জুলহাজ-তনয় হত্যাকাণ্ডের পাঁচবছর ও বাংলাদেশের কুইয়ারদের বাস্তবতা সম্পর্কিত বিবৃতি

[READ ENGLISH VERSION HERE]

“সং” একটি কুইয়ার জনগোষ্ঠী ভিত্তিক মোবিলাইজিং প্লাটফর্ম যেটি সকলপ্রকার লিঙ্গ পরিচয়, যৌন অভিমুখ, লৈঙ্গিক প্রকাশ ও লৈঙ্গিক বৈশিষ্ট্যের মানুষের অধিকার আদায় করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। 

“সং” এবং তার কিছু সদস্য যৌথ ভাবে এই বিবৃতি প্রদান করেছেন।

২০২১ সালে বাংলাদেশ তার স্বাধীনতার সুর্বণজয়ন্তী উদযাপন করছে, তবে রাষ্ট্র অর্থে স্বাধীনতার যে চারটি সূচক রয়েছে (ভূখন্ড, সার্বভৌমত্ব, নাগরিক, ও সরকার) তার মধ্যে নাগরিকের স্বাধীনতা তথা মৌলিক সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়া ও যথাযথ নির্বাচিত সরকারের অনুপস্থিতি বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় একটি প্রমাণিত সত্য। বাংলাদেশের অন্যান্য ভিন্নমতাবলম্বী সম্প্রদায় ও জনগোষ্ঠীর মতোই দেশের কুইয়ার জনগোষ্ঠীও তাদের স্বাধীনতা/সাংবিধানিক অধিকার তো দূরে থাকুক, তাদের অস্তিত্বের সংকট নিয়েই আশংকার সময় পার করছে। যার প্রমাণস্বরূপ আমরা দেখতে পাই ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সের দেয়া তথ্য মতে, বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৫২তম পর্যায়ে অবস্থান করছে। 

বিচার-বর্হিভূত হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের জন্য বিগত বছরগুলোতে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত একটি সত্য। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও রাজনৈতিক সংকটে থাকা দেশের নাগরিকরা এই বিষয়টিকে অপ্রতিরোধ্য বাস্তবতা হিসেবে মেনে নিয়েছেন। ২০০১ সাল থেকে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় বিশ বছরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন মোট ৪০০২ জন মানুষ, যার মধ্যে ২০২০ সালের করোনা পরিস্থিতির মধ্যেই প্রথম সাত মাসে এই ধরনের হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ২০৭ জন মানুষ। সংখ্যার হিসেবে এই মৃত্যুর হিসেবগুলো কেবল রাষ্ট্রীয় বাহিনীকর্তৃক নিহত মানুষদের সংখ্যাকে নিশ্চিত করলেও, বাংলাদেশের ভঙ্গুর বিচারব্যবস্থার বদৌলতে বিভিন্ন সন্ত্রাসী, উগ্রবাদী গোষ্ঠীর হামলা ও সরকারী দলের হামলায় নিহতের সংখ্যাও নেহাতই কম নয়। আমরা বুঝতে পারি বিদ্যমান ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নামক অপ-আইনের কারণে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ডগুলোর বিরুদ্ধে সংগত কারণেই সংক্ষুব্ধ জনগোষ্ঠী কোনোপ্রকার বাদ-প্রতিবাদও করতে পারছেনা। রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা/মৌনতা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও বিচারের দীর্ঘসূত্রিতার কারণে সরকারী বাহিনী ছাড়াও উগ্রবাদী গোষ্ঠীর দ্বারা সংঘটিত হত্যাকাণ্ডগুলোকেও বর্তমানে বিচার-বর্হিভূত হত্যার সাথে  একই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব। 

