারপতি থাকা অবস্থায় দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়া, সাবেক প্রধানবিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিন্‌হার সময়, সুপ্রিমকোর্টের সামনে “লেডি জাস্টিস”এর ভাস্কর্য স্থাপন করা নিয়ে অবিস্মরণীয় ঘটনাও আমরা ঘটতে দেখেছি। জাতীয় ঈদগাহ্ থেকে লেডি জাস্টিসকে আড়চোখে মুসল্লিরা দেখতে পাবে সেই অযুহাতে, বাংলাদেশের ধর্মীয় সংগঠন গুলো আন্দোলন শুরু করলে, প্রধানমন্ত্রী নিজেও এই “লেডি জাস্টিস”এর ভাস্কর্য নিয়ে ইসলামিক দল গুলোর প্রতি পরোক্ষ ভাবে সমর্থন করেন। যার প্রেক্ষিতে রাতের আঁধারে সেই ভাস্কর্য অপসারন করা হয়েছিলো।

এই দুটি ঘটনা ছাড়াও আরো অনেক ঘটনা আছে যা এই সরকারের এগারো বছরের শাসনকালে ঘটেছে। কিন্তু সব কিছু আমি বাদ দিয়ে এই দুটি ঘটনা উল্লেখ করলাম এটাই বোঝানোর জন্য যে, ধর্মীয় ইস্যুতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতকে দুবার মাথানত করতে হয়েছে। সেই বাস্তবতায় এই সরকারের শাসনকালেই সমকামিতার মতো একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে যদি কোনো মামলা হাইকোর্ট কিংবা সুপ্রিম কোর্টের কাছে যায়, তবে তা যে শুনানীর আগেই খারিজ হয়ে যাবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

০৩.

তারপরও আমি ধরে নিচ্ছি ৩৭৭ ধারা নিয়ে একটি মামলা উচ্চ আদালতে গেলো। সেই ক্ষেত্রে দুটি উপায়ে এই বিষয়ে মামলা উচ্চ আদালতের কাছে যেতে পারে। প্রথমটি বোঝার জন্য ভারতের ৩৭৭-ধারা নিয়ে মামলার দিকে নজর দিলেই হবে। যে কেউ পেনাল কোড-১৮৬০ এর ধারা ৩৭৭-এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টের বরাবর রীট করতে পারে। সেই ক্ষেত্রে রীটকারী পক্ষকে প্রমান করতে হবে যে ৩৭৭-ধারা বাংলাদেশের সংবিধান পরিপন্থী। যদি এমন কোনো রীট কেউ করেন, তবে রীট আবেদনটি শুনানি পর্যন্ত যাবার সম্ভাবনা আছে, তারপর হাইকোর্ট যা ভালো মনে করেন তাই রায় দিবে!

এছাড়া আরো একটি উপায় আছে তা হলো জনস্বার্থে যেকেউ হাইকোর্ট বা সুপ্রীম কোর্টে PIL বা (Public Interest Litigation) ফাইল করতে পারেন। এই বিষয়ে বিষদ আলোচনার পূর্বে আমাদের জানা প্রয়োজন  PIL কি? কে PIL ফাইল করতে পারেন? কার বিরুদ্ধে PIL ফাইল করা যায়? কোন কোর্টের এখতিয়ার আছে PIL শুনানী করার? কোন প্রেক্ষাপটে PIL ফাইল করা যাবে?

PIL কি?

PIL এর পূর্ন রূপ হলো Public Interest Litigation. এই PIL এর অর্থ হলো আদালতে আবেদন পূর্বক, আদালত কর্তৃক জনস্বার্থে, নাগরিকের কোনো অধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করা। PIL বিশ্বের অনেক দেশেই বিদ্যমান আছে এবং বাংলাদেশেও PIL এর সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ সংবিধানের ১০২ (১) অনুচ্ছেদ কোনো নাগরিকের জনস্বার্থে মামলা করার অধিকার সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছে। সংবিধানের ১০২ (১) অনুচ্ছেদ অনুসারে কোনো নাগরিকের আবদেনের প্রেক্ষিতে সংবিধানের তৃতীয় ভাগে বর্ণিত “ মৌলিক অধিকার” (২৬ হতে ৪৭(ক) অনুচ্ছেদ পর্যন্ত)- সমূহের যে কোনো একটি যদি লঙ্ঘিত হয়, তবে সেটাকে বলবৎ করার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষকে আদেশ প্রদান করতে পারনে। (উদাহরণস্বরূপ: আইনের সামনে সাম্যতা, জীবনযাপনের অধিকার এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার এবং আন্দোলন, সমাবেশ, সমিতি, চিন্তাভাবনা এবং বিবেকের স্বাধীনতা ইত্যাদি বিষয়) ।

কখন রীট কে PIL বলে গণ্য করা হবে?

