জুলহাজ মান্নান এবং মাহবুব রাব্বি তনয় হত্যা মামলার বিষয়ে বাংলাদেশী আদালতের সিদ্ধান্তে রুপবান বিবৃতি

[READ ENGLISH VERSION HERE]

দীর্ঘ পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিচার চলার পর, অবশেষে বাংলাদেশের এক আদালত আমাদের বন্ধু, কুইয়্যার স্বজন এবং সহ-সংগঠক, জুলহাজ মান্নান এবং মাহবুব রাব্বি তনয়কে হত্যার দায়ে একটি ইসলামপন্থী জঙ্গি গোষ্ঠীর ছয় সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে আমরা এই ২০১৬ সালে ঘটে যাওয়া নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে এসেছি, এবং আদালতের এই সিদ্ধান্তে আমরা আশাবাদী। আমরা এরপরও সতর্কতার সাথে আইনি প্রক্রিয়ার অবশিষ্ট কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও অনুসরণ করে যাবো। এখনো সময় আসেনি আমাদের স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার কারণ এই হত্যাকান্ডের মূলহোতা (সৈয়দ জিয়াউল হক) এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। আদালতের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে উচ্চ আদালতে আপিল হতে পারে। রায়ের পূর্ণবিবরণ, বিশেষত আদালতের সিদ্ধান্তের পিছনের আইনি যুক্তি এখনো অনেকের অজানা রয়েছে।

ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা শুধুমাত্র মৃত্যুদণ্ডের মতো সাজা দেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিচার ট্রাইব্যুনাল এই মামলায় মৃত্যুদণ্ড ও তার প্রতিরোধক প্রভাবের বিষয়টি উল্লেখ করেছে। তবে, দীর্ঘ প্রতিষ্ঠিত গবেষণায় মৃত্যুদণ্ড প্রতিরোধক হিসাবে কাজ করে এমন কোনও দৃষ্টান্তমূলক প্রমাণ পাওয়া যায় না। সুতরাং, যখন দেখা যায় মিডিয়া রিপোর্টে দণ্ডিতরা হাসছেন এবং আন্তরিকভাবে তাদের মৃত্যুদণ্ড গ্রহণ করছেন, তখন এতে অবাক হওয়ার মত কিছু নেই। ধর্মীয় উগ্রবাদীদের মৃত্যুদণ্ড দিয়ে ঠেকানো যাবে না। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ধর্মীয় উগ্রবাদীরাই কেবল মাত্র কুইয়্যার ফোবিয়ার এজেন্ট নয়। বাংলাদেশী রাষ্ট্রের বিদ্যমান আইন এবং পুলিশি কার্যক্রম কুইয়্যার ফোবিয়াকে সক্ষম করে চলেছে। বাংলাদেশী রাষ্ট্র সমকামিতাকে অপরাধী করে এমন উপনিবেশিক আইনকে এখনো সমর্থন করে চলেছে। আমরা এটাও ভুলে যেতে পারি না যে এটি সেই বাংলাদেশী রাষ্ট্র যা মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে দমন করে এবং রাজনৈতিক মতবিরোধকারী ও সংগঠকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে। রাষ্ট্র ডিজিটাল সুরক্ষা আইনের মতো আইন পাস করেছে যা অন্যান্য অস্পষ্ট অপরাধের পাশাপাশি “ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত” লাগে এমন যেকোনো পদক্ষেপকে অপরাধী গণ্য করে। কঠোর নজরদারি এবং ভয়ের ফলস্বরূপ বিদ্যমান পরিস্থিতি দেশের এলজিবিটিকিউ+ অধিকারের আদায়ের কাজে মারাত্মকভাবে বাধার সৃষ্টি করে।

আমরা যারা ভুক্তভোগীদের স্বজন, দাবি জানাই যে বাংলাদেশের এলজিবিটিকিউ+ মানুষের অধিকার এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার হওয়া অত্যন্ত আবশ্যক। বাংলাদেশী রাষ্ট্রকে অবশ্যই এলজিবিটিকিউ+ অধিকার কর্মী সহ অন্যান্য ভিন্নমতাবলম্বী মানুষদের সুরক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে করে আমরা পরিবর্তনের জন্য সংগঠিত করতে পারি। এছাড়াও, বাংলাদেশী এলজিবিটিকিউ+ সম্প্রদায়ের নিত্যদিনের সংগ্রামে সবার মনোযোগ দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিতভাবে এবং বিশেষত কোভিড মহামারী চলাকালীন, আমাদের সম্প্রদায়ের সদস্যরা ক্ষুধা, গৃহহীনতা, বেকারত্ব, কর্মক্ষেত্রের বৈষম্য, মানসিক স্বাস্থ্য সঙ্কট, চিকিৎসার নিরাপত্তাহীনতা এবং সামাজিক বৈষম্য সহ নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হয়ে চলেছেন। এলজিবিটিকিউ+ কর্মীরা নির্বিচারে গ্রেপ্তার, নজরদারি, সহিংসতা, আইনী হয়রানি এবং রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের ভয়ে বসবাস করছেন। এলজিবিটিকিউ+ কর্মীরা যখন ধর্মীয় উগ্রবাদীদের হুমকির মুখোমুখি হয়, তখন তারা নেতিবাচক ফলাফলের কথা চিন্তা করে বাংলাদেশী পুলিশের কাছে যেতে পারেন না। আমাদের নির্বাসিত সংগঠকরা বাংলাদেশে ফিরে আসতে পারছেন না। রূপবান নামে আমরা বাংলাদেশে আমাদের নিয়মিত কার্যক্রম পুনরায় শুরু করতে পারছি না।

আদালতের বর্তমান সিদ্ধান্তটি আমাদের জন্য এক অত্যন্ত আবেগময় ও সংবেদনশীল মুহূর্ত। অনেকে বিশ্বাস করেছিলেন যে মামলাটি অবহেলিত হবে এবং সবাই ভুলে যাবে। বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের বাহিরের এলজিবিটিকিউ+ কর্মী ও বন্ধুদের সমর্থন ও সংহতিতে আজ এই মুহূর্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। কিন্তু আমরা এখনও একটি ইনসাফের বাংলাদেশী সমাজকে উপলব্ধি করা থেকে অনেক দূরে যেখানে আমরা আমাদের মাথা উঁচু করে সাফল্যের সাথে অবাধে বাস করতে পারি। সেই স্বাধীন সমাজের আশায় আমাদের অবশ্যই একে অপরের যত্ন নিতে হবে এবং নিজেদের সংগঠিত হতে হবে।