২০১৬ সালে বাংলাদেশের প্রথম এলজিবিটি+ ম্যাগাজিন রূপবানের সাথে সম্পৃক্ত দুজন সমকামী অধিকারকর্মী মাহবুব রাব্বী তনয় ও জুলহাজ মান্নানের হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ ৫ (পাঁচ) বছর ইতোমধ্যে অতিবাহিত হলেও সেই হত্যাকাণ্ডের বিচারের আশানুরূপ কোনো অগ্রগতি আমরা দেখতে পাচ্ছি না। গতবছর রূপবান ব্লগ হতে প্রকাশিত জুলহাজ-তনয় হত্যাকাণ্ডের চতুর্থ বার্ষিকীর বিবৃতি হতে আমরা জানতে পারি, এই মামলায় কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট একটি চার্জশীট প্রদান করেছে এবং মামলাটি সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইবুন্যালে হস্তান্তর করা হবে। পরবর্তীতে বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবর হতে জানা যায়, এই হত্যামামলাটি ২০২০ সালে সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং ২০২০ সালের ১৯ নভেম্বর মামলার অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। অভিযোগপত্রের অভিযুক্ত আসামীরা সবাই আনসার উল্লাহ বাংলাটিমের সদস্য, এবং একই আসামীরা জঙ্গী গোষ্ঠীর হামলায় নিহত ও আহত ব্লগার, প্রকাশক ও মানবাধিকার কর্মীদের হত্যা মামলাতেও অভিযুক্ত আসামী। এছাড়াও  ২০২১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারী জুলহাজ-তনয় হত্যামামলার অভিযুক্ত ৩ (তিন) জন আসামীর স্বীকারোক্তিমূলক স্বাক্ষ্যগ্রহণকারী তিনজন বিচারক ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য প্রদান করেছেন; যদিও এখন পর্যন্ত মূল পরিকল্পনাকারী ও অভিযুক্ত আসামীরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গিয়েছে। জুলহাজ-তনয় হত্যাকাণ্ড ছাড়াও ২০১৩ সালের পর থেকে জঙ্গীগোষ্ঠীর হাতে ভিন্নমত প্রকাশকারী লেখক, ব্লগার, প্রকাশক ও মানবাধিকারকর্মীদের খুন হবার যে হত্যামামলাগুলো চলমান আছে, তার সবকটি মামলা পরিচালনা করতে গিয়ে রাষ্ট্র চরম স্বেচ্ছাচারিতার পরিচয় দিচ্ছে এবং এই ক্ষেত্রে নিহতের পরিবারের সাথেও কোনোপ্রকার সহযোগীতা রাষ্ট্রের পক্ষ হতে করা হচ্ছে না বলেও নানান সময় প্রকাশিত খবর হতে জানতে পারছি। অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে আমরা লক্ষ্য করেছি, এই হামলাগুলোতে শুধু যে কেবল কিছু মানুষ নিহত হয়েছেন এমন নয়, বরং নিহতদের সাথে যারা কাজ করতেন, কিংবা যারা ভিন্নমতাবলম্বী ও প্রগতিশীল কার্যক্রমের সাথে যুক্ত ছিলেন, তাদের অনেকেই নিরাপত্তার অভাবে প্রাণ বাঁচাতে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। বিচারহীনতা, সরকারের অসহিষ্ণু আচরণ ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীদের প্রকোপে অসংখ্য বাংলাদেশী নাগরিকদের আমরা একের পর এক বাংলাদেশে থেকে নির্বাসিত হতে দেখেছি।

