জুলহাজ-তনয় হত্যাকাণ্ডের চতুর্থ বার্ষিকীতে বিবৃতি

[READ ENGLISH VERSION HERE]

১০ই বৈশাখ, ১৪২৭ 

২০১৬ সালের ২৫শে এপ্রিলে এক নৃশংস আক্রমণে আমরা জুলহাজ মান্নান এবং খন্দকার মাহবুব রাব্বি তনয়কে হারিয়েছি। চার বছর ধরে আমরা তাদের হারানোর ভার দৈনন্দিন জীবনের সব ক্ষেত্রে — সাংগঠনিক কাজকর্মে, সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনে — বহন করে চলছি। 

দীর্ঘ তিন বছর অবহেলার পর ‘কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম’ (সিটিটিসি) ইউনিট, ২০১৯ সালের জুলাই মাসে, ‘চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে’ (সিএমএম) হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করে সিটিটিসি ‘আনসার উল ইসলাম’ এর ৮ সদস্যকে অভিযুক্ত করে। তাদের মধ্যে হত্যাকাণ্ডের পিছনে কথিত নীলনকশাকারী হলেন প্রাক্তন আর্মি মেজর ও দাগী জঙ্গি সৈয়দ জিয়াউল হক। ইতিমধ্যে অভিযুক্তদের মধ্যে ৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেট এই মামলার নথি সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচারের জন্য স্থানান্তরিত করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। তবে চার্জশিট দাখিলের পর থেকে মামলার বিষয়ে আর কোনও প্রকার অগ্রগতির আভাষ পাওয়া যায়নি। 

আমরা রাষ্ট্রের এই অবস্থা দেখে আর অবাক হইনা। 

দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে যে, বাংলাদেশের লিঙ্গ ও যৌন বৈচিত্র্য জনগোষ্ঠীর (এলজিবিটি+) অধিকারের সংগ্রাম বাংলাদেশের অন্যান্য প্রগতিশীল রাজনৈতিক লড়াইয়ের সাথে জড়িত। প্রতিনিয়ত আমাদের অস্তিত্ব মুছে ফেলার যে চেষ্টা অব্যাহত আছে, তা নিয়ে অবশ্যই বৃহৎ পরিসরে চিন্তা করা দরকার। আমরা এমন একটি দেশের কথা বলছি যেখানে “মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ” অভিযান বিচার বহির্ভূত হত্যার ঢালে পরিণত হয়েছে; যেখানে ডিজিটাল সুরক্ষা আইন সাংবাদিক, আন্দোলন কর্মী, শিল্পী, মানবাধিকার রক্ষাকারী এবং অন্যদেরকে হুমকি দেয়া এবং দমন করার চেষ্টা অব্যহত রাখছে; নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা বাড়ছে; মূলধারার মিডিয়া বিভ্রান্তমূলক গল্পসমূহ প্রচার করে শরণার্থী এবং তাদের আশ্রয়দাতাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করেছে; প্রাক্তন প্রধান বিচারপতিকে সরকারের হুমকির মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছে; প্রভাবশালী সমাজ জেনেভা ক্যাম্প থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে সংখ্যালঘুদের প্রান্তিককরণ অব্যাহত রেখেছে; ক্রমবর্ধমান জিডিপি প্রসারমান অসমতার সাথে হাতে হাত রেখে আগাচ্ছে; কোভিড-১৯ মহামারীটি লক্ষ লক্ষ মানুষকে  ক্ষুধার্ত , বেকার , চিকিৎসাহীন অবস্থায় রাস্তায় ফেলে দিচ্ছে, ইত্যাদি।  

আমরা বিশ্বাস করি সার্বিকভাবে ন্যায়বিচার এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, যেমন জুলহাজ-তনয় হত্যা মামলার একটি গ্রহণযোগ্য বিচার নিষ্পত্তি, হলো একমাত্র উপায় যার মাধ্যমে সরকার বাংলাদেশের মানবাধিকার রক্ষাকারীদের মধ্যে থাকা ভয়ের পরিবেশকে দূরীভূত করতে পারে, এবং সমাজে ন্যায়বিচার ও সমতার রাস্তা প্রশস্ত করতে পারে। মানুষের নিজের ভাব প্রকাশ করার স্বাধীনতা এবং অবাধে জীবনযাপনের অধিকারকে আমরা দ্বিধাহীনভাবে সমর্থন করি।

