নেতৃত্ব ছিনতাই এর সমালোচনার প্রতিউত্তর

জুয়েল ওসমানী দ্যা সন অফ রিয়াজ ওসমানী,  রূপবান ব্লগে আমার লেখার পর একটি প্রতিউত্তর দিয়েছে (https://www.facebook.com/groups/istishongroups/permalink/882539045453604/), যা আমার দৃষ্টিগোচর হয়েছে, সেই লেখায় জুয়েল ব্যক্তিগত আক্রমন আর অপ্রয়োজনী কথাবার্তা ছাড়া দরকারী কথা কমই বলেছে। আমি যে যুক্তিগুলো তুলে ধরেছিলাম আমার পূর্বের লেখায় তার একটিরও যুক্তখন্ডন সে না করে, আমার লেখার দায় রূপবান ব্লগের উপর চাপিয়ে দিয়েছে। ব্লগের বিশেষত্ব কি এটাই যে বোঝে না, সে কেমন এক্টিভিস্ট তা আমার বোধগম্য নয়।  জুয়েল তার লেখায় গ্রাম-শহর, ধনী-গরীবের বিষয়ে একটি অবতারণা করেছে, এটা নিয়ে কেউ নাকি ভাবেছে না, সমস্যা হলো কারো সমালোচনা করতে গেলে তার সম্পর্কে আগে জানতে হবে, লেখক হলে তার লেখা পড়তে হবে, আমি “অবধ্য আলোচনা-০১” (https://roopbaan.org/2019/06/14/%e0%a6%85%e0%a6%ac%e0%a6%a7%e0%a7%8d%e0%a6%af-%e0%a6%86%e0%a6%b2%e0%a7%8b%e0%a6%9a%e0%a6%a8%e0%a6%be-%e0%a7%a6%e0%a7%a7-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%82%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b6/) ও “অবধ্য আলোচনা-০২” (https://roopbaan.org/2019/06/27/%e0%a6%85%e0%a6%ac%e0%a6%a7%e0%a7%8d%e0%a6%af-%e0%a6%86%e0%a6%b2%e0%a7%8b%e0%a6%9a%e0%a6%a8%e0%a6%be-%e0%a7%a6%e0%a7%a8-%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%82%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b6/) শীর্ষক দুখন্ডের লেখায় এই রূপবান ব্লগেই, এইসব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। পড়ে নেয়ার অনুরোধ থাকলো। বাদ বাকি যেসব আজাইরা কথা লিখেছে ওগুলোর উত্তর দেয়ার কোনো প্রয়োজনই মনে করছি না। যাই হোক সে যেসব কথা মিস্টার জুয়েল তুলে ধরেছে, আমি বরং সেগুলোকে খন্ডন করি।

জুয়েল: এখনই সময় বাংলাদেশে ৩৭৭ ধারার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার। কিন্তু অনেক সুশিল মহোদয় হয়তো বলবে না এখন সময় হয় নি! যুক্তি খাড়া করাবে এই সরকারের আমলেই এতগুলো ধর্মীয় উগ্রবাদী কর্মকান্ড হয়ে গেলো যেমন ব্লগার লেখক মুক্তচিন্তকদের উপর হামলা, ভাস্কর্য অপসারণ ইত্যাদি হওয়ার পরেও এ সব আশা করি কি করে। বলা বাহুল্য যে বর্তমান সরকার জঙ্গিবাদ দমনে সাফল্য লাভ করেছে, আন্তর্জাতিক মহলে সরকারের উপরে যথেষ্ট চাপ আছে, কাজেই সে চিন্তা এখন বর্তমানে নেই।