আমরা বিশ্বাস করি জুলহাজ-তনয়ের হত্যাকাণ্ডটি কেবল একটি বিছিন্ন ঘটনা বলে বিবেচনা করা অনুচিত। ২০১৩ সাল হতে জঙ্গীগোষ্ঠীগুলো তালিকা তৈরির মাধ্যমে যে টার্গেট কিলিং মিশন শুরু করেছিলো তারই ধারাবাহিতার ফল এই হত্যাকাণ্ড। আনসারুল্লাহ বাংলা টিম ও তাদের লিস্টেড টার্গেট কিলিং মিশন সম্পর্কে বাংলাদেশের আইনশৃংঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রথম থেকেই অবগত থাকলেও রাষ্ট্রীয় চরম উদাসীনতায় এই ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডগুলো একের পর এক বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে। জঙ্গী হামলার প্রকোপ থেকে যখন আন্তর্জাতিক চাপের মুখে বাংলাদেশ সরকার জঙ্গী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর হতে শুরু করলো তখনই আমরা প্রত্যক্ষ করলাম, তৎকালীন তথ্য ও প্রযুক্তি আইনের ৫টি ধারাকে বিলুপ্ত করে, ভিন্নমতপোষণকারী প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তিকে কোণঠাসা করতে বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ পাশ করে, এবং তার যথেচ্ছ অপপ্রয়োগ শুরু করে। বাংলাদেশের প্রচলিত রাজনীতিকে ভিন্নভাবে যারা ভাবেন, এবং প্রগতিশীল রাজনীতিতে যারা বিশ্বাস করেন, তাদের উপর পূর্বের ন্যায় এখন অব্দি রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন অব্যাহত রয়েছে। যার প্রেক্ষিতে আমরা দেখতে পেয়েছি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় আটক লেখক মুশতাক আহমেদ ২০২১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি বিনাবিচারে কারাগারে মৃত্যুবরণ করেছেন, উল্লেখ্য এই একই মামলায়, ২০১৬ সালের নিহত দুজনের, একজনের পরিবারের সদস্যকেও আসামী করে ২০২০ সালে আটক করা হয়েছে, এবং তিনি এখনো ওই মামলায় আসামী হিসেবে জামিনে আছেন। আমরা অত্যন্ত পরিতাপের সাথে প্রত্যক্ষ করছি, করোনা অতিমারীর এই দুঃসময়ে সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষদের মৌলিক চাহিদাগুলো বিঘ্নিত হচ্ছে; অথচ স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, খাদ্য, বাসস্থানের মতো বিষয়গুলোর প্রতি সরকার চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়ে কেবল সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের সমালোচকদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে  মামলা ও গ্রেফতার ২০২১ সালের এই চলমান লকডাউনেও অব্যাহত রয়েছে।

কুইয়ার সম্প্রদায়দের সদস্য হিসেবে আমরা কেবল আমাদের জনগোষ্ঠীর সদস্য নয়, বরং বাংলাদেশের যত নিপীড়িত, নিগৃহীত ও নির্যাতিত জনগোষ্ঠী রয়েছেন, তাদের সকলের পাশেই বৈষম্যহীনভাবে অবস্থান নিতে চাই। আমরা বিশ্বাস করি, বিচারবিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা সম্ভব হলে রাষ্ট্রীয়বাহিনী ও সন্ত্রাসীবাহিনীদের হাতে নিহত, আহত ও ক্ষতিগ্রস্থ ব্যাক্তিরা রাষ্ট্রের কাছে তাদের ন্যায্য অধিকার পাবেন এবং এসকল ঘটনায় যারা নির্বাসিত হয়েছেন তারা তাদের নিজস্ব রাষ্ট্রে ফিরে আসতে সক্ষম হবেন। আমরা আশংকা করছি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকা মানুষদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা সম্ভব না হলে এবং এই রাষ্ট্রীয় দূর্বৃত্তায়ন বন্ধ করা সম্ভব না হলে, অদূর ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের এই ফাঁকা অর্থনৈতিক শব্দগুলো প্রতিধ্বনিত হয়ে করোনা অতিমারীর সাথে মিলেমিশে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা চরম সংকটের মধ্যে পতিত হবে।

উল্লেখিত এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মূলধারার কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষেই অনলাইন কিংবা অফলাইনেও অর্গানাইজিং করা কিংবা মাঠের রাজনীতি করা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। আমরা দেখেছি, রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো প্রগতিশীল ও সরকারের সমালোচনাকারী ব্যক্তিদের নিয়মিত নজরদারিতে রাখছেন, তাদের ব্যক্তিগত যোগাযোগ ট্র্যাক করছেন এবং রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট কিছু গণমাধ্যম যত্রতত্র নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন করে তাদের ব্যক্তিগত কথোপকথন প্রকাশ করে দিচ্ছেন এই গভীর সংকটময় পরিস্থিতিতে কুইয়ার সম্প্রদায়ের সংগঠনগুলো ও তার সংগঠকরা নিজেরা কোনোপ্রকার যোগাযোগ কিংবা সংগঠিত করার কাজটি নিরাপদে করতে পারছেন না। যদিও এই সংকটকে সামনে রেখেই কিছু সংগঠন ও সংগঠকে বেশ সাহসীকতার পরিচয় প্রদান করতে আগ্রহী হয়ে উঠছেনযত্নের রাজনীতির ও সমষ্টিগত দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে, এবং কুইয়ার সম্প্রদায়ের সার্বিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে এই ধরনের সাংগঠনিক কার্যক্রমের ব্যাপারে পুনর্বিবেচনার অবকাশ রয়েছে বলে আমরা মনে করি। কারণ আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের সম্প্রদায়ের যে কোনো একজনের যে কোনো ধরনের ক্ষতি আমাদের সকলকেই প্রত্যক্ষভাবে আক্রান্ত করবে। তাই এই সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ও সংগঠকদের তাদের স্বীয় সম্প্রদায়ের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নৈতিক দায় রয়েছে।