তবে আমরা এটাও বিশ্বাস করি যে সরকার, আদালত মামলা, আইন, এবং নীতিমালা সবকিছু নয়।

রূপবান বাংলাদেশের প্রথম এলজিবিটি+ ম্যাগাজিন প্রকাশের মাধ্যমে দেশের লিঙ্গ ও যৌন বৈচিত্র্য জনগোষ্ঠীর দৃশ্যমানতার প্রতীক হিসাবে কাজ করে আসছে। জুলহাজ এবং তনয়ের হত্যার পর থেকে আমরা নিজেদেরকে বারবার জিজ্ঞাসা করছি যে কীভাবে আমরা আমাদের সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি। এলজিবিটি+ অধিকারের সংগ্রামকে এগিয়ে নেওয়ার একমাত্র উপায় হিসাবে আমরা শুধু এলজিবিটি+ জনগোষ্ঠীর দৃশ্যমানতাকেই দেখিনা। স্পষ্ট করে বললে, আমাদের বর্তমান কাজেও নিজেদের দৃশ্যমানতাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে আমরা দেখছি না। যেই কুইয়ার গর্ব আমাদেরকে নিজেদের প্রকাশে উদ্বুদ্ধ করেছে রূপবানের শুরু থেকে, সেই গর্ব নিয়েই এখন আমরা সাংগঠনিক কাজ নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করছি। রাষ্ট্রকে নয়, আমরা নিজেদের জনগোষ্ঠীর মানুষকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করবার প্রচেষ্টা করছি। এই পথটি বেছে নিয়েছি আমরা নম্রতার সাথে, কারণ আমরা বিশ্বাস করি সংগ্রামের জন্য অনেক ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতির কৌশল রয়েছে।

জুলহাজ এবং তনয়ের চলে যাওয়া আমাদের শিখিয়েছে যে, আমাদের সম্প্রদায়ের জীবিত সদস্যদেরকে আমাদের অবশ্যই ভালবাসতে হবে। কুইয়ার আত্মীয় হিসাবে, আমাদের অবশ্যই একে অপরের যত্ন নেওয়া লাগবে। একে অপরের সাথে আলাপ-আলোচনা এবং বোঝাপড়ার মাধ্যমে আমাদের কাঙ্ক্ষিত সুন্দর সম্প্রদায়গুলো তৈরি করতে হবে। আমাদের এলজিবিটি+ সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে যে শ্রেণিবিভেদ, বর্ণবাদ, অভ্যন্তরীণ সমকামভীতি, বর্ণবাদ, রূপান্তর/উভকামভীতি রয়েছে তা নতুন কোন খবর নয়। আমরাও এই ক্ষতিকারক এবং জটিল সামাজিক বাস্তবতার অংশীদার, এর জন্য দায়ী, যেহেতু এর মধ্য দিয়েই আমাদের বেড়ে ওঠা, সংগঠিত হওয়া, এবং আমাদের নিজের ‘আমি’ হওয়া। 

তাই এই চিন্তান্বিত ও শোকাচ্ছন্ন এপ্রিলে, এবং সহানুভূতির রমজান মাসকে সামনে রেখে, আমাদের এলজিবিটি+ জনগোষ্ঠীর সকল দেশ ও বিদেশের সম্প্রদায়ের প্রতি আবেদন, আসুন আমরা নিজেদের কাজগুলো পুনঃমূল্যায়ন করি এবং আমাদের মধ্যে কার কি প্রয়োজন তা লক্ষ্য করি। আমাদের কুইয়ার আত্মীয়দের মধ্যে কে ক্ষুধার্ত? কে গৃহহীন? কে চাকরি হারিয়েছে বা এখনও খুঁজে পায়নি? মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কে লড়াই করছে? আমাদের কতি, হিজড়া, ট্রান্স, নন-বাইনারি আত্মীয়রা কি করছেন? কোভিড-১৯ লকডাউনের সাথে কীভাবে লড়াই করছেন আমাদের কম সুবিধাপ্রাপ্ত কুইয়ার আত্মীয়রা? জুলহাজ এবং তনয়ের মৃত্যুর গভীর ক্ষত পুরণ করার অনুপ্রেরণা নিয়েই কাছের এবং দূরের সকল সম্প্রদায়গুলোকে আহ্বান জানাচ্ছি, চলুন ফোন করে, একটি ই-মেইল বা টেক্সট/মেসেজ লিখে  আমাদের  কুইয়ার আত্মীয়দের খোঁজখবর নেই এবং সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেই।    

আপনি যদি এলজিবিটি+ মানুষজনকে সাহায্য করতে চান তাহলে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করুন; হয়তো আমরা একসঙ্গে কাজ  করতে পারি। আপনি যদি হন কোন এক সম্প্রদায়ের সদস্য যার সাহায্যের প্রয়োজন, তাহলে  আমাদেরকে এই ই-মেইলে (info@roopbaan.org) যোগাযোগ করুন। আমরা আপনাকে সাহায্য করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করবো।

জুলহাজ ও তনয়কে হারানোর চতুর্থ বার্ষিকীতে, আসুন আমরা নিজেদেরকে বলীয়ানকন্ঠে বলি: আমরা বাঁচব। আমরা একে অপরকে ভালবাসবো এবং রক্ষা করবো। আমরা এই দুনিয়ার অংশ।