আমার উত্তর: বাংলাদেশ সরকার কিসের চাপে আছে আর্ন্তজাতিক মহলের? জঙ্গীবাদ আর পাবলিক পারসেপশন দুটো আলাদা বিষয়। এখন বিষয় হলো আসলেই সরকার জঙ্গীবাদ দমনে সাফল্য লাভ করেছে? এইবছরেই ঢাকায় পুলিশের উপর জঙ্গীহামলার ৩টি ঘটনা ঘটেছে, প্রত্যেকটির জঙ্গী সংগঠন গুলো স্বীকার ও করেছে। গুলিস্তানে, রাজারবাগে ও খামারবাড়িতে তিনটি পৃথক ঘটনায় পুলিশ এখনো কোনো কুলকিনারাই করতে পারেনি। কথা হলো এই খবর গুলা কি আমরা সবাই জানি। দেখুন বাস্তবতাকে বুঝতে হবে, জঙ্গীবাদ স্তিমিত এমন ভাবাটা পুরোটাই অমূলক। বরং সরকার মিডিয়াকে চরম ভাবে নিয়ন্ত্রণ করার কারনে অনেক নিউজ আপনার সামনেই আসছে। মিডিয়া গুলো ওই ডেঙ্গু, ডিসি নিয়েই পড়ে থাকে। কয়টা মিডিয়া বর্তমানে অনুসন্ধানী রিপোর্ট করে? এই জঙ্গীহামলা গুলো নিয়ে মিডিয়াও কোনো বড়সড় বিশ্লেষন করে নি। তাই জঙ্গী নেই বা দমন হয়ে গেছে বলাটা চরম বোকামী।

জুয়েল: আরেকটা কথা উঠেছে সামাজিক স্বীকৃতি এখনই আসবে কিনা এই আইন বাতিল হলে। আমি বলব “না”! এখন আসবে না পরিবর্তন, পরিবর্তন আসতে বড় একটা ধাপ পার হতে হবে। সমাজ পরিবর্তন করতে আইন বাতিল একটা বড় ভূমিকা রাখবে। কারন আমি মনে করি আইন বাতিল হলেই আইনি অনিরাপদ পরিস্থিতিতে পড়তে হবে না সমকামীদের। এবং সমাজ পরিবর্তন করতে জোরে সরে সভা সেমিনার আওয়াজ তোলার জায়গা তৈরি হবে৷ আর রাষ্ট্র যখন এই আইন দ্বারা সমকামী সম্প্রদায়কে অপরাধী করে রাখছে তখনই সমাজের মানুষের থেকে আইনি হুমকি, ধামকি আর অপমান আসতে শুরু করে। আইনটা না থাকলে কেউ যদি সমকামী সত্ত্বার জন্য কোনো সমকামী ব্যক্তিকে হুমকি, ধামকি এবং অপমান করে আমরা আইনের দ্বারস্থ হতে পারব।

আমার উত্তর: বাংলাদেশে তো নাস্তিক হওয়া কোনো আইনগত অপরাধ না। তো বলুন তো নাস্তিকরা কেমন গ্রহনযোগ্যতা পাচ্ছে? তাদের তো কোনো আইন বাঁধা দিচ্ছে না। কিন্তু হ্যাঁ বাঁধা তারা তারপরও পাচ্ছে। কার কাছে পাচ্ছে বলুন তো? ওই আইন প্রয়োগকারী সংস্থা গুলো কাছ থেকেই। শোনেন আইন আলাদা বিষয় আর চর্চা আলাদা। বাংলাদেশে এমন অনেক আইন আছে, তার নূন্যতম চর্চা এদেশে হয় না। আপনি যদি মনে করেন শুধু আইনি স্বীকৃতি আপনাকে আওয়াজ তোলার জায়গা তৈরি করে দিবে, তবে আমি বলবো বেশি দুরে যাবার প্রয়োজন নেই বাংলাদেশের সামাজিক আন্দোলনের নেতাদের অবস্থাই দেখুন। ওয়াসার পানি নিয়ে জনসচেতনা সৃষ্টি করা মিজানুর রহমানকে পুলিশ নিয়ে গিয়ে হেনস্তা করা হয়েছে কয়েকদিন আগে। অপরাধ তার বাসার ছাড়ে বৃষ্টির পর পানি জমে ছিলো। যদি মানসিক পরিবর্তন না আসে, আপনাকে অনেক আইন দিয়েই হেনস্তা করা বে ধর্মীয় আবেগ থেকে। আরো পরিষ্কার করি, কেরাণীগঞ্জের আটি বাজারের ঘটনায় র‍্যাবের কাছে যথেষ্ট প্রমান ছিলো যে ২৮জন কে গ্রেফতার করেছে তারা সবাই সমকামী, মিডিয়া নিউজ কাভারেজও দিয়েছে সেই ভাবে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে। পেনাল কোডের ৩৭৭ ধারার আওতায় নয়। তাই আইন পাশ হয়ে গেলেই আপনার কথা বলা সহজ হবে এটা অত্যন্ত ভুল ধারনা। আর বাকি থাকে আইনের দ্বারস্থ হওয়া। আমি বাস্তবতার খ্যাতায় আগুন দিয়ে লিখি না ভাই! তাই এই জায়গা ডিফেন্ড বুদ্ধিমানরা নিজেরাই বুঝবে, আপনি কদ্দূর কি আইনের সহযোগীতা পাবেন।