যারা রীট আর PIL এর মাঝে পার্থক্য নিয়ে একটু বিভ্রান্ত হচ্ছেন তাদের জন্য স্পস্ট করে দিচ্ছি, রীট কোনো নাগরিক তার ব্যক্তিস্বার্থকে রক্ষা করার জন্য করতে পারেন, যেকোনো ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠান অথবা সরকারের বিরুদ্ধে। কিন্তু PIL কেবল মাত্র বৃহত্তর জনস্বার্থে করা যাবে, এবং সেটা কেবল সরকারের বিরুদ্ধেই করতে হবে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে করতে গেলেও সরকারকে তার জন্য দায়ী দেখিয়ে তারপর ফাইল করতে হবে PIL।

কে PIL ফাইল করতে পারেন?

প্রচলিত আইনদ্বারা নিষিদ্ধ নয় এমন যেকোনো ব্যক্তি, জনস্বার্থে মামলা করতে পারবেন, উল্লেখ্য যিনি মামলা করবেন, তিনি যদি মামলার বিষয়বস্তু দ্বারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবাবে ক্ষতিগ্রস্থ নাও হন, তাও তিনি PIL ফাইল করতে পারবেন। তবে অবশ্যই যিনি PIL ফাইল করবেন, তাকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে, প্রাপ্তবয়স্ক হতে হবে, এছাড়াও আরো কয়েকটি বিষয় রয়েছে।

কোন প্রেক্ষাপটে PIL ফাইল করা যাবে?

যখন কোনো বৃহত্তর জনস্বার্থ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে, কেবল তখনই PIL দায়ের করা যাবে। উদাহরনস্বরূপ হাজারীবাগের ট্যানারীর কথা ধরতে পারেন, ওইখানে ট্যানারী বর্জ্যের কারনে সম্পূর্ণ এলাকার লোকজনের স্বাস্থ্য ব্যাপক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছিলো কিংবা পুরানো ঢাকা থেকে রাসায়নিক কারখানাগুলো বন্ধের জন্য PIL দায়ের করা যেতে পারে, কারন রাসায়নিক কারখানা থেকে উৎপত্ত অগ্নিকান্ডে ইতোমধ্যে কয়শ মানুষের প্রান গেছে। কিন্তু কথা হলো আদালতকে, PIL দায়েরকারীকে এটা বোঝাতে হবে যে, তার PIL কৃত বিষয়টি বৃহত্তর জনস্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্থ করছে।

কার বিরুদ্ধে PIL দায়ের করা যাবে?

ইতোমধ্যেই একটু বলেছি যে PIL কেবলমাত্র দায়ের করা যাবে সরকারের বিরুদ্ধে দায়ের করা যাবে এবং যদি কোনো ব্যক্তি বা বেসরকারী প্রতিষ্ঠানকে বিরোধী পক্ষ করতে হয়  তবে অবশ্যই সেখানেও রাষ্ট্রপক্ষকে বিরোধী পক্ষ করে, সেই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে “ উত্তরদাতা” পক্ষ হিসেবে রাখা যেতে পারে।

কোন কোর্টের এখতিয়ার আছে PIL-এর শুনানী করার?

PIL সংক্রান্ত মামলার শুনানী করার এখতিয়ার আছে হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্টের।

যদি হাইকোর্টে  PIL দায়ের করা হবে তবে   PIL-এর দুটি কপি আদালতে প্রদান করতে হবে এবং  PIL-এর একটি অনুলিপি অবশ্যই বিরোধীপক্ষকে দিতে হবে।

যদি সুপ্রিমকোর্টে  PIL দায়ের করা হয় তবে  PIL-এর পাঁচটি কপি আদালতে জমা দিতে হবে এবং বিরোধী পক্ষের কাছে প্রত্যেকটি PIL-এর অনুলিপি অগ্রীমভিত্তিতে দিতে হবে। এবং বিরোধী পক্ষকে যে অনুলিপি দেয়া হয়েছে তার প্রমানের কপি সেই  PIL আবেদনের সাথে আদালতে জমা দিতে হবে।

কিভাবে শুনানী শুরু হবে PIL আবেদনের?