উগ্রবাদী গোষ্ঠী কর্তৃক জুলহাজ-তনয়ের হত্যাকাণ্ড এবং এই হত্যাকাণ্ডের বিচারে রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা অর্থে পরোক্ষ সমর্থনে আমরা উদ্বিগ্ন ও আশংকার জীবন যাপন করছি। আমরা দেখতে পাই ২৫ এপ্রিলকে লক্ষ্য করে অনেক কুইয়ার সংগঠন নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন, আমরা তাদের অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও সহমর্মীতা প্রকাশ করি। তবে বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় দু’জন অধিকারকর্মীর মৃত্যুকে নিয়ে কেবল শোক পালন করার চাইতে, তাদের আত্মত্যাগ ও এক্টিভিজমের বিষয়বস্তুকে লক্ষ্য করে আরো সুগঠিত ও সুসংহত একটি অর্গানাইজিং এর পরিবেশ তৈরিতে সকলের ভূমিকা আরো অধিক ফলপ্রসূ হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। পাশাপাশি আগামী মাসে আগত ইন্টারন্যাশনাল ডে এগেইনেস্ট হোমোফোবিয়া, ট্রান্সফোবিয়া এন্ড বাইফোবিয়া-২০২১ ও জুন মাসে আগত প্রাইড মান্থকে লক্ষ্য করে যে কার্যক্রমগুলো পরিচালিত হবে, তাতে কমিউনিটির সার্বিক গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা অক্ষুণ্ন রেখে কাজ করা কমিউনিটির সার্বিক পরিস্থিতির জন্য কল্যাণকর হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। উক্ত দু’টি ইভেন্টকে কেন্দ্র করে ইতোপূর্বে নানান এলাই সংগঠন ও ব্যক্তিরা নানা ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন, যেগুলো আদতে আমাদের জনগোষ্ঠীর মানুষের উপকারের বিপরীতে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই আমাদের সাথে একাত্মতা প্রকাশকারী ব্যক্তি ও সংগঠনগুলোর প্রতি আমাদের অনুরোধ থাকবে, আপনারা কুইয়ার জনগোষ্ঠী নিয়ে যে কোনো কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে অবশ্যই আপনাদের দ্বারা গৃহীত পদক্ষেপসমূহে এই জনগোষ্ঠীর মানুষের মতামত ও নেতৃত্বকে নিশ্চিত করবেন, এবং জনগোষ্ঠীর মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বাধিক গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে আপনাদের কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। অন্যদিকে যারা কুইয়ার জনগোষ্ঠীর সদস্য, সংগঠক ও আয়োজকরা রয়েছেন তাদের প্রতি আমরা বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় পরিস্থিতিকে পর্যবেক্ষণপূর্বক যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে অনুরোধ করতে চাই। আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের সম্প্রদায়ের জীবিত মানুষগুলোকে সুরক্ষিত রাখা ও তাদের স্বস্তিমূলক জীবনযাপন নিশ্চিত করার বিষয়টি অন্য সকল কিছুর উর্ধ্বে রাখাটা বেশি জরুরী ও প্রয়োজনীয়।