জুয়েল: আমি ব্যক্তিগতভাবে স্বাধীন আমার পরিবারের কাছে! হ্যাঁ তবে বাংলাদেশের অধিকাংশ সমকামীদের ক্ষেত্রে হয়তো এখনও এটা সম্ভব হয় নি এবং আমিও মনে করি সমকামীদের সব চাইতে বড় আন্দোলন নিজের পরিবারের কাছে অধিকার প্রতিষ্ঠিত করা। কিন্তু আইন পরিবর্তন না হলে সমকামীরা সাহস দেখিয়ে পরিবারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার সুযোগ পায় না। আর আইনটা না থাকলে পরিবার না মানলেও সমকামীরা তাদের নিজের জীবন নিজের মত করে চালাতে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।

আমার উত্তর: পরিবারের সাথে মানুষের বন্ধন কি আইন দিয়ে জাস্টিফাই করা যায়? এই যেমন ধরুন না, বৃদ্ধ পিতা মাতার খরচ না দিলে সন্তানের ৩বছরের জেল হয়। দেখুন না কটা মামলা হয়েছে ওই আইনের আওতায়? আপনার ১৮ বছর বয়স হবার সাথে সাথে সমকামী আর যা ইচ্ছা তাই হন আপনার ইচ্ছা মতো আপনি চাইলে চলতে পারবেন। সেই ক্ষেত্রে ৩৭৭ ধারা আপনাকে কি দিবে আমি সেটাই বুঝতে পারছি না! আপনার কি মনে হয় আমরা সমকামী বলে ৩৭৭ ধারা যতটা জানি, আমাদের পরিবার গুলো ততটা জানে? আপনি বলতে পারবেন  পেনাল কোডের ১২০ক ধারাতে কি বলা আছে? পারবেন না যদি না আপনি আইন বিষয়ে জ্ঞান না রাখেন। মানে হলো পরিবারের কাছে ৩৭৭ ধারা কোনো অর্থই রাখে না। তাদের কাছে অর্থ রাখে সামাজিক মর্যাদা, এবং ধর্মীয়মূল্যবোধ। আইন পারিবারিক পরিমন্ডলে বেকার একটা জিনিস নিজের যৌন অভিমুখকে প্রকাশ করার জন্য।

জুয়েল: আরেকটা কথা উঠেছে এখনই আইনি পদক্ষেপ নিলে যে সকল সমকামীরা বাংলাদেশে অবস্থানরত তারা হুমকির মুখে পরবে। আমার প্রশ্নটা হচ্ছে তারা কি এমনিতে হুমকি বিহীন আছে? আর আপনাদের তো দেখলাম না ফেসবুকে ইংরেজিতে স্ট্যাটাস দেওয়া ছাড়া ভালো কোনও কাজ করতে? কখনও ভেবেছেন প্রান্তুিক গ্রামঞ্চলে সমকামী ভরপুর?