PIL-এর শুনানী আদালত চাইলে সরাসরি শুরু করে দিতে পারে, তবে এখানে আরো একটি সুযোগ আছে আদলতের।  আদালত চাইলে PIL-কৃত বিষয়বস্তুটি আসলেই সঠিক কিনা সেটা যাচাই বাচাই করার জন্য একজন কমিশনার নিয়োগ দিতে পারেন।

সর্বোপরী কোনো একটি PIL-কৃত বিষয়ে আদালত শুনানী করবে কি করবে না, তা একান্তই আদালতের বিবেচনামূলক ক্ষমতা।

০৪.

উপরের আলোচনায় যা উল্লেখ করলাম তাই হলো বেসিক প্রক্রিয়ার যার মাধ্যমে ৩৭৭-ধারাকে বাতিলের জন্য আদালতের দ্বারস্থ হওয়া যায়। এখন উপলব্ধি করার বিষয় হলো ৩৭৭ ধারাকে বাতিল করতে পারলেই কি সমকামীদের সকল সমস্যার সামাধান হয়ে যায় কিনা?  এর উত্তর হলো না, ৩৭৭ ধারা হয়তো সমকামীতাকে অপরাধ হিসেবে গন্য করা থেকে বাদ দিতে পারে, কিন্তু তা কখনোই সমাজে সমকামীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের জন্য কাজ করবে না।

আচ্ছা বলেন তো, সমকামীতা নিয়ে কোনো নিউজ হলে সেখানে কতজন মানুষ গিয়ে বলে যে ৩৭৭ ধারা অনুযায়ী সমকামীতা অপরাধ? আইন দিয়ে সমকামীতাকে ব্যাখ্যাই করা হয় না। সমকামীতাকে ব্যাখ্যা করাই হয় ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে। আর সে জাগায় কেউ ৩৭৭ ধারাকে রীট বা PIL করে যদি  আইনের দৃষ্টিতে গ্রহনযোগ্য করেও, তাতেও কি লাভ হবে?

সমকামীদের মধ্যে সাংগঠনিক চর্চার ব্যপক দূর্বলতা আছে। বাংলাদেশে সমকামীতা আক্ষরিক অর্থেই এখনো পর্যন্ত কিছু পার্টি আর সামান্য কিছু কার্যক্রমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, কিন্তু কোনো কর্মপন্থা ঠিক করে এগুনোর মতো অবস্থা এখনো তৈরি তো দূরের কথা, ভাবাই হচ্ছে না কোনো পর্যায় থেকে। ৩৭৭ ধারা চ্যালেঞ্জ করাকে অধিকাংশ সমকামীই সমর্থন করবে, কিন্তু এই অধিকাংশ কারা সেটা আমাদের বুঝতে হবে। এই অধিকাংশ হলেন তারা, যারা “দেখি না কি হয় ধারণা পোষণ করেন”। তারা নিজেরা নিজেদের অধিকার আদায়, কিংবা নিজেদের সত্তাকে গ্রহন করতে এখনো প্রস্তুত না, এই “অধিকাংশ”ই আশায় থাকেন কেউ একজন তাদের ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন, একটা রীট হবে আর রাতারাতি সমকামীতা বাংলাদেশে গ্রহন যোগ্য হয়ে যাবে, এমন কিছুর আশায়। কিন্তু এদের যদি প্রশ্ন করি আপনি কি আপনার নিজের পরিবারের কাছে আপনার যৌন অভিমুখ প্রকাশের মতো আত্মবিশ্বাস রাখেন? এই প্রশ্ন সেই “অধিকাংশ”ই চুপ করে যাবে। কেউ হয়তো কিছু যুক্তিও দেখাবেন, কিন্তু আসল সত্যি নিয়ে কেউ কথা বলবে না। এরা নিজেরাই নিজেদের অধিকার আদায়ে সচেষ্ট না। নিজেদের পরিবারের কাছেও নিজেকে প্রকাশ করে গ্রহনযোগ্য তো দূরের কথা, নিজেদের কে সমকামী জনগোষ্ঠীর কাছে পরিচয় দিতেও কুন্ঠাবোধ করেন।

অবশ্য তার জন্য আমি এই “অধিকাংশ” সমকামীদের দায়ী করতে চাই না। তারা ঠিক মতো গাইড পেলে, আমার বিশ্বাস তাদের এই গতানুগতিক বাঙালী স্বভাবের পরনির্ভশীলতা থেকে অবশ্যই বের হয়ে আসবে। কিন্তু তাদের গাইড করবে কে? আমি বহুবার আমার পূর্ববর্তী লেখা সমূহতে এমন একটি সংগঠন তৈরির প্রস্তাব বারবার করছি, যারা সমকামীদের নিয়ে আক্ষরিক অর্থে প্রয়োগিক বিষয় গুলো নিয়ে কাজ করবে।

০৫.