কুইয়ার জনগোষ্ঠীর সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা ভাবতে গেলে বলা যায়, অন্যান্য অনেক গ্রুপ যারা ভিন্নভিন্ন পন্থায় তাদের কাজ করে যাচ্ছেন, তাদের সাথে আমরা আমাদের পরিকল্পনা এবং নিরাপত্তার জন্য নেয়া ব্যবস্থাগুলো নিয়ে আলাপ আলোচনা করতে পারি। এর মধ্য দিয়ে চলমান পরিস্থিতিতে আমরা ঠিক কাদের কাছে আমাদের এই বক্তব্যগুলো তুলে ধরতে চাই এবং কী ধরণের সহযোগিতা বা কোন পর্যায় পর্যন্ত নিজেদের প্রকাশ করা আমাদের রাজনৈতিকভাবে লাভবান করবে সেটিও আসলে জানা যাবে। আর তাই আমরা এলাইদেরকে নিয়ে কীভাবে কাজ করবো সে বিষয়ে আমাদের আরেকটু ভেবে দেখা দরকার এবং এলাইদের এই সম্পৃক্ততার মাধ্যমে আমাদের বক্তব্যগুলোর ঠিকঠাক প্রতিনিধিত্ব হচ্ছে কিনা সেটিও সময় নিয়ে যাচাই করে নেয়া উচিত। এটি করার মাধ্যমে আমরা এই জনগোষ্ঠীর সার্বিক কল্যাণ ও নিরাপত্তার নিশ্চিত করার জন্য যখন নিজেদের কাজ সীমাবদ্ধ করার প্রয়োজন পড়বে, তখন সেখানে নিজেদের গুটিয়ে/গুছিয়ে আনতে পারবো। আমাদের এই পরামর্শগুলোর আসল উদ্দেশ্য হলো, আমরা এবং আমাদের সংগঠকেরা যাতে নিজেদের এই কাজ এবং মঙ্গলকে দীর্ঘস্থায়ী করার দিকে সঞ্চালিত করতে পারি সেটি নিশ্চিত করা। 

সবশেষে বলতে চাই, জুলহাজ-তনয়ের সকল সহকর্মী, বন্ধু ও শুভাকাঙ্খীদের প্রতি আমরা সহমর্মিতা ও সমবেদনা প্রকাশ করছি। এই হত্যাকাণ্ডের কারণে নিহতদের সহকর্মী কুইয়ার মানুষজনের জীবনে অকল্পনীয় পরিবর্তন হয়েছে, যা একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে তাদের প্রাপ্য ছিলো না। অনেক কুইয়ার সংগঠক বাধ্য হয়েছেন দেশ ছাড়তে, এবং তাদের সকলেই আজ অব্দি ওই নির্মম ঘটনাটির জন্য মানসিক অবসাদের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। এই সম্প্রদায়ের জন্য কাজ করতে গিয়ে ব্যক্তিজীবনে এতো আত্মত্যাগ করেছেন যে মানুষগুলো, আমরা তাদের সকলের প্রতি আমাদের সম্মান ও ভালোবাসা প্রকাশ করতে চাই। নির্মম সেই হত্যাকাণ্ডের স্মৃতিটি সাথে নিয়ে নিজেদের পরিচিত জায়গা, পরিবার, সমাজ, ভাষা ও সংস্কৃতিকে ছেড়ে বিজাতীয় একটি পরিবেশের সাথে তালমিলিয়ে চলতে গিয়েও সেই সকল মানুষেরা এখনো নানান প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে কঠিন সময় পার করছেন। জুলহাজ-তনয়ের হত্যাকাণ্ডের এই ৫ (পাঁচ) বছরে বাংলাদেশের কুইয়ার মানুষজন কেবল দুইজন অধিকারকর্মীকেই হারায়নি, বরং এর ফলে বাংলাদেশের পুরো কুইয়ার মুভমেন্ট মুখ থুবড়ে পড়েছিলো; পাশাপাশি সকল সংগঠন ও সংগঠকদের পোহাতে হয়েছে অবর্ণনীয় কষ্ট। আমরা বিশ্বাস করি, জীবিত এই কুইয়ার মানুষগুলোর প্রতি আমাদের ভালোবাসা জানানোর দায় আছে, কারণ তাদের ত্যাগও কোনো অংশে কম নয়। তাই যারা নির্বাসিত হয়েছেন, কিংবা দেশের মধ্যেই আছেন তাদের নিয়ে আমাদের সংগঠক ও আয়োজকদের ভাবা প্রয়োজন, সেই সকল মানুষরাও আমাদের নিকট হতে যত্নের দাবীদার।