 আমার উত্তর: প্রশ্ন উঠেছে ৩৭৭ ধারা বাতিলের উদ্যোগ নিলে সমকামীরা হুমকির মুখে পড়বে, এমনিতে কি হুমকির মুখে নেই? আসলে হুমকির মাত্রাটা বুঝতে হবে। হুমকি তে অবশ্যই এখনো আছে, কিন্তু এখন লিষ্ট করে মারছে না। বিষয় গুলা বুঝে না বোঝার ভান করলে আমার কিছু বলার নাই। যে অপ্রিয় বিষয়টার অবতারণা আমি আমার লেখায় করতে চাই না তাই এখানে টানতে বাধ্য হচ্ছি। জুলহাজ মান্নান কি রূপবানের কার্যক্রম শুরু করার আগে গে ছিলো না? রূপবান শুরু করার পর গে হইছে? তা তো না, জুলহাজ মান্নানের সাথে যারা কাজ করতেন তারা কমবেশি সবাই সবাই আমি যতটুকু জানি বাংলাদেশে ববের ব্যানারে অনেক দিন থেকেই কাজ করছিলো। কিন্তু কখন ওই হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটলো! যখন ওই র‍েইনবো র‍্যালী করা হলো পাবলিকলি ঘোষনা দিয়ে, যখন ৪জনকে গ্রেফতার করলো রমনা থানা, যখন রূপবান গিয়ে ওই ৪জনকে ছাড়িয়ে আনলো। এখন আপনি কি বলতে চান। জুলহাজ-তনয় হত্যা এম্নি এম্নি হইছে? ওই ঘটনার পরে, চিহ্নিত এক্টিভিস্টদের রাস্তাঘাট, অফিস, বাসা থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বসিয়ে রেখে ইন্টারোগেশন করছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। কি জানেন আপনারা? কতটুকু জানেন? কেন দীর্ঘদিন ধরে সংগঠন চালানো মানুষ গুলো এতো কৌশলী? ঠিক তিনবছর আগে পরিস্থিতি আবার তৈরি হবে যেদিন রীট বা PIL করার ঘটনা গণমাধ্যমে আসবে। সরকারের ভাবমূর্তির কথা ভেবে, জঙ্গী সংগঠন না  হোক, সরকারী গোয়েন্দা সংস্থা গুলোই হেনস্তা করার শুরু করবে  পরিচিত মুখ গুলোকে। যেই “লালমিয়া” বাংলাদেশে মামলা করবে বলতেছেন, তিনি তো বাংলাদেশেই থাকবেন না। তিনি যেহেতু সমকামীদের জন্য মামলা করবেন, এবং দেশ ছাড়বেন, তখন ওই জঙ্গী আর সরকার এটা বুঝবেনা যে তার সাথে দেশীয় এক্টিভিস্টদের কোনো সম্পর্ক নেই।

ওই ১০ লাখ টাকা যদি LGBTIQ+ এর সম্প্রদায়ের স্বার্থেই খরচ করতে চায়। তাহলে আমি বলবো আগে অন্তত ৫ বছর আগে কমিউনিটির মানুষের আর্থসামাজিক, শারীরিক-মানসিক স্বাস্থ্য আর কমিউনিটি এডভোকেসীর জন্য কাজ করুন ওইটাকা দিয়ে, তারপর ৩৭৭ ধারা নিয়ে ভাববেন। দেখুন আমি অবশ্যই ৩৭৭ ধারা বাতিলের বিপক্ষে না। আমি চাই সেটা বাতিল হোক। কিন্তু সবকিছুর একটা যথাযথ সময় আছে। আপনি পৌষ মাসে যদি কদম ফুল চান তবে সেটা অমূলক এবং আপনার এই বাচ্চাসুলভ চাহিদার যদি আমি সামলোচনা করি, তার মানে এই না যে আমি চাইনা কমদফুল ফুটুক। আমি শুধু বলছি ওটা বর্ষাকালের ফুল তখনই ফুটবে। এখন আপনি বরং কদম গাছটার যত্নকরেন, গাছকে অরক্ষিত রেখে যদি আপনি ফুল ফোটানোর আন্দোলন শুরু করেন, তবে আমি আপনাকে “ফেরেব্‌বাজ” বলবই।

২০১৭ সালে ২৮ জুলাই,  রিয়াজ ওসমানী ও শাহানুর ইসলাম নামক দুজন মানুষ একটি ওয়েব সাইট (https://www.justgiving.com/crowdfunding/remove-377-from-Bangladesh?fbclid=IwAR1xFILfi6fhCcLzjhXxwJzhU2Ju5-e3uzAOel4pThS-YHy6q6J3wdeCh5o) হতে ৫৬৫ পাউন্ড ফান্ড তুলেছিলেন ৩৭৭ ধারা রীট করার কথা বলে, সেখানে তারা টার্গেট দিয়েছিলো ২৫ হাজার পাউন্ড মানে বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২৫ লক্ষ ৭৭ হাজার টাকা। প্রশ্ন হলো এই টাকা ২০১৭ সালে নিয়ে কোথায় খরচ করেছে? এই ওয়েব সাইটে টাকা তোলা ছাড়াও ব্যক্তিগত পর্যায়ে আরো ফান্ড তোলা হয়েছিলো, এই ৩৭৭ ধারা রীট করার কথা বলে, সেই টাকাই বা কোথায় গেলো?

কারো কাছে কোনো জবাব আছে?