এ বছর প্রাইড মান্থে হঠাৎ করে একজন প্রবাসী এক্টিভিস্ট, ঢাকার টিএসসি তে একটি গে প্রাইডের ইভেন্ট খুলে বসেন এবং তিনি কেন যেন হঠাৎ করে নিজেকে বাংলাদেশের সমকামীদের ত্রাতা হিসেবে ঘোষনা করেন। আবার এখন শোনা যাচ্ছে প্রবাসে থাকে কোনো ব্যক্তি-গোষ্ঠী ৩৭৭ ধারাকে নিয়ে জনস্বার্থে মামলা করবে। এমন বিক্ষিপ্ত কার্যক্রম কেন হচ্ছে, এবং সমকামী অধিকার আদায় আন্দোলনের “নেতৃত্ব ছিন্তাই” ‌এমন চেষ্টা বারবার কেন হচ্ছে তা আমাদের ভাবতে হবে। কেউ বিক্ষিপ্ত ভাবে কোনো কিছু করছে, তাকে আমাদের ধর্তব্যের মধ্যে আনার কোনো প্রয়োজন নেই ভেবে যদি বাংলাদেশে সমকামী অধিকার আদায় আন্দোনলনের সাথে সম্পৃক্ত থাকা মানুষ গুলো নির্লিপ্ত ভাবে থাকেন, শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্থ তারাই হবেন।

যদি সমকামী জনগোষ্ঠীর কোনো মুখপাত্র না থাকে, তবে হরহামেশাই “নেতৃত্ব ছিন্তাই” এর ঘটনার বারবার ঘটতে থাকবে। একটা সময় দেখা যাবে হুট করে ত্রাতার ভূমিকায় অবর্তিন হওয়া মানুষ গুলো তাদের নিরাপদ অবস্থানে চলে যাবে, কিন্তু বিপন্ন হয়ে যায় বাংলাদেশে সমকামী জনগোষ্ঠী। আমরা তো জঙ্গী সংগঠন গুলোকেও দেখি একটা মুখপাত্র রাখতে। কিন্তু বাংলাদেশের সমকামী সংগঠন গুলো এতোটাই বিশৃঙ্খল ভাবে কাজ করছে যে, তারা এখনো এটা ভাবেই পারছে না যে, অন্তত একটা ওয়েব সাইট হলেও তাদের থাকা উচিত, যা বাংলাদেশের সমকামী আন্দোলনের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করবে।

শেষ কথা.

২০১৭ সালে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে সমকামীদের মৃত্যুদণ্ড বিলোপের পক্ষে বিপক্ষে ৪৭ দেশের মাঝে ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হয় যেখানে ২৭ টি দেশ মৃত্যুদণ্ড বিলোপের পক্ষে আর ১৩টি দেশ মৃত্যুদণ্ড বিলোপের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে । সেই ১৩টি দেশের একটি হলো বাংলাদেশ। উল্লেখ্য ২০১৭ সালে যে সরকার বাংলাদেশে ক্ষমতায় ছিলো ২০১৯ সালে কিন্তু সেই একই সরকার ক্ষমতায় আছে, এবং এই দুই বছরে সরকারের কর্মপন্থার এমন কোনো পরিবর্তন আসেনি যেখানে কেউ আশা করতে পারে যে বাংলাদেশ সরকার সমকামীতার বিষয়ে পক্ষ না নিক, নিরপক্ষে ভূমিকা পালন করবে।

সম্পূর্ণ আলোচনা শেষে বলা যায়, যে বর্তমান বাস্তবতায় সমকামী জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের পদক্ষেপ হিসেবে ৩৭৭ ধারা রীটি বা PIL দায়ের করা সম্পূর্ণ অবাস্তব ও অপরিনামদর্শী একটা সিধান্ধ ছাড়া আর কিছুই না।